মহামারি হলে দায়ী হবে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা

মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২০


আমরা ক্রমেই ঢুকে পড়ছি গভীর গাড্ডায়, অথচ আমরা বুঝতে পারছি না। ইতালিও বোঝেনি। তারা উপেক্ষা করেছিল তাদের প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগীকে। চীনও পাত্তা দেয়নি চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াংয়ের আশঙ্কাকে। বরং পুলিশ তাকে চরমভাবে হুঁশিয়ারও করে দেয় ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে। পরে ২৩ জানুয়ারি যখন উহান শহরটি বন্ধ করা হলো ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মহামারি তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। লি ওয়েনলিয়াং কাজে ফিরে বুঝতে পারেন যে তিনি নিজেও সংক্রমিত হয়েছেন। পরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও পাঁচ বছর বয়সী সন্তানকে রেখে ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। সংক্রমণ শুরুর প্রায় দুই মাস পর গত ২১ ফেব্রুয়ারি ইতালিতে প্রবেশ করে প্রাণঘাতী করোনা। এরপর মাত্র এক মাসের মধ্যেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে দেশটি। চীন, জাপান, কোরিয়ায় নৃত্য করে ভাইরাস ইউরোপে ঢুকেছে, ইরানে ঢুকেছে। লন্ডন লকডাউনে।

১৯১৮ সালে আমেরিকাসহ কিছু রাষ্ট্রে যে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি দেখা গিয়েছিল, তাতে পাঁচ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিলেন। পৃথিবীতে মোট জনসংখ্যার অনুপাত হিসাব করলে এখনকার হিসাবে ওই সংখ্যা ২০ কোটি দাঁড়াবে। ১৯১৮-এর গবেষকদের হাতে যন্ত্রপাতি কিছুই ছিল না। ভাইরাস দেখতে কেমন, তাও জানা ছিল না। ১০২ বছরে গবেষণা অনেক এগিয়েছে। এখন ভাইরাসকে যন্ত্রে দেখা যায়। তার জিনগত উপাদানও জানা যায়। তা সত্ত্বেও করোনা ভাইরাস আক্রমণ মহামারি ঘোষিত। ১০২ বছর আগের মতো না হলেও, মানুষ এখনো ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যথেষ্ট অসহায়। মহামারি বিস্তারের অন্তর্নিহিত পদ্ধতি নিয়ে বেশ কিছু গাণিতিক মডেল রয়েছে। সুস্থ মানুষের সংক্রমিত হওয়ার, পুনরায় সুস্থ হওয়ার, কিংবা মারা যাওয়ার হারের সংখ্যামান এসব ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘বেসিক রিপ্রোডাকশন নম্বর’ (বিআরএন) অর্থাৎ একজন আক্রান্ত গড়ে সংক্রমিত করে কতজনকে, সেটা মহামারি ছড়াবার একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। ‘বিআরএন’ যত বেশি হবে, মহামারি ছড়াবে তত দ্রুত। আক্রান্তদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার মূল উদ্দেশ্য এই ‘বিআরএন’কে কমানো।

গত দুই দশকেই দুনিয়া দেখেছে অনেকগুলো মহামারি। ২০১৪-এর মার্সের ‘বিআরএন’ অনেক কম (০.৩-০.৮) হলেও অন্য অনেক ক্ষেত্রেই ‘বিআরএন’-এর মান ছিল বেশ চড়া। কাজেই করোনা ভাইরাস নিতান্তই আব্বুলিশ ভাইরাস নয় যে হালকা স্পর্শ বুলিয়ে চলে যাবে। আমরা যখন জানি যে এই ভাইরাসের সঙ্গে সরাসরি লড়াই না করে এড়িয়ে যাওয়া ভালো। কারণ এই ভাইরাসে জীবনকাল ২ ঘণ্টা থেকে ৮ ঘণ্টা। আমাদের হাতে কোনো ওষুধ বা প্রতিষেধক নেই। কাজেই সতর্কতা নিয়ে ভাইরাসটি এড়িয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু আমরা আসন্ন বিপদের গভীরতা বুঝতে পারছি না। নিজেকে গৃহবন্দি না করে মাস্ক সংগ্রহে ব্যস্ত হয়েছি। পকেটে রেস্ত থাকলে আগুন দামে কিনে ঘুরে বেড়াচ্ছি মলে বা হলে। ফিরে এসে আবার তুমুল দামে কেনা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে ভাবছি- ভূত আমার পুত, করোনা আমার ঝি, মাস্ক-স্যানি সঙ্গে আছে করবি আমার কী? কিন্তু ব্যাপারটা অত সোজা নয়। যারা সংক্রামিত তাদের হাঁচি-কাশির ড্রপলেট এই সতর্কতার ছিদ্র বেয়ে আমার শরীরে প্রবেশ করতে পারে। আরেকটা ভয়াবহ দিক এই যে, আমি যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছি এই সম্ভাবনা আমরা চট করে স্বীকার করি না। কিন্তু বাস্তব চিত্র কী? কম বয়সী টগবগে ছেলেমেয়েদের বা সুস্থ-সবল মাঝ বয়সীদের যেমন সংক্রমণের আশঙ্কা কম বা সংক্রমণ হলেও বিপদের আশঙ্কা তেমন নেই। এরাই মূলত বিদেশফেরত ও করোনা ভাইরাসের কেরিয়ার। দেশে ফিরে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন যত্রতত্র। এর ফলে বিপদে পড়ছেন বয়স্ক মানুষজন, যাদের বিপদের আশঙ্কা বেশি। সম্প্রতি ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ধূমপায়ী ও ডায়াবেটিস-হাইপ্রেশারে আক্রান্ত ৬৯-এর চেয়ে বেশি বয়সী পুরুষরাই নভেল করোনা ভাইরাস সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি মারা যান। চীনের উহানে ১৯১ জন কোভিড ১৯-এর রোগীর ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছে, তাদের মধ্যে যে ৫৪ জন মারা গিয়েছেন, তাদের বেশির ভাগেরই ডায়াবেটিস ও হাইপ্রেশার ছিল এবং বয়স ছিল ৭০-এর বেশি।

সার্ক গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলো ঘন জনবসতিপূর্ণ দেশ। এসব দেশে করোনার চ্যালেঞ্জ খুব সহজ নয়। আর সেই কাজটা একা করাও যে খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয় সেটা সাধারণ মানুষের বোঝা দরকার। এক্ষেত্রে সার্ক দেশগুলো পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে অবিলম্বে কনফেডারেশন গঠন করে দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়লে এই আক্রমণ অনেকটাই এড়ানো যাবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রে অতি দ্রুত বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রথমেই তিনি সার্ক গোষ্ঠীভুক্ত সব দেশের মধ্যে একটি ভিডিও কনফারেন্স ডেকেছেন। তিনি সব ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং অন্যান্য সাবধানতা নেয়া হয়েছে অতি দ্রুত। সার্ক গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর জন্য ভারত ১ কোটি ডলার প্রথমে দিয়ে একটি ফান্ড তৈরি করেছে। কিন্তু অর্থ করোনার প্রতিষেধক নয়। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ৯০ হাজার ডাক্তার প্রতিদিন রোগী দেখছেন। তাদের পক্ষে ১-৫ মিটার দূরত্বের সতর্কবাণী মেনে চলা কার্যত অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে রক্ষাকবচই ভরসা। কিন্তু ‘পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট’ (পিপিই) তো দূর অস্ত, মাস্ক সরবরাহ করতে গিয়েই নাভিশ্বাস উঠছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পিপিই (পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) ড্রেস, এন-৯৫ মাস্ক, ফ্লাই মাস্ক এবং থার্মাল গান পাঠানো অত্যন্ত জরুরি।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার রবিবারে ডেকেছে জনতা কারফিউ। মুম্বাইয়ের সব অফিস ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ রাখার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। ওই সময়ে বন্ধ থাকবে সব দোকানও। তবে এ ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হবে মুদি, সবজি এবং ওষুধের দোকানকে। দিল্লির সব শপিংমল বন্ধ করে দেয়ার হয়েছে। মুদি, সবজি এবং ওষুধের দোকানগুলোর মতো জরুরিভিত্তিক দোকানগুলো খোলা রাখা হবে। ৩১ মার্চ পর্যন্ত সব রেস্তোরাঁ বন্ধ। তবে হোম ডেলিভারির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। আগেই সরকারি এবং বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলো ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ। এত কাণ্ডের প্রয়োজন কী? সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং সংক্রমণের স্টেজ টু থেকে স্টেজ থ্রিতে যাতে না যায়। কাতারে কাতারে লোক যাতে না মরে। কিন্তু সার্ক গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলো সবাই এ নিয়ম মানছে তো? না, মানছে না। বেশ কয়েকটি দেশকে দেখে মনে হচ্ছে তারা চলেছেন গজেন্দ্রগমনে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে তাই বারেবারে। জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবে সংক্রমণ? যে ভাবে হাতের বাইরে চলে গিয়েছে ইরান বা ইতালিতে? রোগ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। কালকে আজকের দ্বিগুণ। এমনটা হলে এই সীমিত স্বাস্থ্যসেবার এই দেশগুলোতে, মানুষ পথে-ঘাটে মরবে। মেনে নিতে পারব তো?

কলকাতা থেকে
অমিত গোস্বামী : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj