পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতে অনিশ্চিত ১৭ বিমা কোম্পানি

শনিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২০

কাগজ প্রতিবেদক : আইনের বাধ্যবাধকতা এবং অর্থমন্ত্রীর নির্দেশের পরও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে ১৭টি লাইফ ও নন-লাইফ বিমা কোম্পানি। পরিশোধিত মূলধন ঘাটতি এবং ব্যবসায় লাভজনক অবস্থা না থাকায় এমন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে ১০টি বিমা প্রতিষ্ঠান এরইমধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং সংশ্লিষ্ট বিমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

আইডিআরএ কর্মকর্তারা বলছেন, কোম্পানিগুলো ব্যবসায়িকভাবে লাভে আসতে না পারলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আবেদনই করতে পারবে না। কোম্পানি কখন লোকসান থেকে লাভে আসবে সেটা অনিশ্চিত এবং সময়ের ব্যাপার। তা ছাড়া ক্যাপিটাল বাড়ানোর একটা আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে, কেউ চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে এটা বাড়ানো সম্ভব নয়। এ জন্য বাকি কোম্পানিগুলো ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগতে পারে। জানা গেছে, বিমা কোম্পানিগুলোকে অনুমোদন দেয়ার সময় ৩ বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে আসার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের দীর্ঘদিন পরেও ১৮টি লাইফ ও ৯টি নন-লাইফ বিমা কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে পারেনি। এ অবস্থায় গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর কোম্পানিগুলোকে ৩ মাসের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেন অর্থমন্ত্রী। এর প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেয় আইডিআরএ। পরবর্তী অবস্থা জানতে কয়েক দফা বৈঠকও করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে বিমা আইন এবং বিএসইসির বিধানের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দিয়েছে। বিমা আইন, ২০১০ এর তফসিল-১ এর ধারা ১ (ক) -তে লাইফ বিমা ব্যবসার জন্য বাংলাদেশে নিবন্ধিত কোম্পানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার ৬০ শতাংশ অর্থাৎ ১৮ কোটি টাকা উদ্যোক্তাদের এবং অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ১২ কোটি টাকা জনসাধারণের প্রদানার্থে উন্মুক্ত থাকবে।

এ ছাড়াও ধারা ১ (খ) -তে নন-লাইফ বিমা ব্যবসার জন্য বাংলাদেশে নিবন্ধিত কোম্পানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৪০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার ৬০ শতাংশ অর্থাৎ ২৪ কোটি টাকা উদ্যোক্তা কর্তৃক প্রদত্ত হবে ও অবিশষ্ট ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ১৬ কোটি টাকা জনসাধারণ কর্তৃক প্রদানার্থে উন্মুক্ত থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সংশোধিত পাবলিক ইস্যু রুলস, ২০১৫ এর ধারা ৩(সি) অনুযায়ী পরিশোধিত মূলধন হতে হবে সর্বনি¤œ ৫০ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে পাবলিক মানি তথা জনগণের শেয়ারের পরিমাণ হতে হবে সর্বনি¤œ ৩০ কোটি টাকা। বিমা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমা আইনের বিধান অনুসারে পুঁজিবাজার থেকে ৩০ কোটি টাকা নিলে উদ্যোক্তাদের অংশ দাঁড়ায় ৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিএসইসির সংশোধিত বিধান অনুসারে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে গেলে লাইফ বিমা কোম্পানির উদ্যোক্তার অংশ আরো ২৭ কোটি টাকা এবং নন-লাইফ বিমা কোম্পানির উদ্যোক্তার অংশ আরো ২১ কোটি টাকা বাড়াতে হবে। যা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে প্রধান বাধা বলে মনে করছেন তারা।

পুঁজিবাজারে অতালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে আলফা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, এনআরবি গ্লোবাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স, স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লাইফ ফান্ড ঘাটতি রয়েছে। তবে বিমা আইন অনুসারে এসব কোম্পানির পেইডআপ ক্যাপিটাল থাকলেও ঘাটতি রয়েছে বিএসইসির বিধান অনুসারে। অন্যদিকে বিমা আইন এবং বিএসইসির আইন দুটোর বিধান অনুসারেই পেইডআপ ক্যাপিটাল ঘাটতি রয়েছে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স, হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের। যদিও এসব কোম্পানির লাইফ ফান্ড পজিটিভ। এ ছাড়াও বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বেস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রটেক্টিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পেইডআপ ক্যাপিটাল বিএসইসির সংশোধিত বিধান অনুসারে ঘাটতি রয়েছে। তবে এসব কোম্পানির লাইফ ফান্ড পজিটিভ।

নন-লাইফ খাতের অতালিকাভুক্ত বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স ও সিকদার ইন্স্যুরেন্সের পেইডআপ ক্যাপিটাল বিএসইসির বিধান অনুসারে ঘাটতি রয়েছে। তবে বিমা আইন ও বিএসইসির আইন উভয়ের বিধান অনুসারে সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের পেইডআপ ক্যাপিটাল ঘাটতি রয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জনকারী ৪টি লাইফ বিমা কোম্পানি হলো- সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স, এলআইসি অব বাংলাদেশ ও চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এ ছাড়া নন-লাইফ বিমা খাতের ৬টি কোম্পানির পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। সেগুলো হলো- মেঘনা ইন্স্যুরেন্স, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স, সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্স ও ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স।

মূখ্য নির্বাহীরা বলছেন, বেশকটি কোম্পানি ইতোমধ্যে ইস্যু ম্যানেজার নিয়োগ দিয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি কোম্পানির ফাইল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) তালিকাভুক্তির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্সের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএসইসির আগের বিধান অনুসারে আমাদের যোগ্যতা আছে। তবে নতুন বিধান অনুসারে আরো ২৪ কোটি টাকা প্রয়োজন। আইডিআরএ’র সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, আশা করছি এর সমাধান হয়ে যাবে। ডিসেম্বর ২০১৯ এর ব্যালান্স দিয়ে আমরা পুঁজিবাজারে যেতে চাচ্ছি। সে ক্ষেত্রে মার্চ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। প্রাইম ফাইন্যান্স বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

অর্থ-শিল্প-বাণিজ্য'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj