করোনা সমস্যাটির তাৎপর্য বহুমাত্রিক

সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২০


রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় করোনা ভাইরাসের আক্রমণ, নিত্যনতুন বিস্তার। যেখানে আক্রমণ, নিয়মমাফিক সেখানেই ‘লকডাউন’ অর্থাৎ সে এলাকা ছোট-বড় যেমনই হোক বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। আসা-যাওয়া বন্ধ। পাহারা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সদস্যদের। সবাই গৃহবন্দি।

মহানগর ঢাকার একাধিক এলাকা এভাবে অবরুদ্ধ এলাকায় পরিণত হচ্ছে। তাতে মানুষ অর্থাৎ বন্দি পরিবারগুলো মহাসমস্যার সম্মুখীন। রান্নাঘর চালু রাখতে বাজার সওদা করার কী ব্যবস্থা হবে, কে তাদের সরবরাহ করবে নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় পসরা। এটা এক মস্ত চ্যালেঞ্জ সরকারের জন্য। কিন্তু কী করা যাবে। করোনা সংক্রমণের বিস্তার তো ঠেকাতে হবে।

এ সমস্যা অবশ্য সবার জন্য নয়। বিত্তবানরা ইতোপূর্বে যথেষ্ট পরিমাণে নিত্য ব্যবহার্য প্রধান খাদ্যপণ্য মজুত করে রেখেছেন, এমনকি মধ্যবিত্তদেরও অনেকে। যত সমস্যা নি¤œবিত্ত শ্রেণি থেকে নি¤œবর্গীয়দের। তাদের সমস্যা একাধিক।

যেমন খাদ্যপণ্য অর্থাৎ চাল-ডাল-আলু-সবজি সংগ্রহের, তেমনি আর্থিক সঙ্গতির। নি¤œবর্গীয়দের সংখ্যাটির বিস্তার ব্যাপক। পোশাক কারখানার শ্রমিক কর্মী থেকে দিন আয়ের খেটেখাওয়া মেহনতি মানুষ। এদের কর্মের অভাবের কারণে খাদ্যসামগ্রী কেনার মতো অর্থের অভাব।

আগে সমস্যার চিত্রটাই তুলে ধরা যাক। যেমন ঠেলাগাড়ি, ভ্যানগাড়ি, রিকশা শ্রমিক, অটো রিকশাচালক- এরা প্রায় কর্মহীন, উপার্জনহীন যেহেতু মানুষ জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত বাইরে বেরুতে পারছে না, কাজকর্ম সারতে পারছে না। এ সমস্যাটা দ্বিপাক্ষিক। তবে যাদের বাইরে যাতায়াত করতে হচ্ছে, তাদের চেয়েও বেশি সমস্যা পূর্বোক্ত নি¤œবর্গীয়দের।

ইতোমধ্যে বহু পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পোশাক শ্রমিকরা কর্মহীন। যারা স্থায়ী কর্মী তাদের কি মাসিক বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে কারখানা মালিকদের পক্ষ থেকে? কর্মের শর্ত যাই হোক, নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক চেতনার বিবেচনায় দুর্যোগ-দুর্ভোগকালীন সহায়তার বিকল্প নেই। করোনার স্বল্পকালীন দুর্যোগে এটুকু আর্থিক সহায়তা তাদের প্রাপ্য। কারণ তাদের ক্লান্তিহীন শ্রমে মালিকদের পোশাক কারখানার সা¤্রাজ্য গড়ে উঠেছে।

ইতোমধ্যে এক তুঘলকি কাণ্ড ঘটে গেল। কারখানা খুলেছে- এ গুজবে মাওয়াঘাটে পোশাক শ্রমিকদের ঢল নর-নারী নির্বিশেষে, ঢাকায় প্রবেশ করবে বলে। তারপর প্রচণ্ড হতাশা নিয়ে ফিরে যাওয়া, যে-যার গ্রামে। এছাড়া রয়েছে মহানগর ঢাকার বস্তিবাসী, শ্রমজীবী মানুষ, তাদের দিন উপার্জনে যাদের বেঁচে থাকার সমস্যা।

দুই.

বিশাল এ নি¤œবর্গীয় শ্রেণির মানুষগুলোর সমস্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দৈনিক পত্রিকার পাতায় এর কিছু খবর প্রকাশ পায়। সরকার অবশ্য ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির ব্যবস্থা করেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে আটপৌরে মধ্যবিত্তদেরও ভিড় জমাতে। সতর্কবাণী উচ্চারিত হচ্ছে এসব বিকিকিনিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানে নীতি প্রায়শ পরাস্ত।

এছাড়া এদের জন্য বেসরকারি খাতে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা চলছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ত্রাণ মানেই অব্যবস্থাপনা, আর তা খাদ্যসামগ্রী হলে তো কথাই নেই। সেখানে থাকে দুর্নীতিরও কালো হাত, যা প্রতিরোধ করা কঠিন। করোনা আক্রমণ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এ অনাহার সমস্যা সংকটে পরিণত হবে। সরকারের জন্য করোনাভিত্তিক আনুষঙ্গিক চ্যালেঞ্জ।

পরিস্থিতি ক্রমশ যে আকার ধারণ করছে, করোনার সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব কেবল সমস্যাই সৃষ্টি করতে থাকবে। সে ক্ষেত্রে সরকার পক্ষে মানবিক হিসাবটা বড় হতে হবে, সাময়িক অর্থনৈতিক ক্ষতির দায় স্বীকার করেও। কারণ করোনা মহামারি জাতীয় সমস্যা তৈরি করেছে এবং সমাজের বহুমাত্রায়। এ দায় সরকার একা সামলাতে পারার কথা নয়। বৈশি^ক নীতিও তা বলে না।

সংকট বা সমস্যা যেহেতু জাতীয় চরিত্রের, এর মোকাবিলার চরিত্রটিকেও হতে হবে জাতীয় পর্যায়ের অর্থাৎ সর্বাত্মক।

সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তি ও সমষ্টিগত- সব দিক থেকে দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। স্বাধীন বাংলাদেশে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলা হয়ে থাকে, সেখানে অবিশ^াস্য উচ্চতার যে ভার্টিকাল গ্রোথ বা শ্রীবৃদ্ধি তা প্রবাদসম বাইশ পরিবারকে শতগুণ ছাড়িয়ে গেছে, কারো বিচারে তা হাজার গুণ। না হোক হাজার গুণ, অঙ্কটা অতীব স্ফীতকায় তা আমাদের অভিজ্ঞতায় সত্য প্রমাণ করে। তাদের দায় রয়েছে, দুর্যোগে-দুর্ভোগে নি¤œবর্গীয়দের সাময়িক অর্থনৈতিক সহায়তাদানের। বাংলাদেশের ধনিক বা অতিধনীকুল সে দায়িত্ব কতটা পালন করছেন?

তিন.

আমরা আগেই বলেছি, করোনা সমস্যা এক দিককার নয়, এর প্রভাব বহুমাত্রিক। দৈনিক উপার্জন, অর্থাভাব, অনাহার প্রভৃতি অর্থনৈতিক সমস্যা যেমন নেতিবাচক সত্য, তেমনি সত্য স্বাস্থ্য-চিকিৎসাসেবা সংক্রান্ত সমস্যাদি যেখানে মৃত্যু তাৎক্ষণিক, বড় করুণ, বড় অমানবিক। ইতোমধ্যে দৈনিক পত্রিকায় কয়েকটি বিয়োগান্ত ঘটনার খবর বা বিবরণ প্রকাশ পেয়েছে।

হাসপাতাল ও ক্লিনিকের দরজায় দরজায় ঘুরে ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে প্রত্যাখ্যাত রোগীর (করোনায় আক্রান্ত নয়) করুণ মৃত্যু প্রচণ্ড সামাজিক ক্ষোভ ও সমালোচনার সম্মুখীন। এমনকি ক্ষোভের প্রকাশ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর। এগুলো আমাদের জাতীয় চরিত্রের সমস্যা। করোনায় আক্রান্ত বিশে^র চিকিৎসাসেবা সংক্রান্ত উদাহরণ কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। আমরা তা অনুসরণ করতে রাজি নই।

একটি বিষয় তো স্পষ্ট যে করোনার প্রাথমিক লক্ষণ ও উপসর্গগুলো থেকে শতহস্ত দূরে ভিন্ন লক্ষণাক্রান্ত রোগীকে দেখেই একজন চিকিৎসক সহজে বুঝতে পারেন তিনি প্রকৃতই করোনায় আক্রান্ত কিনা, সে ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থ সে রোগীকে চিকিৎসাসেবার পরিবর্তে ফিরিয়ে দেয়ার নৈতিক অধিকার তো কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকের নেই। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই এ জাতীয় একাধিক ঘটনার খবর দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

এসব ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ, তা আমাদের জানা নেই। যা জানা যাচ্ছে বিভিন্ন সংবাদসূত্রের সুবাদে তা হলো বর্তমানে করোনা নয়, এমন রোগে আক্রান্ত রোগীও চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না। বিস্ময়কর আনুষঙ্গিক ঘটনা যে, এ দুর্যোগে কোনো কোনো ওষুধ কোম্পানি অত্যাবশ্যকীয় কোনো কোনো ওষুধ সরবরাহ স্থগিত করেছে কোনো না কোনো অজুহাতে। কী হবে ওই সব রোগীদের?

পূর্বোক্ত ব্যাপারে চিকিৎসক ও সেবিকাদের অভিযোগ যে, প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়া বা বহির্বিশে^ করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগের যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার ছিল তারা তা করেনি। ঘটনা দৃশ্যমান হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক ও সেবিকাদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাদি (পিপিই) গ্রহণের কোনো তাৎক্ষণিক তাগিদ লক্ষ্য করা যায়নি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের।

তাই চিকিৎসকদের মতে, তারা যে ব্যবস্থা নিচ্ছেন তা আত্মরক্ষার তাগিদে। এ জাতীয় কৈফিয়ৎ অবশ্য মানুষ মানতে রাজি নয়, নয় সমাজের মননশীল অংশ। তারা সেবার মহৎ আদর্শের বিষয়টি প্রধান বিবেচ্য হিসেবে, যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন; কেউ বৈশি^ক উদাহরণ টেনে।

কিন্তু স্বল্পসংখ্যক আলোচনার বাইরে স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বে শিথিলতা, সমন্বয়হীনতা, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোরালো তাগিদের অভাবের কথা উল্লিখিত হচ্ছে না। আকাশে কালো মেঘ দেখলেই কৃষক বা গৃহস্থ তার দায়িত্ব বা করণীয় সম্পর্কে সচেতন বা তৎপর হয়, করোনার ঘটনার ক্ষেত্রে তেমনটি দেখা যায়নি।

যা হয়নি তা নিয়ে আক্ষেপ করা বৃথা। এখন দরকার বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জরুরিভিত্তিক ব্যবস্থাদি গ্রহণ। প্রতিটি সংশ্লিষ্ট বিভাগের পক্ষে দরকার মহামারি মোকাবিলার মানসিকতা নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগে প্রতিরোধ ও প্রতিকার কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়া- জাতীয় সংকট মোকাবিলার মতো করে। তা না হলে অনেক অবাঞ্ছিত ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে আমাদের, এই করোনা সংকটকালীন সময়ে। সেটা কি উপভোগ্য হবে?

আহমদ রফিক : ভাষাসংগ্রামী ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj