করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২০


মানবসৃষ্ট করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সারাবিশ্ব। পুঁজিবাদী মুনাফার বলি হয়ে পড়েছে সারাবিশ্বের তাবৎ মানুষ। মানুষমাত্রই এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। মানব ইতিহাসে এমন ভয়াবহতার ঘটনা অতীতে কখনো ঘটেনি। অথচ করোনা ভাইরাস নামক মরণঘাতী ব্যাধিটি প্রাকৃতিক নয়, মানবসৃষ্ট। পুঁজিবাদী মুনাফার অভিপ্রায়ে রোগটির জন্ম ও বিস্তার। এতে সন্দেহ নেই। পুঁজিবাদ কত নৃশংস হতে পারে তার নানা নমুনা আমরা পূর্বে প্রত্যক্ষ করলেও এবার সেটা মানবজাতির অস্তিত্বকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বে মানবজাতির অস্তিত্ব থাকবে কি থাকবে না সেটা নির্ভর করছে ঘাতক ব্যাধিটির প্রতিষেধক উদ্ভাবনের ওপর। অজ্ঞাত ব্যাধিটি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা কারো ছিল না। তাই ব্যাধিটি সহজে দ্রুত বিস্তার করে মানবজাতির অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছে। কেউ আর নিরাপদে নেই। সবাই মৃত্যু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্বের ওপর এমন হুমকির ঘটনা অতীতে কখনো ঘটেনি।

মানবসভ্যতা বিকাশে বিজ্ঞানের অপরিসীম অবদানের বিষয়টি অস্বীকারের সাধ্য কারো নেই। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে মানবজীবনে ইতিবাচক অসংখ্য পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। যেটি মানবসভ্যতার অগ্রসরতার দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা কত ব্যাপক ও বিস্তৃত হতে পারে আদিম যুগ থেকে বর্তমান যুগের তুলনামূলক বিচার করলে সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা আমরা পাই। বিজ্ঞানের অগ্রগতিই যে মানবসভ্যতা বিকাশে সর্বাধিক অবদান রেখেছে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ-সংশয় কারো নেই। বিজ্ঞানীরা মানবের মঙ্গলের জন্যই তাদের জ্ঞান-অনুশীলনে, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সর্বোপরি উদ্ভাবনী ক্ষমতায় একের পর এক আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মানবজাতির কল্যাণ সাধন করেছে। বিজ্ঞানকে একপেশে বলা যাবে না। বিজ্ঞানে ইতির পাশাপাশি নেতির বিষয়টিও আমরা অস্বীকার করতে পারব না। শুরুতে পুঁজিবাদী মুনাফার কথা বলা হয়েছে। বিজ্ঞানকে বা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নিয়ে মানবকল্যাণের বিপরীত কর্মটি ওই পুঁজিবাদী উন্মত্ত মুনাফার লিপ্সায় নেতিতে পরিণত করা হয়েছে। প্রতিটি আবিষ্কার মানবকল্যাণের জন্যই করেছেন বিজ্ঞানীরা কিন্তু তাকে মুনাফায় পরিণত করার তৎপরতা কিন্তু শুরু থেকেই থেমে থাকেনি। মানুষ বহনের বিমানকে যুদ্ধ-বিমানে পরিণত করে মানুষ হত্যায় যেমন ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই অমন বিপরীত কর্মটি যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র নিজেদের বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বিস্তারে অপপ্রয়োগ করেছে। বিষয়টি নতুন কোনো বিষয় নয়।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মানুষ করোনা ভাইরাসের কবলে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। ঘাতক এই ব্যাধির আগমনের পেছনে পুঁজিবাদী মুনাফা অনিবার্যভাবে দায়ী। ওই মুনাফার কারণেই বিজ্ঞানকে অপপ্রয়োগে উচ্চাকাক্সক্ষী প্রবণতায় ব্যাধিটির আগমন এবং বিশ্বজুড়ে বিস্তার লাভ করে মনুষ্য জীবনের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। ঘাতক ব্যাধিটি থেকে কেউ রেহাই পাবে বলেও ভরসা করা যাচ্ছে না। কোয়ারেন্টাইনে থেকে আপাতত নিজ নিজ সুরক্ষা করা যাবে, কিন্তু কতকাল মানুষ জীবন-জীবিকা পরিত্যাগ করে বিচ্ছিন্নভাবে একাকী এক ঘরে জীবন কাটাতে সক্ষম হবে! সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পক্ষে সেটা অসম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে গৃহে অবরুদ্ধ থাকা কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না। আমাদের দেশের মতো বিশ্বেরও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ প্রতিদিনের উপার্জনে প্রতিদিনের জীবন নির্বাহ করে থাকে। জীবিকাহীন অবস্থায় তারা করোনা থেকে বাঁচতে গিয়ে নিশ্চয় না খেয়ে মরার কবলে পড়তে চাইবে না। সেক্ষেত্রে দেশজুড়ে লাগাতার লকডাউনের নির্দেশনা কতটুকু কার্যকর রাখা যাবে সেটা নিকট ভবিষ্যৎই বলে দেবে।

মনুষ্য জীবনের শুরুতে প্রকৃতির বিরূপতার বিরুদ্ধে লড়াই করে মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল। প্রকৃতির সাহায্যেই মানুষের বিকাশ। প্রকৃতির সঙ্গে হাত ধরাধরি করেই মানুষ নিজেদের বিকাশ সাধন করেছিল। অথচ আজকের মানবসভ্যতার উৎকর্ষের এই সময়ে মানুষের সৃষ্ট প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে মানুষের জীবন চরম শঙ্কার মুখে পড়েছে। এর থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায়টি হচ্ছে ওই ভাইরাসের প্রতিষেধক। সেটা আবিষ্কারের ওপরই নির্ভর করছে পৃথিবীতে মনুষ্য জাতির বেঁচে থাকা এবং না থাকা।

পুঁজিবাদী মুনাফার লিপ্সার বলি বিশ্বের তাবৎ মানুষ। এ পর্যন্ত প্রায় লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানির সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। মৃতের সংখ্যা গোপন যে করা হয়নি সেটাও বলি কীভাবে! করোনা ভাইরাসের উৎসমূল চীন। অথচ তারা তাদের দেশে মৃতের সংখ্যা ঘোষণা করেছে মাত্র ৪ হাজার। বাস্তবের সঙ্গে চীনের তথ্যের যে মিল নেই, সেটা স্বীকার করতেই হবে। কেননা চীনের অভ্যন্তরের কোনো সংবাদ জানা মোটেও সম্ভব নয়। তারা নিজেরা যা প্রচার করবে বিশ্ব তা-ই জানবে, তার অধিক নয়।

মানুষের জীবন-ইতিহাসে যুদ্ধবিগ্রহ, প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে অগণিত মানুষের প্রাণহানিও ঘটেছে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের আগমনের মতো ঘটনা অতীতে কখনো ঘটেনি। পৃথিবীতে মানুষের বেঁচে থাকা-না থাকার প্রশ্নটি এখন প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোগটি নিয়ে একে অপরকে দোষারোপের কথা শোনা যাচ্ছে। চীন দায়ী করছে যুক্তরাষ্ট্রকে, অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্র দেশগুলো দায়ী করছে চীনকে। কিন্তু আমরা জানি প্রকৃত দোষী পুঁজিবাদী মুনাফার মাত্রাতিরিক্ত লিপ্সা। যেটি মানবজাতিকে বারবার সংকটের কবলে ফেলতে দ্বিধা করেনি। পুঁজিবাদ তার মরণ কামড় বসিয়ে বিশ্বের মানবজাতি বিনাশে তার প্রকৃত স্বরূপটি উন্মোচিত করেছে। এজন্য ওই পুঁজিবাদী তৎপরতাই দায়ী। পুঁজিবাদবিরোধী বিশ্বজনমত গড়ে তুলে পুঁজিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে আমরা সামগ্রিক বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাবো না। একের পর এক বিপদ আমাদের জীবন সংহার করবে।

করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার উপায় জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় একাকী গৃহবন্দি অবস্থায় থাকার ঘোষণা বিশ্বজুড়ে প্রচারিত হচ্ছে। এই রোগ থেকে বাঁচার এটাই এমুহূর্তের প্রধান অবলম্বন। কিন্তু এটা মোটেও স্থায়ী সমাধান নয়। জীবিকাবিহীন অনাহারি মানুষ ওভাবে থাকতে পারবে না যদি তাদের খাদ্য-নিরাপত্তা রাষ্ট্র কর্তৃক নিশ্চিত না করা হয়। শঙ্কা-আতঙ্কের চেয়ে জনসচেতনতার কথা বলা হচ্ছে জোরেশোরে। পেটে আহার না থাকলে সচেতনতার বোধ-বিবেচনা কিন্তু থাকবে না। তাই প্রতিটি রাষ্ট্রের আশু কর্তব্য হচ্ছে নিজ নিজ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেটা সম্ভব হলে মানুষকে গৃহে রাখাও সম্ভব হবে। আক্রান্তের সংখ্যা হ্রাস পাবে। খাদ্যাভাবে মানুষ যাতে পথে না নেমে পড়ে সেটাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রতিটি রাষ্ট্রের সরকারের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য বলেই মনে করি।

মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj