সাংস্কৃতিক চেতনার অগ্রগতি ও বিকাশ

বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আমাদের সমাজজুড়ে অস্থিরতা, নৈরাজ্য, হত্যা, গুম, খুন, ধর্ষণ-গণধর্ষণ, শিশু ও নারী হত্যার মতো ঘটনা অবিরাম ঘটে চলেছে। এমন অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতার নজির আমাদের দেশের অতীত ইতিহাসে ছিল না। আমাদের সমাজে বিচ্ছিন্নতা এবং সামগ্রিক সাংস্কৃতিক মান নি¤œমুখী হওয়ার কারণে এমনটি হচ্ছে। আজকাল সংস্কৃতি কথাটি আমরা অনেকেই গুলিয়ে ফেলছি। সংস্কৃতি বলতে শুধু গান-বাজনা ও খেলাধুলাকেই বুঝে থাকি। কিন্তু ব্যাপারটি তেমন নয়। সাংস্কৃতিক কথাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মতো বিষয়গুলো। এই তিনটি বিষয়ের যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে প্রথমেই বলতে হবে শিক্ষা কী? এর অর্থ অল্প কথায় বলে শেষ করা যাবে না। সাধারণ অর্থে শিক্ষা মানে আলো অথবা ভালো-মন্দের পার্থক্য নির্ণয় করা। জন মিল্টনের ভাষায়- ‘শিক্ষা হলো দেহ, মন ও আত্মার সমন্বিত উন্নয়ন। জাতীয় আদর্শ ও ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করাসহ সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর যোগ্যতা অর্জনই শিক্ষা’। আবার এরিস্টটলের মতে- ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করার নামই হলো শিক্ষা’। সুতরাং শিক্ষার যে মর্মার্থ দাঁড়ায় তা হচ্ছে দেহের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে নিজের চিত্তের একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও সংকল্পের বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে জড়িত থাকে। একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষার সঠিক বাস্তবায়ন থাকা চাই। একটি জাতি তখনই বড় হয় যখন সেই জাতি শিক্ষায় বড় হয়। শিক্ষা একটি দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি করে, দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য দক্ষ ও প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরি করে। তাই শিক্ষা অর্জন যথাযথ না হলে একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে দেশাত্মবোধ, জাতীয়তাবোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার উন্মেষ ঘটা সম্ভব নয়।

এবার আসা যাক সংস্কৃতির কথায়। জীবনের রীতিনীতি ও শিক্ষার মধ্য দিয়ে নিজেকে এবং নিজের পরিবেশকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করার যে প্রবণতা, চেষ্টা তার মধ্যে নিহিত থাকে তার সংস্কৃতি। আরো বিশদভাবে বলা যায় সংস্কৃতি হলো একটি জাতির জীবনাচারণ, ধর্মীয় দর্শন, জীবিকার উপায়সমূহ, বিভিন্ন উৎসব, পালা-পার্বণ, শিল্পকলা, নৃত্যকলা, ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত ইত্যাদির উপাদান নিয়েই আমাদের সংস্কৃতি গঠিত হয়। এই উপাদানগুলোর সঠিক পাঠ জানা না থাকলে মানুষ তার জীবনপ্রবাহকে সচল রাখতে পারে না। তাই বলা যায় সংস্কৃতি মানুষের জীবনযাপনের মূলসূত্র নির্ধারণ করে। মূল্যবোধ ও ভালো-মন্দবোধ তৈরির মাপকাঠি। পরিশেষে সভ্যতার কথা। সভ্যতা মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন। সভ্যতার ক্রমবিকাশের ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান আমূল পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সভ্যতার যে প্রকৃত অর্থ মার্জিত রুচিবোধ সম্পন্ন চালচলন, যা বিজ্ঞান দর্শন, শিল্প-সাহিত্যের জ্ঞান দ্বারা পরিচালিত জীবনযাত্রা বুঝায় তা আমরা অনেকেই ভুলতে বসেছি।

আসলে সংস্কৃতি কথাটির বিশ্লেষণ অনেক আলোচনা সাপেক্ষ ব্যাপার। অল্প কথায় বলা যায় এটি মানব জীবনের উৎকর্ষ সাধনের সামগ্রিক ব্যবস্থা। পরিশীলিত সাংস্কৃতিক চর্চা আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা, সমাজ সংস্কার, ইতিহাস ঐতিহ্য, রাজনীতি, রাষ্ট্রপরিচালনা, শিক্ষাক্রম ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোকে শক্তিশালী করে। পক্ষান্তরে দুর্বল সাংস্কৃতিক চেতনা অসুস্থ করে দেশের মানুষের মানবিকবোধ। ফলে দেশে অস্থিরতা, নৈরাজ্য, খুন-গুম, নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা অহরহ ঘটেই চলছে। এর থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ সর্বব্যাপী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মতো বিষয়গুলোর সঠিক চর্চা। যার সফল বাস্তবায়ন সম্ভব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। বর্তমান সরকারের গৃহীত শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্যের একটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটানো। সেই লক্ষ্যে সরকার কাজ করে চলছে। এখন দরকার শুধু গতিশীলতা বাড়ানো ও সঠিক বাস্তবায়ন করা। দেশকে যে কোনো অনাচারের হাত থেকে রক্ষা করতে সাংস্কৃতিক চেতনার কোনো বিকল্প নেই।

মো. রেজাউল ইসলাম বাবু

রাণীশংকৈল, ঠাকুরগাঁও।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj