নোয়াখালী থেকে ৩ রোহিঙ্গার পাসপোর্ট করায় তদন্ত শুরু

বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নোয়াখালী প্রতিনিধি : নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে ৩ রোহিঙ্গা যুবকের পাসপোর্ট করার বিষয়ে তদন্তে নেমেছে পুলিশের জেলা বিশেষ শাখা (ডিএসবি)।

নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন বলেন, নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার ঠিকানা ব্যবহার করে যে ৩ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েছে এ ব্যাপারে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। এ ঘটনায় যে তদন্ত কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন, যারা সার্টিফিকেট সৃজন করছেন, যারা সত্যায়ন করেছেন, প্রত্যেকটা বিষয়ই তদন্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর পেছনে জড়িত প্রত্যেককেই চিহ্নিত করা হবে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে ওই ৩ রোহিঙ্গা যুবকের পাসপোর্টে ব্যবহৃত নাগরিকত্ব সনদ ও জন্ম নিবন্ধন সনদ সেনবাগ উপজেলার কাদরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেয়া হয়নি বলে দাবি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের। তবে ২০১৮ সালে ওই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেয়া নাগরিকত্ব সনদের সিরিয়াল নম্বরের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট আবেদনের সঙ্গে দেয়া দুটি সনদের সিরিয়াল নম্বরের মিল পাওয়া গেছে। নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল হুদা জানান, এ ঘটনায় ওই অফিসের কারো জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

চট্টগ্রামের আকবর শাহ এলাকা থেকে গত বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তারকৃত ৩ রোহিঙ্গা যুবক পুলিশকে বলেছে, তারা দালাল ধরে নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট করিয়েছে। তুরস্ক যাওয়ার আশায় তারা ঢাকা যাচ্ছিলেন ভিসার আবেদন করতে। গ্রেপ্তারকৃত ৩ জনের মধ্যে মোহাম্মদ ইউসুফ (২৩) ও তার ছোট ভাই মোহাম্মদ মুসার (২০) বাড়ি মিয়ানমারের মংডুর দুমবাইয়ে। আর মোহাম্মদ আজিজ ওরফে আইয়াজের (২১) বাড়ি মংডুর টালিপাড়ায়।

আকবর শাহ থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, ২০১৭ সালে আরাকানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযান শুরুর পর তারা পালিয়ে বাংলাদেশে আসেন। কক্সবাজারের উখিয়ায় খাইয়াংখালী হাকিমপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকছিলেন তারা।

নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল হুদা জানান, মোহাম্মদ ইউসুফ ও মোহাম্মদ মুসার পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর। তাদের বাবার নাম আলী আহমেদ, মায়ের নাম লায়লা বেগম। মোহাম্মদ ইউসুফের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ১৯৯৬৭৫১৮৭২১১১৫১৫৭, জন্ম তারিখ : ২৩ নভেম্বর ১৯৯৬, পাসপোর্ট নম্বর : উণ ০৩৪৭৩১৫, মোবাইল নম্বর ০১৮২৯-৭৭৬৮৮৪, বৈবাহিক অবস্থা : অবিবাহিত, পেশা : প্রাইভেট সার্ভিস, স্থায়ী ঠিকানা নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার কাদরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নজরপুর গ্রাম।

তার ভাই মোহাম্মদ মুসার পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে একই তারিখ এবং ঠিকানায়। তার বাবার নাম আলী আহমেদ, মায়ের নাম লায়লা বেগম। তার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ১৯৯৯৭৫১৮৭২১১১৫১৫৮, জন্ম তারিখ : ১০ জানুয়ারি ১৯৯৯, পাসপোর্ট নম্বর : উণ ০৩৪৭৩২৬, মোবাইল নম্বর ০১৮২৯-৭৭৬৮৮৪, বৈবাহিক অবস্থা : অবিবাহিত, পেশা : প্রাইভেট সার্ভিস, স্থায়ী ঠিকানা- নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার কাদরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নজরপুর গ্রাম। যদিও কাদরা ইউনিয়নের নজরপুর গ্রাম ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত কিন্তু ঠিকানায় ৭নং ওয়ার্ড ছিল।

মোহাম্মদ আজিজের নামে পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি। তার বাবার নাম জামির হোসেন, মায়ের নাম রশিদা। মোহাম্মদ আজিজের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ১৯৯৮৭৫১৮৭২১১১৫৪২৪, জন্ম তারিখ : ১ এপ্রিল ১৯৯৮, পাসপোর্ট নম্বর : উণ ০৬২৮৭৭০, মোবাইল নম্বরর ০১৯৩৯-৮৬২৯৫২, বৈবাহিক অবস্থা : অবিবাহিত, পেশা : প্রাইভেট সার্ভিস। স্থায়ী ঠিকানা লেখা হয়েছে একই উপজেলা ও ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সেনবাগ গ্রাম।

এ ব্যাপারে কাদরা ইউনিয়নের নজরপুর গ্রামের দফাদার মহরম আলী জানান, এ গ্রামে মোহাম্মদ ইউসুফ ও তার ভাই মোহাম্মদ মুসা নামে কোনো ব্যক্তি নেই এবং কোনো অফিসার ভেরিফিকেশন করতে আসেনি।

কাদরা ইউনিয়নের সেনবাগ গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মো. ইলিয়াস জানান, ওই গ্রামে জামির হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ আজিজ নামে কেউ বসবাস করেন না।

কাদরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, মোহাম্মদ ইউসুফ, মোহাম্মদ মুসা ও মোহাম্মদ আজিজের নামে ২৮ জানুয়ারি ২০১৫ সালে জন্ম নিবন্ধন সনদ ইস্যু করা হয়েছে দেখানো হলেও ইউনিয়ন পরিষদের নিবন্ধন রেজিস্ট্রার বা অনলাইনে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। তিনি বলেন, আমি ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর চেয়ারম্যান হিসেবে শপথ গ্রহণ করি। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর মুসার এবং একই বছরের ১৩ ডিসেম্বর মোহাম্মদ আজিজকে চেয়ারম্যান নাগরিকত্ব সনদ দিয়েছেন দেখানো হলেও তা আমাদের অফিস থেকে ইস্যু করা হয়নি। তবে ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত ওই সময়ে দেয়া নাগরিকত্ব সনদের মুড়িতে ১৪৮৭নং সিরিয়ালের সঙ্গে মোহাম্মদ মুসা ও মোহাম্মদ আজিজের সনদে ব্যবহৃত সিরিয়াল নম্বরের মিল পাওয়া যায়। যদিও ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত মুড়িতে ১৪৮৭নং সিরিয়ালের সদনটি কার নামে ইস্যু করা হয়েছে তা লেখা নেই।

এ ব্যাপারে ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ওই সময় সনদটি ২নং ওয়ার্ড মেম্বর জসিম উদ্দিনকে অলিখিত অবস্থায় দেয়া হয়েছিল। এরপর মেম্বর সনদটি কাকে দেন তা আমাদের জানা নেই। এ ব্যাপারে ২নং ওয়ার্ড মেম্বর জসিম উদ্দিনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সেনবাগ থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার ৩ রোহিঙ্গার পাসপোর্ট পাওয়ার বিষয় তদন্ত করে দেখা যায়, তাদের ব্যবহৃত ঠিকানায় মোহাম্মদ ইউসুফ, মোহাম্মদ মুসা ও মোহাম্মদ আজিজ নামে কারো অস্তিত্ব নেই। এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নোয়াখালী ডিএসবি অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, ভুয়া পাসপোর্ট তৈরিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিএসবির কর্মকর্তারা জড়িত। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে ৫৪ রোহিঙ্গা পাসপোর্ট তৈরি করে দেশ ত্যাগের সময় বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হয়। ওই ৫৪ জনের মধ্যে ২ জন সেনবাগ উপজেলার ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরি করেছিল। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তদন্ত না করেই রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগে ডিএসবি পুলিশের উপসহকারী পুলিশ পরিদর্শক (এএসআই) আবুল কালাম আজাদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই ঘটনায় এএসআই নুরুল হুদার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

এ ব্যাপারে জেলা বিশেষ শাখার (ডিএসবি) পরিদর্শক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, ৩ রোহিঙ্গা যুবকের পাসপোর্ট করার বিষয়ে রবিবার নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের নথিপত্র যাচাই করে দেখা যায়, ওই ফাইলে কাদরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান কর্তৃক নাগরিকত্ব সনদের কপি এবং সাবেক চেয়ারম্যান মো. ওবায়দুল হক কর্তৃক জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রদান করা হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। তাদের পাসপোর্টে উল্লেখিত জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন নম্বরগুলো জেলা সার্ভার স্টেশনে তল্লাশি করে কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, পাসপোর্ট তৈরিতে জালিয়াত চক্র ভুয়া নাম-ঠিকানার পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করেছে।

এ বিষয়ে নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল হুদা জানান, জেলা বিশেষ শাখা (ডিএসবি) আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করে রিপোর্ট দেয়ার পরই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। ৩ রোহিঙ্গার পাসপোর্ট করার বিষয়ে নিজ অফিসের কারো জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj