আঘাত হানবে আজ মধ্যরাতে : ধেয়ে আসছে ‘বুলবুল’

শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ বাংলাদেশের উপক‚লের দিকে ধেয়ে আসছে। আজ শনিবার মধ্যরাতে এটি সুন্দরবনের ওপর দিয়ে খুলনা অঞ্চল অতিক্রম করতে পারে। বুলবুলের কেন্দ্রে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১২৫ কিলোমিটার, যা বেড়ে কখনো কখনো ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত হচ্ছিল। ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে এরই মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। স্থগিত করা হয়েছে বাগেরহাটের দুবলাচরের ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব আয়োজনও।

এদিকে বুলবুলের কারণে সংকেত বাড়িয়ে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আর চট্টগ্রাম ৬ ও কক্সবাজারের জন্য ৪ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত জারি করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর উত্তাল হয়ে ওঠায় বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের এক আদেশে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সব ধরনের লঞ্চ, স্টিমার ও মালবাহী নৌযান চলাচল। ঘূর্ণিঝড়ের সময় ৫-৭ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ¡াস হতে পারে।

আবহাওয়া অফিস জানায়, প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট উষ্ণমণ্ডলীয় ঝড় মাতমো গত অক্টোবরের শেষে ভিয়েতনাম হয়ে স্থলভাগে উঠে আসে। এর একটি অংশ ইন্দোনেশিয়া পেরিয়ে ভারত মহাসাগরে এসে আবার নি¤œচাপে রূপ নেয়। পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে এসে সেটি গত বুধবার আবারো ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। তখন এর নাম দেয়া হয় বুলবুল। ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়, বুলবুল ঘণ্টায় প্রায় ১২ কিলোমিটার গতিতে এগোচ্ছে। এটি উত্তর-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে শনিবার মধ্য বা শেষ রাতে পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপ আর বাংলাদেশের খেপুপাড়ার মাঝ দিয়ে সুন্দরবন অঞ্চল হয়ে উপক‚ল অতিক্রম করতে পারে। জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টারের বুলেটিনে বলা হয়েছে, আঘাতের সময় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে বাতাসের একটানা গতিবেগ হতে পারে ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৩৫ থেকে ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়তে পেতে পারে।

বুলবুলের প্রভাবে শুক্রবার সকাল থেকেই দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ অধিকাংশ এলাকায় বিরাজ করছে মেঘলা আবহাওয়া, কোথাও কোথাও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিও হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই দক্ষিণাঞ্চলের

চর, নদী তীরবর্তী ও নি¤œাঞ্চলের মানুষকে সাইক্লোন শেল্টারগুলোতে আশ্রয় নিতে মাইকিং করা হচ্ছে। গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বলা হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক আলমগীর কবির জানান, শুক্রবার বিকেল থেকেই ঢাকা থেকে সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন স্থান থেকে ছেড়ে আসা লঞ্চগুলো ঢাকায় ভিড়তে পারছে। তবে আবহাওয়া অফিস সন্ধ্যায় সংকেত বাড়িয়ে ৪ নম্বর করায় এরপর অন্য কোনো বন্দর থেকেও আর নৌযান ছাড়তে দেয়া হয়নি।

৭ জেলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে জানমালের ক্ষতি এড়াতে ৭ উপক‚লীয় জেলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান। গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে প্রস্তুতি সভা শেষে তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের সময় ৫-৭ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ¡াস হতে পারে। তাই সরকারি উদ্ধারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের লোকজন ছাড়াও ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবী প্রস্তুত রয়েছে। তারা যথাসময়ে লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিবেন। গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও সরাতে সাহায্য করবেন তারা। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ফসল ছাড়া বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা নেই। তিনি জানান খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা জেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় রাখা হয়েছে। জেলাগুলোতে স্বেচ্ছাসেবকরা মাইকে ও ২২টি কমিউনিটি রেডিওতে সতর্কবার্তা প্রচারের কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

সেন্টমার্টিনে আটকা ১২শ পর্যটক : ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুলের’ প্রভাবে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপে বেড়াতে যাওয়া ১ হাজার ২০০ পর্যটক আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে প্রশাসন। টেকনাফের ইউএনও মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, শুক্রবার সকাল থেকে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজসহ অন্যান্য নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ফলে বৃহস্পতিবার ও এর আগে সেন্টমার্টিন দ্বীপে বেড়াতে আসা পর্যটকরা আটকা পড়েন। এ ছাড়া বিভিন্ন কাজে দ্বীপটির বাইরে যাওয়া প্রায় ৮০০ বাসিন্দা সেন্টমার্টিনে ফিরতে পারছেন না বলে জানান তিনি।

রাস উৎসবের আয়োজন স্থগিত : রবিবার থেকে ৩ দিনব্যাপী দুবলারচরে ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আশঙ্কায় তা স্থগিত করা হয়েছে। সুন্দরবনের দুবলা শুঁটকিপল্লির ১৫ হাজার জেলেসহ পর্যটকদের ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। গতকাল বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সুন্দরবনের পাশে ছোট্ট একটি দ্বীপ দুবলার চর। বঙ্গোপসাগরের বুকে কুঙ্গা এবং মরা পশুর নদীর মোহনায় জেগে ওঠা এ চরে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে রাসমেলা। মূলত মণিপুরীদের প্রধান উৎসব হলেও বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় বিভিন্ন স্থানে এ উৎসব পালন করে থাকে। ‘রাসলীলা’ নামেও পরিচিত এ উৎসব কার্তিক-অগ্রহায়ণের পূর্ণিমা তিথিতে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ, সুন্দরবনের দুবলার চর এবং কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতেও পালিত হয়। মেলার শেষ দিন প্রত্যুষে প্রথম জোয়ারে পুণ্যস্নান সমাপনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ উৎসব। ঘূর্ণিঝড়ের পর পরিস্থিতি উপযুক্ত থাকলে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj