সমন্বিত উদ্যোগে গ্যাং কালচারে আক্রান্ত কিশোরদের সুপথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব

বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

পৃথিবীর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সঙ্গে মানুষের অসম প্রতিযোগিতা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে অপরাধ। ব্যক্তি জীবনে কমে আসছে ধৈর্যশীলতা। নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও বিরাজ করছে মাত্রাতিরিক্ত। একজন মানুষের চরম নৈতিক মূল্যবোধের ধাক্কায় ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে দেশ, জাতি, সমাজ, পরিবার। তৈরি হচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়। আর এ সামাজিক অবক্ষয়ের মূল ভূমিকা পালন করছে কিশোর ও যুবসমাজ। সম্প্রতি আলোচনার ঝড় তুলেছে কিশোর গ্যাং। গোটা রাজধানী ছাড়িয়ে এর প্রবণতার ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরগুলোতে। এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তারে মারামারি, খুন-খারাবি, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন, ইভটিজিং সবই করছে। ক্রমশ অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষ।

সূত্রমতে, কিশোর গ্যাং কালচারের যাত্রা শুরু হয় ২০০১ সালে। মূলত মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, পার্টি করা, হর্ন বাজিয়ে প্রচণ্ড গতিতে মোটর বা কার রেসিং করা, খেলার মাঠ নিয়ন্ত্রণ করা, দেয়ালে চিকা মেরে নিজেদের পাওয়ার বা অবস্থান জানান দেয়া, এমনকি মাদক গ্রহণ প্রভৃতি কর্মকাণ্ড ঘিরে গড়ে উঠেছে এসব কিশোর গ্যাং গ্রুপ। যার অগ্রণী ভূমিকা রাখছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। প্রতিটি কিশোর গ্যাংয়ের রয়েছে ফেসবুক পেইজ। শুধু বাস্তবতায় নয়, ফেসবুকেও লক্ষ করা যায় তাদের অস্তিত্বের লড়াই।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর চিত্র। শুধু রাজধানী শহরেই গড়ে উঠেছে শতাধিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ, যার মধ্যে সক্রিয় আছে ৫০টি। এসব গ্যাংয়ে অন্তত কয়েক হাজার কিশোর জড়িত। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনায়ও রয়েছে ২০-২৫টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ। এদের মধ্যে অনেকেই স্কুলের গণ্ডি পার হতে পারেনি। অথচ তারা ভয়ঙ্কর সব অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ঢাকার শিশু আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের নথি অনুযায়ী গত ১৫ বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং কালচার ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্ব›েদ্ব ৮৬টি খুনের ঘটনা নথিভুক্ত আছে। র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে প্রতিদিনই কিশোর গ্যাং সদস্যদের আটকের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, এসব কিশোর গ্যাং থেকে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাই কি যথেষ্ট?

মানব জীবন বেড়ে ওঠা পরিবেশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যার মধ্যে রয়েছে নানা অসঙ্গতি। বিশেষ করে কিশোর বয়সে বেড়ে ওঠার পরিবেশ তাকে অপরাধী হয়ে উঠতে সহায়তা করে। কারণ কিশোরদের মধ্যেই এডভেঞ্চার ফিলিং বা হিরোইজম ভাব বেশি কাজ করে। যার ফলে ইতিবাচক চর্চার দিকে ধাবিত না হয়ে নেতিবাচক চর্চার দিকে ধাবিত হয়। ভিনদেশি সংস্কৃতিও এর জন্য অনেকটা দায়ী। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে কিশোরদের ব্যবহার করার কারণেও তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে ওঠে। এককভাবে অগ্রসর না হয়ে দলগত বা সংঘবদ্ধ হয়ে নিজেদের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এখনই প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। প্রয়োজন কার্যকরী কাউন্সিল। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে হবে না; সর্বপ্রথম অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। সমাজের শিক্ষক, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি বা যাদের কথা শুনবে- এমন ব্যক্তিদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই এই গ্যাং কালচার থেকে বিপদগামী কিশোরদের রক্ষা করে আগামীর প্রজন্মকে একটি সুন্দর বাসযোগ্য পরিবেশ উপহার দেয়া যাবে।

নাজমুল করিম ফারুক

তিতাস, কুমিল্লা।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. বিল্লাল হোসেন

পথ চলতে ফোন নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ

Bhorerkagoj