‘কণ্ঠ’ : যেন জীবন কথা বলে

শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯

সাফটা চুক্তির আওতায় আমদানি-রপ্তানি নীতিতে বাংলাদেশের এমন কিছু ছবি কলকাতায় যায় যেগুলোর শৈল্পিক মূল্য নেই বললেই চলে। তেমনি একটি ধারণা থেকে দুই দেশের ছবি নিয়ে সুসম্পর্ক তৈরি করতে এবার ভারত গেছে আকরাম খান পরিচালিত ‘খাঁচা’। আর বাংলাদেশে মুক্তি পেয়েছে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় নির্মিত ‘কণ্ঠ’। বাংলাদেশের জয়া আহসান অভিনীত ছবিটি ঢাকার বসুন্ধরা সিটি স্টার সিনেপ্লেক্স, যমুনা ব্লুকবাস্টার্স, শ্যামলী সিনেমাস, বলাকা সিনেওয়ার্ল্ড, চট্টগ্রামের সিলভারস্ক্রিন, সিনেমাপ্লেস, আলমাসসহ দেশের বাইশটি হলে মুক্তি পেয়েছে। ‘কণ্ঠ’ নিয়ে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নন্দিতা রায় ও জয়া আহসানের সঙ্গে কথা হয় ভোরের কাগজের। সঙ্গে ছিলেন শাকিল মাহমুদ

গল্প প্রসঙ্গে…

শিবপ্রসাদ : এটি একটি বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত ছবি। বিভূতি চক্রবর্তী নামে এক ব্যক্তির জীবনের ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে কণ্ঠ। তবে আমার চেয়ে এ বিষয়ে নন্দিতাদি ভালো বলতে পারবে।

নন্দিতা রায় : ১৯৯৯ সাল! কলকাতায় আমরা একটি টিভি প্রোগ্রাম করি। সেখানে বিভূতি চক্রবর্তী আসেন। তখনই তার সঙ্গে পরিচয়। প্রথমে আমি তাকে দেখে অবাক হই। লোকটার কণ্ঠস্বর ছিল না। পরে জানতে পারি তিনি ‘ল্যারেঞ্জটমি’তে আক্রান্ত হয়ে তার কণ্ঠ হারিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দমে যাননি। লড়াই করেছেন এবং তিনি খাদ্যনালির মাধ্যমে কথা বলার কৌশল বের করলেন।

বিভূতি চক্রবর্তী একটি ‘ল্যারেঞ্জটমি ক্লাব’ও করেছেন। যেখানে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে কণ্ঠস্বর হারানো মানুষদের খাদ্যনালির মাধ্যমে কথা বলার কৌশল শেখানো হয়। বিভূতি চক্রবর্তীই আমাকে অনুপ্রাণিত করে এমন একটি ঘটনা নিয়ে ছবি বানানোর জন্য। যাতে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কণ্ঠস্বর হারানো মানুষগুলো চেষ্টা করে খাদ্যনালির মাধ্যমে কথা বলার এবং বেঁচে থাকার আশাটুকু ফিরে পায়।

জয়া আহসান : ছবিটি দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া, হতাশায় ডুবে যাওয়া মানুষদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, সংগ্রাম করার গল্প নিয়ে নির্মিত। একজন মানুষ কতটা সংগ্রাম করলে হারানো কণ্ঠ আবার ফিরে পেতে পারে তারই চিত্রায়ন হয়েছে ‘কণ্ঠ’-এ।

বাংলাদেশে ‘কণ্ঠ’

শিবপ্রসাদ : আমরা যখন ছবিটি পশ্চিমবঙ্গে মুক্তি দেই তখন নারায়না হাসপাতালের ডাক্তার পঙ্কজ ত্রিবেদী ছবিটি দেখে আমাদের জানান, এমন একটি ছবি যাতে শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতেই আবদ্ধ হয়ে না থাকে। ‘ল্যারেঞ্জটমি’ বা ‘ওরাল ক্যান্সার’ সম্পর্কে সারাবিশ্বের মানুষকে সচেতন করা উচিত। তখন আমাদেরও মনে হলো, এটি নিছক সিনেমা না হয়ে আমাদের একটা মিশন হতে পারে। কণ্ঠস্বর হারালেও খাদ্যনালি দিয়ে চেষ্টা করলেই কথা বলা যায়- এ বিষয়টা সবাইকে জানানো প্রয়োজন। তখনই এটি নিয়ে মুভমেন্ট করার চিন্তা। আর এ ছবিতে বাংলাদেশের অভিনেত্রী জয়া আহসান অভিনয় করেছেন সেদিক বিবেচনা করে প্রথমেই বাংলাদেশে আসা।

নন্দিতা : শিবুর কথা ধরেই বলা, এটি শুধু সিনেমা নয়- এটি আমাদের মিশন, মুভমেন্ট। ‘ল্যারেঞ্জটমি’ আক্রান্ত হয়ে যে মানুষগুলো হতাশ হয়ে যাচ্ছে, জীবনে সব কিছু শেষ হয়ে গিয়েছে ভাবছে তাদের জন্য এই ছবি একটি অনুপ্রেরণা। সে দিক থেকে সারা বিশ্বেই কণ্ঠকে নিয়ে মুভমেন্ট করার ইচ্ছে। তবে প্রতিবেশী বন্ধু দেশ ও আমাদের কণ্ঠ টিমের একজন এই দেশের, তাই বাংলাদেশে আসা।

চরিত্র সম্পর্কে…

শিবপ্রসাদ : এই ছবিটিতে আমার চরিত্র একজন রেডিও জকির। যার কাজই কথা বলা। কিন্তু এক সময়ে তার কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়। হতাশায় ভেঙে পড়ে সে। তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে লড়াই করে বেঁচে ওঠা! অভিনয় কতটুকু করতে পেরেছি জানি না তবে একজন অভিনেতা হিসেবে চরিত্রটার চ্যালেঞ্জটা উপভোগ করেছি।

জয়া আহসান : এখন পর্যন্ত অনেক ছবিতে অনেক চরিত্রেই অভিনয় করেছি, কিন্তু সব চরিত্রই মনে থাকে না বা থাকার মতো হয় না। ‘কণ্ঠ’ ছবিতে আমি একজন

স্পিচ থেরাপিস্ট চরিত্রে অভিনয় করেছি। ‘কণ্ঠ’-এ অভিনয় করতে গিয়ে আমাকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যার ফলে এই চরিত্রটি হৃদয়ে দাগকাটার মতো একটি চরিত্র হয়ে থাকবে।

শিবপ্রসাদ ও নন্দিতার সঙ্গে কাজ

জয়া আহসান : ভারতের অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী শিবুদা ও নন্দিতাদির সঙ্গে কাজ করার জন্য স্বপ্ন দেখে। আমিও দেখেছি। কিন্তু সে স্বপ্ন এরকম একটি সুন্দর গল্পে, সুন্দর চরিত্র উপহার দিয়ে তারা পূরণ করবে তা ভাবতে পারিনি। তবে তাদের সঙ্গে কাজ করতে পারার অভিজ্ঞতা আমার অভিনয় জীবনে মাইলফলক হয়ে থাকবে। কিছু চরিত্র থাকে যা অভিনয় জীবনে আঁচড় কাটতে পারে। ‘কণ্ঠ’ সিনেমায় আমি তেমনই একটি চরিত্র করেছি।

এটি করতে পেরে আমার ভীষণ আত্মতৃপ্তি পেয়েছি। সিনেমাটিতে কাজ করতে গিয়ে আমি এমন সব ক্যান্সার আক্রান্তদের সঙ্গে মিশেছি, যাদের দেখে আমি জীবনীশক্তি পেয়েছি। আমার মনে হয়েছে, আমরা বেঁচে আছি এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। আসলে এ সিনেমাটি মানুষের জীবনে প্রেরণা জোগাবে।

দর্শকদের উদ্দেশ্যে…

শিবপ্রসাদ : পশ্চিমবঙ্গে ছবিটি আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে সাদরে গৃহীত হয়েছে। আমি আশা করি বাংলাদেশেও প্রাক্তন, বেলাশেষে, পোস্ত, হামি’র মতো ‘কণ্ঠ’ দর্শকরা সানন্দে গ্রহণ করবে। তবে দর্শকের কাছে অনুরোধ, সিনেমা হলে গিয়ে দেখুন। বাংলা সিনেমাকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পাইরেসি করে আমাদের চলচ্চিত্রকে ধ্বংস করে দিবেন না।

নন্দিতা রায় : পশ্চিমবঙ্গে সিনেমাটি এতটাই সাফল্য পেয়েছে যে, মুক্তির পর প্রথম ১১ দিনে দুই কোটি রুপি আয় করে। ভারতে যখন লোকসভা নির্বাচন চলছিল, সে সময়েই সিনেমাটি মুক্তি পায় এবং এমন ব্যবসা করেছে। পাশাপাশি সবাই সিনেমাটি গ্রহণও করেছেন। আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের দর্শকও ‘কণ্ঠ’ পছন্দ করবেন। সবাইকে সিনেমাটি দেখার অনুরোধ করছি।

জয়া আহসান : বাংলাদেশের মানুষের একটা কৌত‚হল ‘জয়া কলকাতায় কি ছবিতে অভিনয় করে!’ শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় নির্মিত ছবি প্রথমবারের মতো ফরমালি বাংলাদেশে মুক্তি পেল এবং ভাগ্যবশত আমি ছবিতে অভিনয় করেছি। তাই আপনাদের কৌত‚হল দূর করতে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমাটি দেখবেন। আশা করি নিরাশ হবেন না।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj