ঐক্যের বিকল্প কিছু নেই

সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২০


ক্রিকেটে বাংলাদেশ ভালো করছিল। আমাদের খেলোয়াড়রা ইতোমধ্যেই বিশ্বমাপে উন্নীত হয়েছেন। জাতির জন্য তাঁরা গৌরব বয়ে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু অবস্থানটা ধরে রাখতে পারছেন কি? পারছেন না। কারণ পুঁজিবাদ সেখানেও ঢুকে পড়েছে। দেশের শ্রেষ্ঠ ক্রিকেট প্লেয়ার যিনি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ জুয়াড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার। সাময়িকভাবে তিনি খেলার জগৎ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। জানা গেছে, আমাদের খেলোয়াড়রা কেউ কেউ অত্যন্ত বেশি টাকা উপার্জন করেন। তাঁদের বাজারদর খুবই চড়া। অন্যরা অতটা দাম পান না এবং নিজেদের বঞ্চিত জ্ঞান করেন। এর মধ্যে ক্রিকেট ব্যবস্থাপনা বোর্ডের আয়-রোজগারও বেশ ভালো। বোর্ড নাকি খেলোয়াড়দের তাদের যা প্রাপ্য তা দেয় না। অধিকাংশ খেলোয়াড়ই তাই অসন্তুষ্ট। তাঁদের বিক্ষোভ উচ্চ পর্যায়ে উঠেছে; তাঁরা ধর্মঘট পর্যন্ত করেছেন। এসব প্রভাব স্বভাবতই গিয়ে পড়েছে খেলার মানের ওপর। অনেক হৈচৈ করে ভারতে খেলতে গিয়ে বড় মাপের অসম্মান ঘাড়ে নিয়ে তাঁরা ফিরেছেন। জাতীয় সম্মানবোধের যে চেতনা নিয়ে তাঁরা যাত্রা শুরু করেছিলেন সেটা এখন যে আর অক্ষত নেই তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। তাঁদের ঐক্য এখন আর অনড় নয়, ঐক্যের ভেতরে ব্যক্তিস্বার্থের অন্তর্ঘাত চলছে। সবকিছু ভাঙছে, খেলোয়াড়দের দেশপ্রেম কেন ভাঙবে না? সবাই সর্বক্ষেত্রে জিজ্ঞাসা করে, আমি কি পেলাম? পেতে চায়, দিতে ভুলে গেছে। অথচ দিয়েছে তো। প্রাণ দিয়েছে মুক্তি সংগ্রামে। শুরুটা যার অনেক আগে, একটা পরিণতি একাত্তরে। একাত্তরের মুক্তির সুফল এখন ব্যবসায়ীদের হাতে এবং ব্যবসায়ের অধীনে চলে গেছে রাজনীতি। রাজনীতির লোকেরা যখন একাত্তরের কথা খুব জোরে জোরে বলেন, তখন সন্দেহ হয় ভেতরটা শূন্য এবং তালটা মুনাফার। পণ্য হিসেবে একাত্তরকে ব্যবহার করছেন। একাত্তরের চেতনাটা ছিল সমাজ বিপ্লবের; সেটাকে ঢেকে রেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলা একাত্তরের শহীদদের ও যোদ্ধাদের অপমান করা বৈকি। বুঝুন আর না-ই বুঝুন ওই কাজটা যাঁরা করেন তাঁদের উদ্দেশ্য মুনাফা লোভই, অন্যকিছু নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অত্যন্ত বড় ও প্রথম আয়োজনে যে ঘুষ প্রদান ঘটে সেটা হলো মুক্তিযোদ্ধাদের সার্টিফিকেট প্রদান। ওই সার্টিফিকেট দেখিয়ে চাকরিতে উন্নতি, পারমিট লাইসেন্স হাতিয়ে নেয়া, চাকরিপ্রাপ্তি, সম্পত্তি জবরদখল, প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা, সব চলতে থাকল।

মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা গিয়েছিলেন তাঁরা কেউই সার্টিফিকেট লাভের আশার দ্বারা চালিত হননি। তাগিদটা ছিল পুরোপুরি দেশপ্রেমিক, সার্টিফিকেট দান ব্যবস্থা চালু করে দেশের প্রতি ওই প্রেমকে পরিণত করার চেষ্টা হলো মুনাফালিপ্সাতে। সুযোগ করে দেয়া হলো ওই হস্তগতকরণকে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা অনেকেই বঞ্চিত হলেন। শত শত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দেখা গেল। উড়ে এলো। জুড়ে বসল। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চাকরিতে কোটার ব্যবস্থা করা, সেই কোটাকে পুত্রকন্যা এবং পরে নাতি-পুতিদের পর্যন্ত প্রসারিত করে দিয়ে যুদ্ধের প্রতি কেবল যে অসম্মান প্রদর্শনের স্থায়ী আয়োজন তৈরি করা হলো তাই নয়, বঞ্চিতদের মনে যোদ্ধাদের প্রতি বিদ্বেষ উৎপাদনের জন্য একটি ক্ষেত্র প্রস্তুতও হয়ে গেল। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা, ভাতা বৃদ্ধি, জাল সার্টিফিকেট তৈরি, সবকিছুর মধ্য দিয়েই পরিমাপ ঘটতে থাকল মুক্তিযুদ্ধের সমাজবিপ্লবী চেতনা থেকে রাষ্ট্রের সরে যাওয়ার। রাষ্ট্রের জন্য অত্যাবশ্যক ছিল হানাদার শয়তানদের বিচার। নিকৃষ্টতম অপরাধী হিসেবে ১৯৫ জনকে চিহ্নিতও করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র তাদের বিচার করতে পারল না। অপরাধীরা সবাই চলে গেল তাদের দেশে। এতবড় অপরাধের যখন বিচার হলো না তখন আশঙ্কা করা স্বাভাবিক হলো যে এ রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার পাওয়াটা সহজ হবে না। পরবর্তী সময়ে প্রমাণ হয়েছে যে আশঙ্কাটা অমূলক ছিল না।

আমাদের এ রাষ্ট্র পুঁজিবাদী। বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এক প্রান্তে তার অনাত্মসচেতন অবস্থান; পুঁজিবাদের গুণগুলো যেমন-তেমন, পুঁজিবাদের যত দোষ আছে সবগুলোই সে আত্মস্থ করে ফেলেছে এবং ক্রমবর্ধমান গতিতে বিকশিত করে চলছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটা অসংশোধনীয়রূপে পিতৃতান্ত্রিক; যে জন্য এই ব্যবস্থায় মেয়েরা নিরাপত্তা পায় না এবং নানাভাবে লাঞ্ছিত হয়। পদে পদে তাদের বিপদ। গৃহে সহিংসতা, পরিবহনে হয়রানি। একাধিক জরিপ বলছে বাংলাদেশে মেয়েরা জানিয়েছে তাদের শতকরা ৯৮ জন উন্মুক্ত জায়গাতে হয়রানির শিকার হয়। মেয়েরা এখন গায়ে বোরখা চাপিয়ে, হিজাবে চেহারা লুকিয়ে রেখেও রক্ষা পায় না। মেয়েমানুষ, তার এত দেমাক কেন, এই নীতিতে দীক্ষিত সাগিরা মোর্শেদকে শাস্তি দেন তাঁর ভাসুর, যিনি একজন চিকিৎসক। চিকিৎসক হিসেবে যতই তাঁর প্রসার হোক না কেন, একজন পিতৃতান্ত্রিক স্বৈরাচারী ভিন্ন অন্যকিছু নন। তাঁর স্ত্রী, যাঁর প্ররোচনায় তিনি ওই কাজে ব্রতী হয়েছেন, সে ব্যক্তি একজন মহিলা ঠিকই, কিন্তু আসলে পিতৃতান্ত্রিক, অর্থাৎ কিনা কর্তৃত্ববাদী, অসহিষ্ণু। নত হতে অসম্মতকে শাস্তি দিতে তাঁর ভয়ঙ্কর রকমের উৎসাহ, যেটি তিনি সংক্রমিত করেন তাঁর স্বামীর ও ভাইয়ের ভেতর। সাগিরা প্রাণ হারান। পাশাপাশি জেল খাটেন নিরপরাধী মন্টু মণ্ডল।

ব্যবস্থাটা এই রকমেরই যে স্বৈরাচারীরা অতিসহজে পার পেয়ে যায় এবং পুনর্বাসিত হয়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন ঘটে ঠিকই, কিন্তু লোকটি আবার ফেরতও আসে। তাঁর জেল হয়, কিন্তু লোকটির আসল যে দুটি অপরাধ সে দুটির কোনোটিরই বিচার হয় না। মস্ত বড় অপরাধ ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখল করা। সেটি নির্জলা রাষ্ট্রদ্রোহিতা। তার বিচার না করে আলতু-ফালতু সব অপরাধ নিয়ে টানাটানি করা হয়। এরশাদের দ্বিতীয় অপরাধ মঞ্জুর হত্যায় তাঁর চেষ্টার সংশ্লিষ্টতা। এই অপরাধটির জন্য তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। আদালতের আদেশে তদন্ত হয়েছে, কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হলো না; পুনঃতদন্ত, তারপরে আবার তদন্ত, বিচারক বদলি, এই সমস্ত সময় ক্ষেপণের মধ্য দিয়ে তিনি নির্বিচারে পরলোকে চলে গেলেন। রাষ্ট্র উদাসীন এমন কথা কেউ বলতে পারবে না, কিন্তু প্রয়োজনমাফিক সে উদাসীন হতে জানে বৈকি।

এরশাদের স্বৈরশাসনের পতনের অনুঘটকদের মধ্যে দুজন ছিলেন প্রধান, ডাক্তার শামসুল আলম খান মিলন এবং কিশোর নূর হোসেন। এটা ভেবে লজ্জায় ও দুঃখে আমাদের অধীর হতে হয় যে তাঁদের হত্যার কোনো বিচার হয়নি। মিলনের মা বলেছেন বিচার পাওয়ার আশা তিনি এখন আর করেন না। ঘাতক এরশাদ তো পালিয়েই গেছেন। নূর হোসেনের মা বিচার পাওয়ার আশা তো ছেড়ে দিয়েছেনই, উল্টো মৃত সন্তানকে অপমানের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য অবস্থান ধর্মঘট করেছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে। (আর কোথাও কী জায়গা আছে যাওয়ার?) নূর হোসেনের অসম্মান করেছেন পতনের-পরে-উত্থিত এরশাদের জাতীয় পার্টির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান রাঙ্গা সাহেব। তিনি বলেছেন নূর হোসেন কোনো বিবেচনাযোগ্য ব্যক্তি ছিল না; তাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থবাদীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে হৈচৈ করেছে, নূর হোসেন আসলে ছিল একজন ভবঘুরে, নেশাখোর; সে ইয়াবা ও ফেনসিডিল সেবন করত। বলার পরে মহামতির খেয়াল হয়েছে যে নূর হোসেনকে যখন তাঁদের মহান নেতা স্বৈরাচারী এরশাদ সাহেব হত্যা করেন তখন দেশে ইয়াবার তো নয়ই, ফেনসিডিলেরও প্রচলন ছিল না। তবে খেয়াল তিনি মোটেই করতেন না যদি নূর হোসেনের বিধবা মা সন্তানের সম্মান রক্ষার জন্য উদ্যোগটা না নিতেন। এরশাদ সাহেব জেলে গিয়েছিলেন, জেল থেকে বের হয়ে শহীদ নূর হোসেনদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন মাফ চাইবার জন্য; জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নূর হোসেনের মৃত্যুর জন্য দুঃখও প্রকাশ করেছেন; আজ তিনি প্রস্থান করেছেন, কিন্তু তাঁর সুযোগ্য রাজনৈতিক চেলা রাঙ্গা সাহেব নূর হোসেনকে দিব্যি অপমান করছেন। এমনটা যে ঘটছে তার কারণটা কি? কারণ হলো স্বৈরাচারী যায় ঠিকই, কিন্তু স্বৈরাচার যায় না; থেকে যায় এবং ব্যবস্থার আনুক‚ল্য পেয়ে রয়ে-যাওয়া স্বৈরাচার আরো খলবল হয়ে ওঠে। আমাদের দেখতে ও সহ্য করতে হয়েছে আইয়ুব খানের পতনের পর তার চেলা ইয়াহিয়া খান স্বৈরাচারের ব্যাপারে আপন প্রভুকেও ছাড়িয়ে-ওঠার ঘটনা। কারণ ওই একই, হাকিম বদলায়, হুকুম বদলায় না এবং হাকিমের হুকুম দেয়ার ক্ষমতাটা আরো বৃদ্ধি পায়।

তাহলে ভরসা কোথায়? একটা ভরসা এই যে দুষ্ট লোকেরা যতই ক্ষমতাবান হোক, ভালো মানুষেরাও আছেন এবং তাঁদের সংখ্যাই অধিক। ধরা যাক বগুড়ার লাল মিয়ার কথা। সাগিরা মোর্শেদের হত্যাকারীদের খবর নিয়ে যখন চাঞ্চল্য সৃষ্টি হচ্ছিল ঠিক সেই সময়ই তো পাওয়া গেল লাল মিয়ার খবর। লাল মিয়া সামান্য রিকশাচালক। কিন্তু তিনি অসামান্য এক কাজ করেছেন। একজন যাত্রী ভুল করে লাল মিয়ার রিকশাতে ২০ লাখ টাকার নোট ভর্তি একটি ব্যাগ ফেলে যান। লাল মিয়া যাত্রীকে খুঁজতে থাকেন, না পেয়ে ব্যাগ নিজের জিম্মায় রেখে দেন, মালিক ব্যাগের সন্ধান করবেন এই আশায়। মালিক ঠিকই সন্ধান করেছেন এবং যা তিনি ঘটবে বলে ভরসা করেনি তাই ঘটেছে, লাল মিয়া নিজের কাছে রাখা ব্যাগটি মালিককে ফেরত দিয়েছেন। আমাদের সরকারি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা যখন লোপাট হয়ে যায় তখন এই ভালো মানুষের খবরটা আশা জাগায় বৈকি। এবং ঘটনাটি যে ব্যতিক্রম তাও বলা যাবে না। এরকমের ভালোমানুষির দৃষ্টান্ত প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যাবে।

কিন্তু ভালো মানুষরা তো দুর্বল, তাঁদের ক্ষমতা নেই, তাঁরা বিচ্ছিন্ন, একাকী এবং গোটা ব্যবস্থাটা তাঁদের বিরুদ্ধে। কর্তৃত্ব ঠগদের হাতে। তবে ভালো মানুষরা পারেন যখন তাঁরা একত্র হন। একত্র হয়েছিলেন বলেই আইয়ুব খানের পতন, বাংলাদেশের অভ্যুদয়, এরশাদের বিদায়, এসব ঘটনা ঘটেছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
ড. মো. তাসদিকুর রহমান

আসুন সরকারের নির্দেশনা মানি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

ব্যক্তিগত আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ঐক্যের বিকল্প কিছু নেই

বিভুরঞ্জন সরকার

আমরা কথা ও কাজে এক হব কবে?

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

করোনায় গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

করোনার জন্য প্রস্তুতি

Bhorerkagoj