নেই জোরাল প্রস্তুতি : করোনা সংক্রমণের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০

চট্টগ্রাম অফিস : করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত করতে চট্টগ্রামে সীমিত আকারে টেস্ট শুরু হলেও চিকিৎসা সেবা প্রস্তুতি, সরঞ্জাম এখনো প্রচণ্ড রকমের অপ্রতুল। করোনা সংক্রমণের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা চট্টগ্রামে আক্রান্তদের চিকিৎসায় তেমন কোনো প্রস্তুতি নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রশাসনিক উদ্যোগ অনেকটা কাগজে-কলমে। রয়েছে সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনা গাফেলতি। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ও ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে জেনারেল হাসপাতালে ১০০টি ও বিআইটিআইডিতে ৫০টি মিলে ১৫০ শয্যা রয়েছে। তবে এ ২টি হাসপাতালেই আইসিইউ নেই। এতে করোনা আক্রান্ত কোনো রোগী গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে কোথায় চিকিৎসা করানো হবে তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় এখনো চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগ।

স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলাপের পর ধারণা করা হচ্ছে কমিটি গঠন, কন্ট্রোলরুম চালু এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর মধ্যেই এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে করোনা মোকাবিলা প্রস্তুতি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের অনেক মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রবাসী হিসেবে রয়েছেন। করোনা ভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর থেকে হাজারো প্রবাসী চট্টগ্রামে ফিরে এসেছেন, যাদের অনেকেই প্রশাসনের নজরদারির বাইরে। বিদেশফেরত এসব প্রবাসী কোয়ারেন্টাইন অমান্য করে লোকালয়ে মিশে যাওয়ায় সংক্রমণের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল। অথচ সেই তুলনায় সরকারের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বেশি বেশি টেস্ট করা। অথচ তাতেও রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা।

পুলিশের তথ্যে, গত ১ মার্চ থেকে ২০ মার্চ শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে চট্টগ্রামে এসেছেন ২০ হাজারের বেশি প্রবাসী। যারা নগরীসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ১০ হাজার লোক চট্টগ্রাম মহানগরীতে অবস্থান করছেন বলে কর্মকর্তাদের ধারণা। এর মধ্যে নগরীতে নিরুদ্দেশ থাকা বিদেশফেরত কিছু নাগরিক নিজ উদ্যোগে থানায় রিপোর্ট করে স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টাইনে যাচ্ছেন। এতদিন পাসপোর্টের ঠিকানা অনুযায়ী বিদেশফেরতদের খুঁজে পাচ্ছিল না পুলিশ। নগরীর বিদেশফেরত লোকজন থানায় এসে রিপোর্ট করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিভিন্ন থানার ওসি। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অনেকেই নির্দেশনা অমান্য করে ঘোরাফেরা করছেন, যা অত্যন্ত ঝুঁঁকিপূর্ণ। খুলশী থানার ওসি প্রণব চৌধুরী বলেন, গত এক সপ্তাহে বিদেশফেরত অন্তত ২০ জন লোক নিজ উদ্যোগে থানায় এসে রিপোর্ট করে গেছেন। এদের পাসপোর্টের ঠিকানা অন্য জায়গায়, কিন্তু তারা খুলশী এলাকায় বসবাস করছেন। বাকলিয়া থানার ওসি নেজাম উদ্দিন বলেন, গত কয়েক দিনে ২০ জন প্রবাসী থানায় এসে রিপোর্ট করেছেন। তারা স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টাইনে গেছেন।

খুব বেশি অসুস্থ রোগীর চিকিৎসায় ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) তেমন প্রস্তুতি নেই। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপনে নীতিগত অনুমোদন হলেও তা তৈরি করতে কমপক্ষে মাসখানেক সময় প্রয়োজন। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে নগরীর ৬ বেসরকারি হাসপাতালের ১২টি শয্যা আপদকালের জন্য প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। তবে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে করোনা রোগী চিকিৎসা করালে সেখানে অন্যদের মধ্যে তা ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশে করোনা সংক্রমণের পরও চট্টগ্রাম অঞ্চলের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কিছু কিছু পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম) দেয়া হয়েছে চিকিৎসকদের, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। স্বাভাবিক জ্বর, সর্দি-কাশি নিয়ে আসা রোগীদেরও চিকিৎসা দেয়া থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক চিকিৎসক। অনেক চিকিৎসক তাদের ব্যক্তিগত চেম্বার ও হাসপাতালেও রোগী দেখছেন না সেভাবে। এ অবস্থায় চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে বলে জানান কয়েকজন চিকিৎসক। কারণ চট্টগ্রামে সরকারিভাবে করোনা রোগীদের জন্য যে কয়টি হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে তাতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেশনের সুবিধা নেই। চিকিৎসক-নার্সদেরও নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. শেখ ফজলে রাব্বি ভোরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রাম জেলায় এখন পর্যন্ত কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হননি। করোনা সংক্রমণ রোধে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে করোনা টেস্ট শুরু হয়েছে। কিট নিয়ে যে সংকট ছিল তাও কেটে গেছে। চিকিৎসকদের সুরক্ষা সরঞ্জামও আনা হচ্ছে। করোনা রোগীদের চিকিৎসায় চমেক হাসপাতাল, বিআইটিআইডি, জেনারেল হাসপাতাল এবং চট্টগ্রামের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মিলিয়ে মোট ৯০০ ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ-পিপিই রয়েছে। এর মধ্যে উপজেলাগুলোর জন্য ২৫০টি পিপিই। পুরো বিভাগের জন্য আরো ৩৫০টি পিপিই আসছে। তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে চট্টগ্রামের কাউকে হোম কোয়ারেন্টাইনের আওতায় আনা হয়নি। চট্টগ্রামে হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ৯৪৭ জন।

হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা লোকজনের অধিকাংশই প্রবাসী। যারা হোম কোয়ারেন্টাইনের আওতামুক্ত হয়েছেন, তাদের জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। কিট আসার পর ফৌজদারহাটে বিআইটিআইডিতে সন্দেহজনক ২২ জনের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১টির ফলাফল নেগেটিভ এসেছে। ১টির ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাসান শাহরিয়ার কবির ভোরের কাগজকে বলেন, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় নগরীর ৬টি বেসরকারি হাসপাতালে ২টি করে আইসিইউ শয্যা প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতাল নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। কন্ট্রোলরুমের দায়িত্বরত ফোকাল পারসন ডাক্তারদের নাম এবং ফোন নম্বর দেয়া হয়েছে। এসব নম্বরে করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত তথ্য আদান-প্রদান করা হচ্ছে।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj