করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২০


করোনা ভাইরাস রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচতে হলে আমাদের মুখমণ্ডলের যতœ নেয়া আবশ্যক। মুখমণ্ডলের যতœ বলতে আমরা মুখের বাইরে ও ভেতরের যতœই বুঝি। মুখের বাইরের যতœ নিতে আমাদের প্রথমেই চোখ, নাক, মুখ ইত্যাদির যতœ বুঝায়। এর জন্য প্রয়োজন একটি বিজ্ঞানসম্মত মাস্ক ব্যবহার, বাজারে যে ধরনের বৈজ্ঞানিক মাস্ক রয়েছে সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। অথবা ঘরে বসেই তিন পরতের কাপড় দিয়ে তৈরি করা যাবে। যাতে করে বাইরে থেকে কেউ হাঁচি, কাশি দিলে অথবা বাতাসের ধুলা বা জীবাণু নাকে, মুখে বা চোখে এসে ঢুকতে না পারে। এই মাস্ক ব্যবহার করার সময় প্রথমে রাবার ব্যান্ড অথবা ফিতাটি ধরে মুখের ওপর দিয়ে কানের দুপাশে লাগাতে হবে। কোনোভাবেই মাস্কের ওপর হাত দেয়া যাবে না। এবং খোলার সময়ও ঠিক একইভাবে খুলতে হবে। মাস্কটি ওয়ানটাইম হলে একবার ব্যবহারের পর খুলে ফেলে দিতে হবে। এবং যেগুলো ওয়াশঅ্যাবল সেগুলো ধুয়ে আবার ব্যবহার করা যাবে। তবে কোনো সময়ই হাতের আঙুল দিয়ে মুখ স্পর্শ করা যাবে না। যদি রোগীকে দেখার জন্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পরীক্ষা বা চিকিৎসা করতে হয়, তবে অবশ্যই পিপিই পরে নিতে হবে।

মুখমণ্ডলের ভেতরের ও বাইরের স্বাস্থ্য রক্ষায় করণীয় :

প্রতিদিন দুই বেলা দাঁত ব্রাশ অর্থাৎ সকালে নাস্তার পর ও রাতে আহারের পর প্রতিদিন অন্তত দুবার ১ গøাস অল্প গরম লবণ পানিতে গড়গড়া করা অথবা কোনো অ্যান্টিসেপটিক মাউথওয়াশ দিয়ে মুখ কুলকুচি করা (অন্তত দুই বেলা), তাহলে মুখের ভেতরের জীবাণুমুক্ত রাখা সম্ভব হবে। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে জিবছোলা অথবা টাঙ্গ ক্লিনারের মাধ্যমে জিহ্বার উপরিভাগে জমে থাকা খাদ্যকণাগুলো পরিষ্কার করা, তাহলে মুখের ভেতরে প্রদাহ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। কারণ জিহ্বার ওপরেই বেশিরভাগ খাদ্যকণা লোমক‚পের ভেতরে লুকিয়ে থাকে, যা খালি চোখে দেখা যায় না। দাঁত ব্রাশের আগে ডেন্টাল ফ্লসের (একজাতীয় পিচ্ছিল সুতা) সাহায্যে দুই দাঁতের মধ্যবর্তী স্থান থেকে খাদ্যকণা পরিষ্কার করা ভালো, তাহলে মুখের ভেতরের মাড়ির প্রদাহ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। কারণ দুই দাঁতের মধ্যবর্তী স্থানে বেশিরভাগ খাদ্যকণা জমে থাকে।

মুখের রোগ প্রতিরোধে বিভিন্ন পুষ্টিকর খাদ্য বর্তমানে প্রতিদিন গ্রহণ করা জরুরি, যেমন- দাঁত ও মাড়ির বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে প্রতিদিন কিছু ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফলমূল খাওয়া প্রয়োজন। কারণ করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য দেহের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ানো প্রয়োজন। তাই যেসব ফলমূল ও শাকসবজিতে পুষ্টিকর উপাদান রয়েছে সেগুলো হচ্ছে- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট জাতীয় ভিটামিন যেমন, বিটা ক্যারোটিন : রঙিন ফলমূল ও শাকসবজিতে এই উপাদান প্রচুর পরিমাণে আছে। তাছাড়া গাজর, পালংশাক, লালশাক, ব্রকলি, টমেটো, পেঁপে, আম, ডাল ইত্যাদি। ভিটামিন সি : আমলকী, লেবু, কমলা, সবুজ মরিচ, করলা ইত্যাদি। ভিটামিন এ : গাজর, পালংশাক, মিষ্টি আলু, মিষ্টিকুমড়া, জাম্বুরা, ডিম, কলিজা, দুধ জাতীয় খাবার। ভিটামিন ই : কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, পেস্তাবাদাম, শিমের বিচি বা বিচি জাতীয় খাবার, ভেজিটেবল অয়েল, জলপাইয়ের আচার, সবুজ শাকসবজি ইত্যাদি। আরো কিছু খাবার অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ : অ্যান্টি অক্সিডেন্টের সবচেয়ে ভালো উৎস উদ্ভিজ্জ খাবার, যেমন- বেগুনি, কমলা হলুদ রঙের শাকসবজি এবং ফল। শরীরের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে বিভিন্ন শাকসবজি, যেমন- সবজি : করলা, লাল পাতা কপি, বিট, ব্রকলি, গাজর, টমেটো, মিষ্টিআলু, ক্যাপসিক্যম, ফুলকপি। এবং যে কোনো ধরনের ও রঙের শাক। ফলের মধ্যে : কমলালেবু, পেঁপে, আঙুর, আম, কিউই, আনার, তরমুজ, জলপাই, আনারস ইত্যাদি। এ সময়ে টক দই খাওয়া ভালো যা শ্বাসযন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্র সংক্রমণের ঝুঁকি প্রতিরোধ করে। তাছাড়া প্রতিদিন গ্রিন টি উপকারী। কারণ লাল চায়ে এল-থেনিন এবং ইজিসিজি নামক অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকে, যা আমাদের শরীরে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনেক শক্তি তৈরি করে এবং শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। ভিটামিন বি ও জিঙ্ক জাতীয় খাবারের মধ্যে আছে বিচি জাতীয়, বাদাম, সামুদ্রিক খাবার, দুধ ইত্যাদি- এগুলো শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির কোষ বৃদ্ধি করে। তাই এই সময়ে এ ধরনের খাবার বেশি খাওয়া প্রয়োজন। সেসঙ্গে ডিম, মুরগির মাংস ইত্যাদি আমিষ জাতীয় খাবার বেশি করে খেতে হবে। অতিরিক্ত তাপে বা দীর্ঘ সময় রান্না করলে খাবারের এই উপাদানটি অনেকখানি কমে যাবে। অতএব খাবারে অ্যান্ট অক্সিডেন্ট বেশি পরিমাণ পেতে হলে আমাদের কোনো খাবারই অতিরিক্ত জ্বাল দেয়া যাবে না। এছাড়া সালাদ করে খাওয়াই ভালো যেমন- শসা, গাজর, টমেটো, বিট, ব্রকলি ইত্যাদি।

সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, সাদাপাতা ইত্যাদি তামাক জাতীয় খাবার, ধূমপান করোন ভাইরাস ঝুঁকি মারাত্মক বাড়ায়। বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে ধূমপায়ীদের মারাত্মক সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেক বেশি- তাদের ফুসফুসগুলোর দুর্বল ক্রিয়াকলাপ এক্ষেত্রে দায়ী। বিশেষজ্ঞরা ধূমপায়ীদের কোভিড ১৯-এর ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য অবিলম্বে অভ্যাসটি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ধূমপানের সংস্পর্শে করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। এর ফলে সৃষ্ট অন্যান্য ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে পারে। যারা করোনা ভাইরাসের এই সময়ে পান, সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, সাদাপাতা ইত্যাদি তামাক জাতীয় খাবার গ্রহণ করবেন বা ধূমপান করবেন তাদের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যেমন বেশি তেমনি রোগের জটিলটা ও ভোগান্তি অন্য অধূমপায়ীদের তুলনায় অনেক বেশি। তাই ধূমপান বন্ধ করা যেমন জরুরি তেমনি জর্দা, গুল, সাদাপাতা ইত্যাদি খাওয়া চলবে না।

চিকিৎসা : আমেরিকান ডেন্টাল এসোসিয়েশন (এডিএ), ব্রিটিশ ডেন্টাল এসোসিয়েশন (বিডিএ) ও সিডিসি (সেন্টার ফোর ডিজিজ কন্ট্রোল ও প্রিভেনশন) করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ডেন্টাল সার্জারির কয়েকটি কাজ বর্তমানে বন্ধ রাখতে বলেছে যেমন- ডেন্টাল স্কেলি, ডেন্টাল ফিলিং, রুট ক্যানেল চিকিৎসা, গ্রাইন্ডিং, পলিশিং ইত্যাদি। কারণ এসব কাজের সময় এয়ার স্প্রে থেকে মুখের জীবাণু বাইরে এসে ব্যক্তি অথবা যে কোনো যন্ত্র বা বস্তুতে লেগে থাকতে পারে এবং সেটা পরবর্তীতে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সংক্রমিত করতে পারে। অতএব এসব কাজ করোনা ভাইরাসের ব্যাপ্তিকাল পর্যন্ত বন্ধ রাখাই ভালো। তবে ইমারজেন্সি বা তীব্র কোনো দাঁতের ব্যথা বা ফোলা থাকলে জরুরি ব্যবস্থাপত্র দিয়ে আপাতত প্রদাহ ও ব্যথা উপশম রাখা প্রয়োজন। এ জন্য যে কোনো ব্যক্তি তার সমস্যার কথা টেলিফোনে, ম্যাসেঞ্জারে/হোয়াটসঅ্যাপ, ইমেইলে অথবা ভাইভারে জানালে অথবা ক্লিনিকে/হাসপাতালে এসে দেখালে সেই অনুপাতে ব্যবস্থাপত্র দেয়া আবশ্যক। যাতে করে ব্যথা বা প্রদাহ সাময়িকভাবে উপশম হয়। এবং পরবর্তী সময়ে করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় ফলোআপ চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়। সেসঙ্গে করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার ও বাংলাদেশ সরকারের ঘোষিত বিভিন্ন বিধি-নিষেধ মেনে চলা জরুরি।

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী : দন্ত বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র কনসালট্যান্ট (অনারারি), বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj