অন্য এক হুমায়ূন আহমেদ

শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প যখন অশ্লীলতার দায় নিয়ে কিংবা গল্পের অভাবে বিভিন্ন সংকটের ভেতর মুখথুবড়ে পড়েছিল, দর্শকরাও রীতিমতো পর্দা থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করেছিল সেই সংকটকালীন আলোকিত বাতিঘর হয়ে জ্ব¡লেছিলেন কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। সমস্ত গল্পের ঝুলি খুলে তিনি নির্মাণ করেছিলেন একের পর এক কালজয়ী সব চলচ্চিত্র কিংবা নাটক। চলচ্চিত্র নির্মাণে দেখা যায় অন্য এক হুমায়ূন আহমেদকে। কখনো তার উপন্যাস কিংবা গল্পকেও চাপিয়ে গেছে তার চিত্রনাট্যে নির্মিত নাটক কিংবা চলচ্চিত্র। হিমু, রূপা কিংবা মিসির আলির মতো মানুষের মনে গভীর দাগ কেটেছিল বাকের ভাই, বদি কিংবা মুনা। উপন্যাস বা গল্পের মতো তার নির্মিত চলচ্চিত্রও মানুষের মনে গণজোয়ার সৃষ্টি করেছিল।

নব্বই দশকের শুরুতে তার উপন্যাসের চরিত্ররা প্রথম টিভির পর্দায় হাঁটতে শুরু করেছিল। তার কল্পনার মানুষেরা স্বতঃস্ফ‚র্ত হয়ে ধরা দিয়েছিল দর্শকের মনে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত তথা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ জেনেছিল হুমায়ূন আহমেদ শুধু সাহিত্যিকই নন, একই সঙ্গে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক। আমরা জানি, বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সেনাবাহিনী, রাজাকার-আলবদর মিলে ১৯৭১ সালে এ দেশের মানুষের ওপর যে নির্মম নির্যাতন-গণহত্যা চালিয়েছিল তার ছবি বা সে সময়ে ঘটে যাওয়া জঘন্য ঘটনাবলীর কথা আজো মনে হলে বা কোথাও পড়লে যে কেউই শিউরে ওঠে। চোখে ভেসে ওঠে ‘বাংলার মাটি ভিজে গেছে রক্তে’। মুক্তিযুদ্ধের কথা হুমায়ূন আহমেদের গল্প বা উপন্যাসে নানাভাবে ঘুরেফিরে এসেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস ‘আগুনের পরশমণি অবলম্বনে ১৯৯৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’। যেখানে যুদ্ধকালীন অবস্থার ভেতর এক পরিবারের জীবনযাপন পরিলক্ষিত হয়, দেশ স্বাধীনের প্রত্যয়ে এ দেশের যুবসমাজের নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়। মন্তাজের ভেতর ফুটে ওঠে যুদ্ধকালীন বাস্তবতা। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তিনি নির্মাণ করেছিলেন ‘শ্যামল ছায়া’ যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা। যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে বাঁচতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সাধারণ মানুষ, তবু যুদ্ধের ভয়াল নির্মমতা থেকে তাদের মুক্তি নেই। সর্বত্র বিপদ, যে কোনো সময় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ হতে পারে। একমাত্র দেশের স্বাধীনতাই পারে জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে। আজো সেই চলচ্চিত্রে ফারুক আহমেদ ও এজাজুল ইসলামের লাল-সবুজের পতাকাকে স্যালুট দেয়ার দৃশ্য দেখে যে কারো গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে উঠবে। হায়, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা।

হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র বা উপন্যাসে মানব জীবনের হাসি-কান্না, শ্রেণি বৈষম্য, মান-অভিমান, প্রেম-ভালোবাসা, স্বপ্ন, মৃত্যু, কখনো কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ; সহজভাবে বললে মানব মনের সূ² অনুভূতির সবকিছুই উঠে এসেছে। উদ্ভট সব চরিত্রের ভেতর দিয়ে দর্শকদের হাসাতে হাসাতে কৌতুক করে সমাজের বিভিন্ন গোঁড়ামি বিষয়কে নিয়ে করেছেন ব্যঙ্গাত্মক পরিবেশনা। আবার কখনো ‘দুই দুয়ারি’র মতো অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সাদা ক্যাপ পরা বোহেমিয়ান যুবকের চোখে দেখিয়েছেন জীবন দর্শন। যে যুবক নিজেই নিজেকে চেনে না, বিভিন্ন প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরে, উত্তর খুঁজে বেড়ায়। রবীন্দ্রনাথ যেমন তার এক কবিতায় বলেছিল, ‘প্রথমদিনের সূর্য/প্রশ্ন করেছিল/সত্তার নূতন আবির্ভাবে/কে তুমি- মেলেনি উত্তর’।

হয়তো এভাবে মানুষের ক্ষুদ্র জীবন চলে যায়। তবু কেউ কাউকে পুরোপুরি জানা সম্ভব নয়। এমন দ্বিধাদ্ব›দ্ব নিয়ে কখনো হাসি কখনো কান্নার রংয়ে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায় তার চলচ্চিত্রের চরিত্ররা। শ্রাবণ মেঘের দিনে বৃষ্টিতে ভিজে মানুষের মন। আজো নন্দিত নরকে ধর্ষিত হয় প্রতিবন্ধী কিশোরী। তার শেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’তেও ফুটে উঠে বিকৃত যৌনতার শিকার এক তরুণ প্রাণ ‘কমলা’র আর্তনাদ। বিত্তশালীদের হাতে জিম্মি শিল্প-সংস্কৃতি। প্রখ্যাত হুমায়ূন আহমেদ সহজভাবে এই সমস্ত স্পর্শকাতর অনুষঙ্গও তুলে এনেছিলেন তার চলচ্চিত্রে। তার লিখিত উপন্যাস-গল্প যেন চলচ্চিত্র নির্মাণের আকর।

মূলত হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একজন সব্যসাচী লেখক। গান, গল্প, উপন্যাস, চলচ্চিত্র বা টিভি নাটকে তিনি ধরতে পেরেছিলেন এ দেশের মানুষের পালস্। মানুষও মিশে গিয়েছিল তার সমস্ত শিল্পকর্মের আখ্যানের সঙ্গে। তাই এখনো কিংবদন্তি হয়ে বেঁচে আছেন তিনি সব মানুষের অন্তরে।

:: রাব্বানী রাব্বি

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj