পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতায় বাধা হচ্ছে ব্যাংক খাত

বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২০

কাগজ প্রতিবেদক : নিজেদের দুরবস্থার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাজারকে পেছনে টেনে ধরে রেখেছে ব্যাংক খাত। বাজারের সবচেয়ে বড় এ খাতের শেয়ারগুলোর দর গত ২ বছরের ব্যবধানে গড়ে কমেছে ৩৯ শতাংশ। যেখানে প্রত্যেকটি ব্যাংকের শেয়ার দর ২ বছর আগের অবস্থানের থেকে নিচে নেমে এসেছে। ব্যাংক খাতের শেয়ারের এই পতন বাজারকে এগোতে দেয়নি। দুই বছর আগে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূল্যসূচক ছিল ৫৮০০ পয়েন্ট। যা এখন কমে এসেছে ৪৪৬০ পয়েন্টে। অর্থাৎ সূচক কমেছে ১৩৪০ পয়েন্ট বা ২৩ শতাংশ। সূচকের এই পতনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক খাতের পতন। এছাড়া গত বছরের এবং গত সপ্তাহের বাজারের পতনে অগ্রণী ভূমিকা ছিল ব্যাংক খাতের।

দীর্ঘদিন ধরেই দেশে ব্যাংক খাতের দুরবস্থা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। বিভিন্নভাবে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ হয়ে যাওয়ায় এ খাতের মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এছাড়া স্বজনপ্রীতি ও অব্যবস্থাপনা ব্যাংকের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যা প্রত্যক্ষভাবে পুঁজিবাজারেও নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে এবং রাখছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পুঁজিবাজারের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ব্যাংক খাত। আর সেই ব্যাংক খাত কয়েক বছর ধরে নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণের মাত্রা বেড়েছে। যাতে ব্যাংক খাতের ব্যবসায় যেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, একইভাবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়েছে। এতে ব্যাংকের শেয়ার তলানিতে চলে এসেছে। যার প্রভাব পুরো বাজারে পড়েছে। জানা গেছে, গত ২ বছর আগে তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের গড় শেয়ার দর ছিল ২৯.৩৪ টাকা। যা চলতি বছরের ২ মার্চে নেমে এসেছে ১৭.৯৮ টাকায়। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর গড়ে শেয়ার দর কমেছে ১৭.৯৮ টাকা বা ৩৯ শতাংশ। ব্যাংক খাতের এই পতন বাজারের উন্নতি হতে দেয়নি। এদিকে গত ২ মাসেও ব্যাংক খাতের শেয়ারে বড় পতন হয়েছে। যাতে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরের গড় ১৯.৭০ টাকার শেয়ার এখন ১৭.৯৮ টাকায় অবস্থান করছে। অর্থাৎ গত ২ মাসে ব্যাংক খাতের গড়ে শেয়ার দর কমেছে ১.৭২ টাকা বা ৯ শতাংশ। ব্যাংক খাতের এতই দুরবস্থা যে, তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকেরই শেয়ার দর গত ২ বছরের ব্যবধানে কমেছে। একটি ব্যাংকেরও শেয়ার দর ২ বছর আগের অবস্থানে নেই। এই দুরবস্থায় ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে ৮টির বা ২৭ শতাংশের শেয়ার দর এখন অভিহিত মূল্যের নিচে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে স্বল্পমেয়াদি আমানত সংগ্রহ করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয়। যা ঝুঁকিপূর্ণ ও ঠিক না। এতে ব্যাংক খাতের ব্যবসায় ঝুঁকিতে পড়েছে এবং মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আর এই নেতিবাচক প্রভাব বাজারের অন্তরায় ভূমিকা রাখছে।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি শেষে বাজার মূলধন ছিল ৬৪ হাজার ২৫২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। যা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে কমে এসেছে ৪৮ হাজার ৭২৯ কোটি ৩০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ ২ বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের শেয়ারের দাম কমেছে ১৫ হাজার ৫২৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা বা ২৪ শতাংশ। অথচ ২০১৯ সালেও এ খাত থেকে বাজার দরে ৬ হাজার ২৫৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার বোনাস শেয়ার দেয়া হয়েছে। এ সত্ত্বেও ব্যাংকের বাজার মূলধনে শোচনীয় অবস্থা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকেরসহ অনেক কোম্পানির শেয়ার বিনিয়োগযোগ্য হলেও তাতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের আগ্রহ নেই। অথচ ২০০৯-১০ সালে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা নিয়ে আগ্রাসী হয়ে উঠে ব্যাংকগুলো। ওইসময় ব্যাংকগুলো বিনিয়োগসীমার কয়েকগুণ পর্যন্ত বিনিয়োগ করে। যা শেয়ারবাজারকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে তুলে।

অথচ এখন সেই বিনিয়োগসীমা ৪ ভাগের ১ ভাগে নামিয়ে আনার পরও এবং শেয়ার দর তলানিতে থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করে না।

অর্থ-শিল্প-বাণিজ্য'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj