করোনায় উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার

বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২০

বিশ্ব অর্থনীতিতে রীতিমতো তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে কোভিড-১৯। অভূতপূর্ব এক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বৈশ্বিক শিল্পোৎপাদন খাত। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোসহ বৈশ্বিক অর্থনীতির রথী-মহারথী সব দেশেরই উৎপাদন খাত এখন পুরোপুরি ধরাশায়ী। ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে পুঁজি, মুদ্রা ও পণ্যবাজার। অর্থনৈতিক এ মহাদুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি থেকে নিজ নিজ দেশের আর্থিক খাত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সর্বোপরি নিজ জনগণকে সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে নেয়া হয়েছে প্রণোদনামূলক নানা পদক্ষেপ। যদিও এ করোনা সুনামির ঢেউয়ের আঘাত কীভাবে সামাল দেবে বাংলাদেশ, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস বিশ্বকে অর্থনৈতিক মন্দার দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে এক বিশ্ব মন্দা, যার মাত্রা হয়তো অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।

মারণ এই ভাইরাসের মোকাবিলায় দেশে দেশে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে তা এই জটিল বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট নয় বলেও বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। সম্প্রতি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জাতিসংঘ মহাসচিব সাংবাদিকদের বলেন, এটা এমন এক সময়, যখন বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে সমন্বিতভাবে উদ্ভাবনী কর্মপন্থা ঠিক করে কাজে নামতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানিতে মারাত্মক ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে প্রতিদিনই ক্রয়াদেশ হারাচ্ছে গার্মেন্ট মালিকরা, নতুন অর্ডারও আসছে না। এ রকম মহাসংকটের মুখে গার্মেন্ট বন্ধ ঘোষণা করা হবে কিনা সে বিষয়ে বিজিএমইএ বা সরকার গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। গভীর এই সংকটে নানা রকম ক্ষতির বিষয় মাথায় নিয়ে গার্মেন্ট চালু রাখার প্রশ্নে অনেক উদ্যোক্তাই সংক্ষুব্ধ। কেননা রপ্তানি অর্ডারের সঙ্গে উৎপাদনের সম্পর্ক এবং উৎপাদনের সঙ্গে শ্রমিক কর্মচারীর কাজের মজুরি প্রদানের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

৮০টিরও বেশি দেশ এরই মধ্যে আংশিক বা পূর্ণভাবে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। লকডাউনে রয়েছে এর অধিকাংশই। পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত চালু থাকলেও বিদেশিদের ঢুকতে দিতে চাচ্ছে না কেউই। ফলে সৃষ্ট আর্থিক সংকটের কারণে গার্মেন্ট মালিকদের অনেকে সময়মতো মজুরি পরিশোধ করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। রপ্তানির সঙ্গে বিদেশ থেকে কাঁচামালসহ নিত্যপণ্য আমদানিও প্রায় বন্ধের পথে। সব মিলিয়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ভয়াবহ সংকটের দিকেই যাচ্ছে।

নভেল করোনা ভাইরাসের বিস্তৃতির প্রভাব হিসেবে আগামী দিনগুলোয় বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ বেকারত্ব, কর্মসংস্থান সংকট ও দারিদ্র্যের সম্মুখীন হবে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। সংস্থাটির প্রাথমিক এ মূল্যায়ন অনুযায়ী অর্থনৈতিক ও শ্রম সংকটে নতুন করে যুক্ত হতে পারে আরো আড়াই কোটি মানুষের বেকারত্ব। ভাইরাসটির স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ছাড়াও বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিকের জীবনযাত্রায়ও প্রভাব পড়তে যাচ্ছে বলে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে আইএলও।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে মহাসংকটে পড়েছে তৈরি পোশাক খাত। একদিকে ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিচ্ছে না, পুরনো অর্ডারেও কাটছাঁট করছে। আবার অনেক ক্রেতা কারখানায় উৎপাদিত পণ্য জাহাজীকরণ করা থেকে বিরত থাকতে বলেছে। কারণ বিদেশি ক্রেতা ও তাদের ব্র্যান্ডগুলো ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশে বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় কারখানা চালু রাখলে ইউটিলিটি বিল (গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি) এবং শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে। আগে যেসব পণ্যের শিপমেন্ট করা হয়েছে, সেই রপ্তানি বিলও পাওয়া যাচ্ছে না।

ইতোমধ্যেই দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমেছে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডায় ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। দেশগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অন্য সব দোকানপাট ও প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। গ্যাপ, নাইকি, ইন্ডিটেক্সের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন দেশে তাদের বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে।

দেশের অর্থনীতির দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে ব্যাংকের মাধ্যমে। ব্যবসা বাণিজ্য সংকটে পড়লে ব্যাংক খাতও সংকটে পড়বে। ব্যাংকগুলো আমানত ও ঋণের সুদ হার যথাক্রমে ৬ ও ৯ শতাংশ কার্যকর করতে যাচ্ছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ব্যাংকগুলো ৬ শতাংশ হারে আমানতের সুদ হার কার্যকর হয়েছে। আগামী ১ এপ্রিল থেকে ঋণের সুদ হার ৯ শতাংশ কার্যকর করার কথা। কিন্তু দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামায় ঋণের সুদ হার কার্যকর নিয়ে ব্যাংকারদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ এঁকেছে।

ব্যাংকগুলোর ঋণ খেলাপি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সরকারের ঋণ অবলোপন ও পুনঃতফসিলে ব্যাপক ছাড় দেয়ার পরও খেলাপি ঋণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তার ওপর করোনায় অর্থনৈতিক দুরবস্থা ব্যাংকগুলোর জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো।

করোসা ভাইরাসের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় সম্প্রতি ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ সুবিধার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, আগামী জুন পর্যন্ত কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধ না করলেও ঋণের শ্রেণিমানে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। এর ফলে বর্তমানে কোনো ঋণগ্রহীতা যদি ৩০ জুন পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাহলে তাকে খেলাপি করা যাবে না। তবে যদি কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতা এই সময়ের মধ্যে ঋণ শোধ করেন তাকে নিয়মিত ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে। অর্থাৎ ১ জানুয়ারি ঋণের শ্রেণিমান যা ছিল, আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত ওই মানেই রাখতে হবে। এর চেয়ে বিরূপ মানে শ্রেণিকরণ করা যাবে না।

সরকারের ঋণ নীতিমালায় ছাড় দেয়ার ফলে স্বল্প মেয়াদে হয়তো ঋণ খেলাপি বোঝা যাবে না কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাবে। এ মুহূর্তে ব্যাংকগুলো বেশি দুশ্চিন্তায় আছে রপ্তানি বাণিজ্য বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্প নিরবচ্ছিন্ন থাকবে কিনা তা নিয়ে। কারণ এসব রপ্তানি শিল্প শ্রমঘন হওয়ায় কারখানা চালু না রাখতে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকদের বেতন দেয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। এখানে দেশের অনেক বড় স্বার্থ জড়িত। এর সঙ্গে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয় রয়েছে। আবার কারখানা বন্ধ করে দিলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেবে। সব মিলিয়ে ব্যাংকেই এগিয়ে আসতে হবে রপ্তানি শিল্প রক্ষার করার জন্য।

সব কিছু নির্ভর করছে দেশে এবং বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে করোনা ভাইরাস কতদিন অব্যাহত থাকে তার ওপর। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সার্বিকভাবে সরকারসহ সবাইকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতি উপলব্ধি করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কীভাবে দেশের অর্থনীতিকে আমরা সুষম ও টেকসই করতে পারি সে বিষয়ে ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার জোরালো পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এজন্য সর্বপ্রথম আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন দরকার। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায়, ব্যাংক আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতাদের স্বার্থ রক্ষার্থে, সর্বোপরি দেশের আর্থসামাজিক উন্নতিকল্পে নিরপেক্ষভাবে ব্যাংকিং নীতিমালাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন করা হলে বিভিন্ন সমস্যা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারব- এটাই সবার প্রত্যাশা।

এম এ মাসুম : ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
ড. মো. তাসদিকুর রহমান

আসুন সরকারের নির্দেশনা মানি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

ব্যক্তিগত আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ঐক্যের বিকল্প কিছু নেই

বিভুরঞ্জন সরকার

আমরা কথা ও কাজে এক হব কবে?

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

করোনায় গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

করোনার জন্য প্রস্তুতি

Bhorerkagoj