সিটিং ও গেটলক সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্ত আজো বাস্তবায়ন হয়নি

শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯

দেব দুলাল মিত্র : নানান কৌশলে গণপরিবহনের মালিক-শ্রমিকদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ানোর ফলে যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রতিটি পরিবহনের স্বেচ্ছাচারিতার ফলে প্রকৃত গণপরিবহন ব্যবস্থা উঠে গিয়ে সিটিং ও গেটলক নামের কথিত বিশেষ সার্ভিস চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে যাত্রীদের কাছ থেকে তিনগুণেরও বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে সিটিং সার্ভিস ও গেটলক সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পরে এই সিদ্ধান্ত আর বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর থেকে সাধারণ গণপরিবহন সার্ভিসে নিয়োজিত বাস এবং মিনিবাসগুলোও নিজেদের ইচ্ছেমতো সিটিং, গেটলক ও স্পেশাল সার্ভিস নাম দিয়ে নগরীতে চলাচল শুরু করে। নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা হয়। আবার কোনো কোনো রুটে ১০ টাকার ভাড়া ২৫ টাকা আদায় করছে। বিআরটিএ রাজধানীর ভেতরে প্রতি কিলোমিটারের বাস ভাড়া ১ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারিত করে দেয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই দূরত্বের ভাড়া ১০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। ধানমন্ডি শংকর বাসস্ট্যান্ড থেকে সিটি কলেজ পর্যন্ত আগে ৫ টাকা এবং শাহবাগ পর্যন্ত ১০ টাকা ছিল। গেটলকের নামে এই একই দূরত্বের জন্য একজন যাত্রীকে এখন ১০-২০ টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে। মোহাম্মদুপর থেকে স্বাধীন পরিবহনে ‘ওয়েবিল’ পদ্ধতিতে ভাড়া আদায় করা হয়। এই পদ্ধতির ফলে মোহাম্মদপুর থেকে বাংলামোটর যেতে একজন যাত্রীকে ২০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। অথচ কাওরান বাজার পর্যন্ত ভাড়া রাখা হচ্ছে ১০ টাকা। হাফ কিলোমিটারের কম এই দূরত্বের জন্য আরো ১০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ মোহাম্মদপুর থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত ভাড়া ২০ টাকা, আবার মৌচাক পর্যন্ত ভাড়া ২০ টাকা। মালঞ্চ পরিবহনে মোহাম্মদপুর থেকে মৌচাক পর্যন্ত আগে ২৫ টাকা ভাড়া রাখা হতো। এখন এই ভাড়া ৩০-৩৫ টাকা পর্যন্ত রাখা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ভোগান্তিতে রয়েছেন কম দূরত্বের যাত্রীরা। কারণ দূরত্ব যাই হোক চেকার যাত্রী সংখ্যা উল্লেখ করার পর সব যাত্রীকে গুনতে হয় একই ভাড়া। মহাখালী থেকে আজিমপুর পর্যন্ত চলাচলরত সব বাসের ভাড়া ২৫ টাকা নেয়া হয়। কোনো যাত্রী ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কে নেমে গেলেও তাকে ২৫ টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে।

যাত্রীরা ভাড়া নিয়ে প্রতিবাদ করলে স্বাধীন পরিবহনসহ সব পরিবহনের কন্ট্রাকটর জানিয়ে দেয় চেকার ‘ওয়েবিলে’ যাত্রীর সংখ্যা লিখে দেয়। ওয়েবিল অনুযায়ী, তাকে প্রতিটি সিটের ভাড়া মালিককে বুঝিয়ে দিতে হয়। এখানে ভাড়া কম দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে সোজাসাপ্টা জবাব দেয়। এই বাসে সিট অনুযায়ী যাত্রী নেয়ার নিয়ম থাকলেও দাঁড়ানো অবস্থাতেও যাত্রী ঠাসা থাকে। এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানোর ব্যাপারে যাত্রীরা প্রশ্ন করলে অনেক সময় হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ব্যাপারে রাস্তায় কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্টদের কাছে অভিযোগ করেও সুফল মিলে না।

রাজধানী সব রুটেই বাস ভাড়ার নৈরাজ্য চলছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, বাস ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য নতুন নয়। ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধের ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিসেবা চালু না করলে ভাড়ার নৈরাজ্য ও সড়কে বিশৃঙ্খলা বন্ধ করা যাবে না। সরকারকে এ জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কলামিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, সড়কে অনেক বিশৃঙ্খলার মধ্যে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ও রয়েছে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের কাছে যাত্রীরা জিম্মি হয়ে আছে। আমরা সরকারকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য অনেক সুপারিশ করেছি। সর্বশেষ সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ জমা দিয়েছি। কিন্তু এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। সড়কে সব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।

সিটিং সার্ভিসের নামে যাত্রী হয়রানির দায় নিচ্ছে না বাস-মালিকরা। তারা জানান, বাসচালক ও কন্ট্রাকটর নিজের ইচ্ছেমতো বাস চালায়। তারাই এসব সার্ভিস তৈরি করে। মালিকরা তাদের এভাবে চালাতে বলেনি। সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ ভাড়ার নৈরাজ্য প্রসঙ্গে বলেন, এ ধরনের অনিয়ম বন্ধের জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছিলাম। অনিয়ম বন্ধের জন্য বিআরটিএ এবং সরকারকে বলেছিলাম। কিন্তু বিআরটিএ তখন কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj