‘সাক্ষী সুরক্ষা’ না ‘সাক্ষ্য’ বিতর্ক : ৮ বছরেও হয়নি আইন

বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

তানভীর আহমেদ : আইন কমিশনের সুপারিশ ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর সাড়ে আট বছর পার হলেও চূড়ান্ত হয়নি ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’। স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত আইন প্রণয়ন হয়নি। ২০১১ সালে ‘সাক্ষী সুরক্ষা’ নামে একটি নতুন আইন করার উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আলোর মুখ দেখেনি। এই আইনটি আদৌ আলোর মুখ দেখবে কিনা- তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন আইন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, আলাদা আইন না করে ‘সাক্ষ্য আইন’ (এভিডেন্স অ্যাক্ট) সংশোধন করে সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা- সে বিষয়ে নেয়া হয়েছে আরেকটি নতুন উদ্যোগ।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সাড়ে আট বছর আগে প্রস্তাবিত এই আইনের খসড়া তৈরি করা হয়। শুধু তাই নয়, এটি প্রণয়নে রয়েছে হাইকোর্টেরও নির্দেশনা। এই দীর্ঘ সময়ে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পন্ন করেছে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও। অন্যদিকে, আলাদা আইন না করে ‘সাক্ষ্য আইন’ (এভিডেন্স অ্যাক্ট) সংশোধন করে সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা- সে বিষয়ে নেয়া হয়েছে আরেকটি নতুন উদ্যোগ। এ নিয়ে আবার শুরু হচ্ছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সব মিলিয়ে এই আইনের ভবিষ্যৎ এক রকম অনিশ্চিত বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন আইন প্রণয়ন অথবা বিদ্যমান কোনো আইন সংশোধন যেভাবেই হোক না কেন, সাক্ষীদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া খুবই জরুরি। কারণ, সাক্ষীর প্রতি হুমকির ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এ কারণে বিভিন্ন মামলায় সাক্ষীরা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। এ ছাড়া সাক্ষীদের অনুপস্থিতিতে অনেক ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না। এতে কোনো কোনো সময় মামলার প্রকৃত আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। পাশাপাশি বিলম্বিত হয় বিচার কার্যক্রমও।

জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক বলেন, সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে মন্ত্রণালয়। বর্তমানে ‘সাক্ষ্য আইন’ সংশোধন নিয়ে একটি কমিটি কাজ শুরু করেছে। সাক্ষী সুরক্ষার জন্য কি আলাদা আইন দরকার, নাকি সেখানে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায়- সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে এই কমিটি।

সাক্ষী সুরক্ষা আইন না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা বলেন, বর্তমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী এতদিন বলে এসেছেন এ বিষয়ে একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করবেন। আইন কমিশন থেকেও সুপারিশ পাঠায়। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আইনটি এখনো হয়নি। তিনি বলেন, সাক্ষ্য আইন একটি ভিন্ন বিষয়। এখানে সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়টি আসা ঠিক হবে না। এর জন্য একটি বিশেষ আইন করা জরুরি। যদি সাক্ষ্য আইনে সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়টি আনা হয়, তাহলে আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি আর আলোর মুখ দেখবে না। অনিশ্চিত হয়ে পড়বে সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়টি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক সানাউল হক মিয়া বলেন, আইন কমিশনের সুপারিশ ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর আট বছরেও চূড়ান্ত হয়নি ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’। তিনি আরো বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি জেলা কমিটি রয়েছে। সাক্ষীদের কল্যাণে যা যা

করা প্রয়োজন এ কমিটি তা করবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে গেছে, আইন মন্ত্রণালয় সেটি অনুমোদন করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে।

প্রসঙ্গত, আইন কমিশন ২০১১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি উল্লিখিত আইনটি প্রণয়নের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে একটি খসড়া পাঠায়। কমিশন তাদের সুপারিশমালায় সুরক্ষার অধিকার, সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য জানার অধিকার, সুরক্ষা বিষয়ে জাতীয় নীতিমালা কর্মসূচি ও বাস্তবায়ন সংস্থা, সুরক্ষা প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্তির আবেদন, আবেদনের শর্তাবলি, সুরক্ষাপ্রাপ্ত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা সাক্ষীর অধিকার, সাক্ষীদের অধিকার ভোগ নিশ্চিত করা, সাক্ষীর অঙ্গীকার, সাক্ষীর নিরাপত্তাসহ ১৯টি সুপারিশমালা পাঠায়।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj