শিক্ষা আইন প্রণয়ন : আলোর মুখ দেখবে কখন?

বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

যে দেশে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নিয়মনীতি মেনে চলা হয় না, সেই দেশে আইন না থাকলে কত যে ক্ষতিকর কাজ হতে পারে, তার একটা বড় উদাহরণ আমাদের শিক্ষা খাত। জাতীয় শিক্ষা আইন প্রণয়নের কাজ ঝুলে আছে প্রায় ৯ বছর ধরে। ২০১১ সালে শিক্ষা আইনের একটি খসড়া প্রস্তুত হলেও এখন পর্যন্ত আইনের খসড়া চূড়ান্ত করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বরং নোট-গাইড, কখনো কোচিং সেন্টারসহ শিক্ষা বাণিজ্যে যুক্ত বিশেষ গোষ্ঠীর দাপটে পিছু হটে মন্ত্রণালয় দুর্বল আইন প্রণয়নের পথেই হেঁটেছে সব সময়। এবার আবার আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে চতুর্থবারের মতো মন্ত্রিপরিষদে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিশেষ বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও শিক্ষামন্ত্রী দেশে না ফেরায় তা স্থগিত করা হয়েছে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে খসড়াটি চূড়ান্ত করে প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া জরুরি বলে মনে করছি। জানা গেছে, প্রাক-প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে আইনি কাঠামোতে আনা এবং সবার জন্য বৈষম্যহীন, অসা¤প্রদায়িক ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর আলোকে ২০১১ সালে ‘শিক্ষা আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে প্রথম সভা হয়। ওই সভায় মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে (আইন ও অডিট) আহ্বায়ক করে শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কয়েকজন সদস্যকে শিক্ষা আইনের খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়। ওই কমিটি ২০১২ সালে শিক্ষা আইনের খসড়া তৈরি করে। পরে সংযোজন-বিয়োজন শেষে ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট জনমত যাচাইয়ের জন্য আইনের খসড়া মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। খসড়া আইনে অনিয়মের জন্য শিক্ষকদের শাস্তি ও কোচিং বাণিজ্য বন্ধের বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক সংগঠনসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে আপত্তি ওঠে। শিক্ষকরা এ আইনের বিরুদ্ধে মাঠেও নামেন। এ ছাড়া নোট-গাইড বইয়ের ব্যবসায়ীদের আন্দোলন, কওমি মাদ্রাসার মালিকদের হুমকিসহ নানা বিতর্ক দেখা দিলে এই আইন প্রণয়নের কাজ থমকে থাকে। পরে আবারো এই খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হলে এতে নানারকম অসঙ্গতি থাকায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ২৩ পৃষ্ঠার খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দিয়ে নানা অসঙ্গতির কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কাজটির শ্লথগতির পেছনে নানা বিষয় জড়িত। সর্বশেষ খসড়ায় কোচিং, প্রাইভেট ও সব ধরনের নোট-গাইড বা সহায়ক বই নিষিদ্ধ করা হয়। এর পরপরই কোচিং, গাইড ও প্রাইভেট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একটি গোষ্ঠী আইনটি ঠেকাতে তৎপর হয়ে ওঠে। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কেউ কেউ কোচিং-প্রাইভেট বন্ধেরও বিপক্ষে। শিক্ষা আইন প্রণয়নের এমন দীর্ঘসূত্রতা আমরা চাই না। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যে শিক্ষা গ্রহণ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেই শিক্ষা আইন প্রণয়ন নিয়ে গড়িমসির কোনো সুযোগ নেই। সরকারের এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ জরুরি। শিক্ষা আইনকে দুর্বল করে অবাধ বাণিজ্যে যারা মত্ত তাদের ব্যবসায়ী উদ্দেশ্যকে নস্যাৎ করে দিতে হবে। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে নোট-গাইড ব্যবহার বন্ধে অভিভাবকদেরই সচেতন হতে হবে। চাহিদা না থাকলে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা এমনিতেই বন্ধ করতে বাধ্য হবে নোট-গাইড ও কোচিং ব্যবসায়ীরা। মানসম্মত শিক্ষা তথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত খসড়া আইনটি পাস হওয়া সাপেক্ষে তা বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি।

সম্পাদকীয়'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj