বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে অস্বস্তির কাঁটা : দুই মন্ত্রীর সফর হঠাৎ বাতিল

শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন তিন দিনের ভারত সফর বাতিল করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লির উদ্দেশে তার রওয়ানা হওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই দুপুরের দিকে তার সফর বাতিল করা হয়। তবে কী কারণে এই সফর বাতিল করা হয়েছে তা জানা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ভারতের রাজ্যসভায় ‘বিতর্কিত’ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাসকে কেন্দ্র করে এক ধরনের অস্বস্তি সৃষ্টি হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিল করা হয়েছে।

এদিকে, শুধু পররাষ্ট্রমন্ত্রী নয়; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও গতকাল তার ভারত সফর বাতিল করেন। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমার আমন্ত্রণে আজ শুক্রবার সকাল ১১টায় সিলেটের তামাবিল হয়ে মেঘালয়ে যাওয়ার কথা ছিল তার। মন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ জানান, পরবর্তীতে উপযুক্ত সময়ে যাবেন তিনি।

ক‚টনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ‘দ্য ইন্ডিয়ান ওশান রিম এসোসিয়েশনের (আইওরা)’ সম্মেলনে যোগ দিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের ভারত যাওয়ার কথা ছিল। এ জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তিন দিনের সফরসূচিও চূড়ান্ত ছিল। সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সঙ্গে আবদুল মোমেনের বৈঠকে এনআরসি (ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি), সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়, সমুদ্রসীমায় রাডার স্থাপন সংক্রান্ত এজেন্ডা নিয়ে আলোচনারও কথা ছিল। কিন্তু গতকাল হঠাৎ করেই গুরুত্বপূর্ণ এই সফর বাতিল করা হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিলের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম জানান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে যাবেন। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার শুনানি চলছে। এ কারণে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থান করছেন। আগামী ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বরে মহান বিজয় দিবস। এই বিশেষ দিনগুলোর অনুষ্ঠান থাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেশে অবস্থান করা প্রয়োজন। এ কারণেই আবদুল মোমেনের ভারত সফর বাতিল করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর বাতিল হলেও আমাদের প্রতিনিধি পাঠানো হবে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমেরিকাস উইংয়ের মহাপরিচালক ফেরদৌসী শাহরিয়ার।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের পরামর্শেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর বাতিল হয়েছে। ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধন বিল সংসদে পাস হওয়ায় এক প্রকার মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। আসামে সংঘাত শুরু হয়েছে। এই সময় সফর করা সঠিক হবে না। এই সফর সংক্রান্ত আলোচনার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন গত বুধবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। এরপর গতকাল দুপুরে তার সফর বাতিলের ঘোষণা আসে।

এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের ভারত সফর বাতিলের পর বাংলাদেশ ও ভারতে নানান ধরনের গুঞ্জন উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকেই ভারতের সঙ্গে শক্তিশালী ক‚টনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কিন্তু তিস্তা চুক্তি না হওয়ায় ক্ষোভ থাকলেও বাংলাদেশ তার কোনো বহিঃপ্রকাশ ঘটায়নি। তার ওপর সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি ও গোলাপি বলের ক্রিকেট টেস্ট খেলার সময় কলকাতা সফরে গেলে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি। কলকাতায় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ভারত সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কোনো ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন না। এতে বাংলাদেশের ক্ষোভ থাকতে পারে। তাই এবারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিল করা হয়েছে।

আবার অনেকেই মনে করেন, আসামে এনআরসির তালিকা করা নিয়ে বাংলাদেশ কিছুটা সংশয়ে ছিল। পরবর্তীতে লোকসভা ও রাজ্যসভায় নাগরিকত্ব বিল পাস হওয়ায় কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর চাপ যে কোনো সময় বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই অবস্থায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠককালে আরো বিব্রত হতেন। বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানোর জন্যই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর বাতিল করা হয়েছে।

অন্য একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ক‚টনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা হলেও ভালো অবস্থায় ফিরেছে। সেখানে কনস্যুলার অফিস খোলার ব্যাপারে বাংলাদেশ নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের এই সম্পর্ককে ভারত কখনোই ভালোভাবে নেবে না। হয়তো ভারত এ ব্যাপারে বাংলাদেশের ওপর ক্ষুব্ধ হতে পারে। ক্ষোভও প্রকাশ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি না হতেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের পূর্ব নির্ধারিত ভারত বাতিল করা হয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে।

একেবারে শেষ মুহূর্তে সফর বাতিলের বিষয়টি ভারতীয় গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পেয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, রাজ্যসভায় ‘বিতর্কিত’ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাসকে কেন্দ্র করে এক ধরনের অস্বস্তি সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিল হয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ইস্যুতে বেশ কয়েকদিন ধরেই ঢাকা অস্বস্তি প্রকাশ করছিল।

টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, ভারতের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় ‘বিতর্কিত’ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার পূর্বনির্ধারিত তিন দিনের ভারত সফর বাতিল করেছেন।

অবশ্য এর আগে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেন, প্রতিবেশী বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন না থামার কারণে তারা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলটি এনেছেন। অমিত শাহর এই বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গত বুধবার দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আমি মনে করি যে কথা উঠেছে তা সত্য নয়। আমাদের দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন, ধর্মীয় নির্যাতন হয় না। আমাদের দেশে ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসব সবার। আমাদের দেশে অন্য ধর্মের কেউ নির্যাতিত হয় না। সাম্প্রতিককালে বিদেশ থেকে আমাদের অনেক লোক দেশে ফিরে আসছে, তার কারণ হচ্ছে আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে উঠেছি এবং এখানে সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলটি আইনে পরিণত হলে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ দেশের অবস্থান থেকে পদস্খলন ঘটবে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj