মনস্টারদের প্রতি জিরো টলারেন্সে লালবার্তা

বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

দুর্নীতি একটি জাতির সবচেয়ে বড় সমস্যা ও কলঙ্ক। বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি ছাড়া দুর্নীতিমুক্ত জাতি গড়া সম্ভব নয়। দুর্নীতি তখনই হয় যখন নেতৃত্বের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকে না। আমাদের জাতীয় উন্নয়নের অন্তরায় এখন দুর্নীতি। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘অপরাধী-দুর্নীতিবাজ যত বড়ই হোক, এমনকি দলের হলেও ছাড় দেয়া হবে না। অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’ অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি এটাও বলেছেন, ‘দুর্নীতি যেন উন্নয়ন খেয়ে না ফেলে।’ তিনি দুঃখ করে বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, ‘আমরা সারাদিন খেটেখুটে এত কাজ করি, এখন যদি দুর্নীতির কারণে তা নষ্ট হয়ে যায়, তবে সেটা হবে দুঃখজনক।’ ক্ষমতাসীন দলের নেতারা যদি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেন, তাহলে কর্মীসহ অন্যরা দুর্নীতি করার সাহস ও সুযোগ পাবে না। বঙ্গবন্ধু দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন এমন কোনো উদাহরণ নেই। তাই তার কাছের সহযোদ্ধারা দুর্নীতি করার সাহস পাননি। বরং বঙ্গবন্ধু দুঃখ করে বলেছেন, ‘আমার কৃষক করাপশন করে না, আমার শ্রমিক করাপশন করে না। করাপশন করে শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা।’ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। বর্তমান হাসিনা সরকারের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক বেশি। কিছুটা বিলম্বে হলেও তিনি গত ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দল ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ নেতাকে ইঙ্গিত করে তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।

গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগে হাজার হাজার অনুপ্রবেশকারী ঢুকে পড়েছে। কেন্দ্রের প্রভাবশালী নেতা-মন্ত্রী-এমপিদের হাত ধরে অনেকে নৌকায় উঠেছে। এদের অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে নাশকতা, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী হত্যা, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিসহ মাদক মামলা। সম্প্রতি দুর্নীতির সঙ্গে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের নাম ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসার পর এ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়, যা সরকারের ভাবমূর্তি ¤øান করছে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনার পর দুর্নীতি দমনে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সরকারের এই লালবার্তার লক্ষ্য দুর্নীতির সঙ্গে যেসব মনস্টার জড়িত তাদের প্রতি জিরো টলারেন্সসহ অন্যদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম অন্য সংগঠনগুলোর কিছুসংখ্যক নেতাকর্মীর কারণে জনমনে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে তা সরকার নিরসন করতে চায়। সরকারের এই দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও মনস্টারদের ধরা পড়া দেখে বিএনপির নেতাকর্মীরা মহা উল্লাসে সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু ’৭৫-পরবর্তী জিয়াউর রহমানের সরকার দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক ছিল। রাজনীতি রাজনীতিকদের জন্য দুর্বোধ্য করার ঘোষণা দিয়েই জিয়াউর রহমান তা করেছেন। হাজার চেষ্টা করেও রাজনীতিকে আর সেখান থেকে ফেরানো সম্ভব হচ্ছে না। এরশাদের সরকারও দুর্নীতির রাজা ছিল। আর জিয়াউর রহমানের বিধবা পতœী খালেদা জিয়া ও তার দুই ছেলের দুর্নীতির কথা তো পৃথিবীর সবাই জানেন। তাদের শাসনামলে দেশ পরপর পাঁচবার দুর্নীতিতে বিশ্বসেরা হয়। দুর্নীতির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে খালেদা জিয়া এখন জেলে। আর তারেক জিয়া পলাতক আসামি। দুর্নীতি আর জঙ্গিবাদ ছিল তাদের রাজনীতির অনুষঙ্গ।

ক্ষমতাধর অপরাজনীতিকদের কারণে পুলিশ বাহিনী জনগণের আস্থা হারিয়েছে। তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত করতে মূলত অপরাজনীতিই দায়ী। অতীতের রাজনীতিকরা পরিশুদ্ধ ও জনকল্যাণকর কাজ করলে পুলিশের পক্ষে জনবিরোধী কাজ করা সম্ভব হতো না। তারা ক্রিমিনালদের বন্ধু না হয়ে জনগণের বন্ধু হতেন। সরকারের অন্যান্য দপ্তরে দুর্নীতির জন্যও রাজনীতির লোকরাই দায়ী।

পুলিশ বাহিনীর জন্য জনগণের আস্থা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, পুলিশকে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। এবার পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ নিয়ে একটি লোকও দুর্নীতি বা ঘুষ দেয়ার কথা বলতে পারেননি। স্বচ্ছতার সঙ্গে এবার পুলিশ সদস্য নিয়োগ হয়েছে। কারণ জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করার জন্য এ পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রতি বছর পুলিশ কনস্টেবল ও এসআই নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। কনস্টেবল নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫ লাখ থেকে শুরু করে ৮ লাখ টাকার চুক্তির বিষয়ে গুঞ্জন রয়েছে। এবারো একই রকম আর্থিক লেনদেনের আশঙ্কায় সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থান নেয়া হয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। এর আগে সংশ্লিষ্ট জেলার মন্ত্রী, এমপি ও ক্ষমতাধর নেতাদের চাপে এবং লেনদেনের কারণে ফিজিক্যালি ও মেন্টালি আনফিট প্রার্থীদের নিয়োগ দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে হেয় করা হয়েছে। ২০১৪-১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের আগুন-সন্ত্রাস মোকাবেলায় দুর্বলতার কারণে অনেক পুলিশ সদস্য মার খেয়েছেন এবং কয়েকজন মারাও গেছেন।

একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, লেনদেন ও রাজনৈতিক বিবেচনায় পুলিশে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে পারে না। এসব পুলিশ সদস্য চাকরিতে এসে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। যা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলে। রাজনৈতিক বা আর্থিক সুবিধায় চাকরি পাওয়া পুলিশ সদস্যরা নিয়োগ পাওয়ার পরপরই চাকরি হওয়ার সময় যে অর্থ ঘুষ দেয়, তা সুদাসলে তুলতে ঘুষ-দুর্নীতিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এসব কারণেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে এ ধরনের কঠোর উদ্যোগ নিয়েছেন বর্তমান আইজিপি।

জাতীয় চরিত্রের এই চরম অবক্ষয়ের যুগে পুলিশের আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারীর এই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অবস্থান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। পুলিশ সদর দপ্তরের যেসব সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা এই মহৎ কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে পুলিশপ্রধানকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে সহায়তা করেছেন তাদের প্রতিও জাতি কৃতজ্ঞ। যেসব জেলা এসপি পূর্ব থেকেই ঘোষণা দিয়ে পুলিশপ্রধানের সাহস ও শক্তি বাড়িয়েছেন তারাও প্রশংসার যোগ্য। এতে পুলিশ বাহিনী যেমন উপকৃত হবে তেননি দেশ ও জাতিও উপকৃত হবে। পুলিশ ও বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। পুলিশ বাহিনীর ভেতরে বিশেষ করে থানা পর্যায়ে বহু ঘুষখোর পুলিশ সদস্য রয়েছেন। তারা জনগণের বন্ধু নয়, ক্রিমিনালদের বন্ধু হিসেবে কাজ করছেন। ধীরে ধীরে তাদেরও সংশোধনের চেষ্টা চালাতে হবে। সম্ভব না হলে চাকরিচ্যুত করতে হবে। জাতির প্রত্যাশা পুলিশ বাহিনীর মতো সরকারি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও খুব শিগগির স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। এতে সরকারের অন্যান্য বিভাগও দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ চরিত্রের অধিকারী হয়ে পুলিশ বাহিনীর মতো উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

আব্দুল খালেক মন্টু

লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj