হোম কোয়ারেন্টাইন : জীবন বদলে ফেলার দুর্লভ সুযোগ

শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২০


সারাবিশ্ব আজ করোনা ভাইরাসের হুমকিতে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা একে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে। বদলে গেছে পৃথিবীর চেহারা। আমাদের দেশেও ইতোমধ্যে একাধিক লোক এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। একজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। সাবধানতার স্বার্থে বিদেশ ফেরত ও তার পরিবারের সদস্যদের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কিন্তু সে নির্দেশনা অনেকেই মানছেন না। এমতাবস্থায় কর্তৃপক্ষ জরিমানা আরোপ করতেও বাধ্য হয়েছে। বতর্মান সময়ে হোম কোয়ারেন্টাইন হয়ে উঠেছে একটি বহুল আলোচিত পরিভাষা। সুতরাং আসুন জেনে নেই হোম কোয়ারেন্টাইন নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত।

হোম কোয়ারেন্টাইন

কোয়ারেন্টাইন অর্থ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পৃথক থাকা। তবে কোয়ারেন্টাইন মানে এই নয় যে, আপনাকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়া হলো। যদি কোনো ব্যক্তির করোনা ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে তাকে জনবহুল এলাকা থেকে দূরে রাখতে এবং ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কিছুদিন আলাদা থাকতে বলা হয়। ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার পর থেকে রোগের পূর্ণ প্রকাশ হতে ১৪ দিন সময় লাগে। সেজন্য হোম কোয়ারেন্টাইন করতে বলা হয়েছে ১৪ দিনের জন্য। হোম কোয়ারেন্টাইন মানে আপনি থাকবেন আপনার নিজের বাড়িতেই। তবে সাবধানে অন্যের স্পর্শের বাইরে। এখানে মনে রাখতে হবে যে, হোম কোয়ারেন্টাইন তার জন্য, যিনি এখনো পজিটিভ হননি। তবে কেউ পজিটিভ হয়ে থাকলে তাকে হাসপাতালে আলাদা করার নাম আইসোলেশন। কিন্তু হোম কোয়ারেন্টাইনকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করলে এটাই সংশ্লিষ্ট কোয়ারেন্টাইনারদের জীবনকে বদলে দিতে পারে।

এক. ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

হোম কোয়ারেন্টাইন কোনো সমস্যা নয় বরং নিজের এবং নিজের পরিবার, আপনজনকে এ দুষ্টু ভাইরাস থেকে মুক্ত রাখার একটি সুযোগ মাত্র। সুতরাং এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। মানসিকভাবে এ অবস্থাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করলে এই ১৪ দিনের স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন থাকাটাই জীবন বদলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

দুই. একা থাকার সুবর্ণ সুযোগ

পৃথিবীর পরিবেশ বদলে গেছে। হৈচৈ, সংঘবদ্ধতা, যানজট, জনজট, অধিক জনসমাগম ইত্যাদির কারণে মানুষের এখন একা থাকাটা অসম্ভবই বটে। তবে কিছু দিনের জন্য হলেও একা থাকা সব মানুষের জন্যই একান্ত জরুরি। এ অবস্থায় করোনা ভাইরাসের কারণে হলেও হোম কোয়ারেন্টাইন মানুষকে কিছুটা সময় একা থাকার দুর্লভ সুযোগ এনে দিতে পারে।

তিন. নিজেকে সময় দেয়া

প্রযুক্তির এ যুগে মানুষ হয়ে উঠেছে যান্ত্রিক। দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সম্পদ, পদ-পদবি, লোভ আর ভোগের পেছনে ছুটছি সবাই। নিজেকে একটু সময় দেয়ার অবকাশ নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন (বাতায়নিকের পত্র-২) : ‘স্থানের ফাঁকা না পেলে যেমন ভালো করে বাঁচা যায় না, তেমনি সময়ের ফাঁকা, চিন্তার ফাঁকা না পেলে মন বড় করে ভাবতে পারে না; সত্য তার কাছে ছোট হয়ে যায়। সেই ছোট-সত্য মিটমিটে আলোর মতো ভয়কে প্রশ্রয় দেয়, দৃষ্টিকে প্রতারণা করে এবং মানুষের ব্যবহারের ক্ষেত্রকে সংকীর্ণ করে রাখে।’ সুতরাং হোম কোয়ারেন্টাইনে বের করুন নিজের জন্য একমুঠো ফাঁকা সময়।

চার. বিচ্ছিন্নতা মানেই একা নয়

মানুষ মূলত দুটি জীবনযাপন করে। একটি দৈহিক ও একটি মানসিক। প্রতিটি মানুষের মধ্যে আরেকটি মানুষ থাকে যাকে আমরা ‘আমি’ বা মন বলি। আমরা জনবিচ্ছিন্ন হলেও পাহাড়, পর্বত, গভীর অরণ্য এমনকি সাগর তলে গেলেও আমার ‘আমি’ আমার সঙ্গে থাকে। সুতরাং মানুষ কখনোই একা নয়। শুধু আমার ‘আমি’কে আবিষ্কার করে তার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলাই ব্যাপার।

পাঁচ. মহামানবদের গুণার্জনের বিরল সুযোগ

মহামানবরা তাদের জীবনের একটা বিশেষ অংশ জনবিছিন্নভাবে নিভৃতে কাটিয়েছেন। জীবন দর্শন বুঝতে হলে নীরবতা-নির্জনতা-একাকিত্ব একান্ত প্রয়োজন। বিচ্ছিন্নতা মানুষকে ভাবতে শেখায়। মানুষ নিজেকে নিয়ে, নিজের স্রষ্টাকে নিয়ে, স্রষ্টার সৃষ্টিকে নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ পায়। এভাবেই গভীর চিন্তা, অনুভবের মাঝ দিয়ে মানুষের ভেতরে মহামানবীয় গুণাবলি জেগে ওঠে।

ছয়. প্রকৃতার্থে জনসমুদ্রের মাঝেও আমরা প্রত্যেকে একা

প্রয়োজনের তাগিদে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়, মেলামেশা হয়, এমনকি অনেককে মহাজনসভাবেশে ভাষণও দিতে হয়; কিন্তু প্রকৃত বিচারে আমরা জনসমুদ্রে থাকলেও প্রত্যেকে আলাদা এবং প্রকৃত অর্থে একা। আমার বিশ্বাসে আমি একা; আমার কাজে, চিন্তায়, কল্পনায় আমি একা। সুতরাং জনসমুদ্রে থাকা আর বিচ্ছিন্ন থাকার মধ্যে চিন্তাশীল মানুষের জন্য কোনো পার্থক্য নেই।

সাত. আপনজনকে চেনার অপূর্ব সুযোগ

এই সাময়িক বিচ্ছিন্নতায় আপনি চিনতে পারবেন কে আপনার প্রকৃত বন্ধু এবং আপনজন। নিয়মকানুন মেনে কে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। মুঠোফোনের মাধ্যমে হলেও আপনার নির্জনতাকে আনন্দময় করে তুলছে।

আট. সৃজনশীল হয়ে ভেতরের শক্তি জাগিয়ে তোলার এটাই তো সুযোগ

নির্দিষ্ট চাকরি বা পেশার বাইরেও প্রতিটি মানুষের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কোনো না কোনো সৃজনশীলতা। সেটাকে জাগিয়ে তোলার এমন সুযোগ আর হয় না। কবিগুরুর ভাষায় :

যে পারে সে আপনি পারে,

পারে সে ফুল ফোটাতে।

সে শুধু চায় নয়ন মেলে

দুটি চোখের কিরণ ফেলে,

অমনি যেন পূর্ণপ্রাণের

মন্ত্র লাগে বোঁটাতে।

যে পারে সে আপনি পারে,

পারে সে ফুল ফোটাতে।

সুতরাং এটা বিশ্বাস করতে শিখুন যে আপনিও পারেন, নিজের গণ্ডির বাইরে গিয়ে অন্য কিছু করে দেখাতে। দেখবেন নিজের কাছে নিজেকেই মনে হবে নতুন কেউ।

নয়. আরো বেশি করে ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড তৈরি করার সুযোগ

সোশ্যাল মিডিয়ার এ যুগে আমরা তো বেশি বেশি সময় এখানেই ব্যস্ত থাকি। মুঠোফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ নিয়ে একরকম বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করি। এখন এগুলোই আপনার সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে। মেইলিং, মেসেজিং, ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদির ইতিবাচক ব্যবহারের মাধ্যমে গড়ে তুলুন ভার্চুয়াল স্কুল; যাকে বলে ‘স্কুল অব থট’। বন্ধুত্বের নেটওয়ার্ক বাড়ান; আবার খুঁজে নিতে পারেন হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের। আর এভাবেই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আপনার সরব এবং অবশ্যই ইতিবাচক উপস্থিতি আরো জোরদার করার একটি সুবর্ণ সুযোগ হতে পারে হোম কোয়ারেন্টাইন।

দশ. দুশ্চিন্তাবিহীন হিরণ¥য় নীরবতায় কাটান কিছু সময়

এই সাময়িক বিচ্ছিন্নতাকে সমস্যা মনে না করে বরং এটাকে সম্ভাবনার অপূর্ব সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিদিন কিছুটা সময় মহান সৃষ্টিকর্তার স্মরণে কাটান, ধ্যান করুন।

এগার. বই পড়ুন

বই হলো মানুষের পরম বন্ধু। একটি ভালো বই সঙ্গে থাকা মানে একজন ভালো বন্ধু সঙ্গে থাকা। ওমর খৈয়াম বলেছেন, ‘রুটি-মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত-যৌবনা- যদি তেমন বই হয়।’ সুতরাং মনোযোগ দিয়ে বই পড়ুন; ধর্মীয় বই, দেশ ও জাতির ইতিহাস, মহান ব্যক্তিদের জীবনী এবং যে কোনো ভালো বই পড়ুন। বইয়ের সঙ্গে মিতালি গড়ে তুলুন। বইয়ের সান্নিধ্য আপনার কষ্টের মুহূর্তগুলোকে দূর করে দিতে পারে। বই মানুষের জীবনে আশার বসতি গড়ে দেয়। যেখানে অশান্তির কালো মেঘ দানা বাঁধে সেখানে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয় বইয়ের প্রতিটি অমৃতময় বাণী। অজ্ঞানতার বেড়াজাল ভেঙে আলোকের দুয়ারে এসে দাঁড়াতে সাহস জুগিয়ে দেয় বই। মানুষকে ভালোবেসে মানবিকতার জয়গান গাইতে বইয়ের জুড়ি মেলা ভার। তাই বই পড়ুন; কেবল ছাপার অক্ষরগুলোকে নয়, বরং মাঝখানের সাদা অংশটুকুও পড়ার চেষ্টা করুন। লেখক কী বলতে চেয়েছেন তা নিয়ে ভাবুন। নিজেও যা ইচ্ছে লেখার চেষ্টা করুন। হতেও তো পারে বেরিয়ে আসল একটি অমূল্য সৃষ্টি।

বার. নিজের অভ্যাসকে আরো একটু শানিত করে নিন

কিছু কিছু অভ্যাস যা একসময় আপনার মাঝে ছিল কিন্তু সময়ের ব্যস্ততায় তা হয়তো হারিয়ে ফেলেছেন। যেমন- আপনার বেডরুমে অযাচিত কেউ ঢুকে পড়ুক, আপনার ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করুক আপনি এটা চাইতেন না। হোম কোয়ারেন্টাইনে সেগুলোকে আবার একটু অভ্যস্ত করে নিতে পারেন যেমন-

১. নিজের বেডরুমে থাকুন। একটু একা থাকুন।

২. সম্ভব হলে নিজের আলাদা টয়লেট ব্যবহার করুন।

৩. নিজের তোয়ালে, গামছা এবং অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র আলাদা রাখুন।

৪. যথাসম্ভব অপ্রয়োজনীয় সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলুন, এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও।

৫. অন্য কারো সামনে যেতে একান্ত বাধ্য হলে মাস্ক পরুন।

৬. অন্যের সঙ্গে যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রাখুন।

৭. ঘন ঘন হাত ধুয়ে ফেলুন। যেসব জায়গায় বারবার স্পর্শ করার সম্ভাবনা থাকে, দিন শেষে তা ভালো করে জীবাণুনাশক দিয়ে ধুয়ে অথবা মুছে ফেলুন। যেমন- দরজার হাতল, কম্পিউটার, ফোন, টয়লেট ইত্যাদি।

এভাবে বদলে ফেলুন নিজেকে। হয়ে ওঠুন এক পরিচ্ছন্ন, পরিশীলিত ‘আমি’। শুধু কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস কেন, অন্য অনেক অপ্রত্যাশিত জীবাণুর সংক্রমণ থেকে আপনি থাকবেন সুরক্ষিত। সুতরাং হোম কোয়ারেন্টাইন আর আতঙ্কের কোনো নাম নয় বরং জীবন বদলে ফেলার একটা দুর্লভ সুযোগ বৈকি।

আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া : কবি ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj