বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি প্রথা চালুকরণ

বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

একটা সময় ছিল যখন দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি পেতে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির দারস্থ হয়ে লাখ লাখ টাকা প্রদানের মাধ্যমে পিয়ন, আয়া বা সহকারী শিক্ষক থেকে শুরু করে লেকচারার পর্যন্ত হওয়া যেত। এ সময় আয়া, পিয়ন বা ঝাড়–দারের যোগ্যতা এমনকি শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষকদের কোনো যোগ্যতাই বিবেচ্য ছিল না। নিয়োগের ক্ষেত্রে একমাত্র যোগ্যতার মাপকাঠি ছিল টাকার অঙ্ক। এভাবেই অবৈধভাবে টাকা লেনদেনের মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে অযোগ্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগদানের প্রক্রিয়া। যার দরুন শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড কথাটিকে আমলে নিয়ে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগদানের ব্যবস্থা না করে যেন অযোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ দিয়ে জাতির মেরুদণ্ড ভাঙার অন্তিম খেয়াল মেতেছিল একটি গোষ্ঠী। পরবর্তী সময় ২০০৫ সালে এনটিআরসিএ গঠনের মাধ্যমে আরেক দুরভিসন্ধির সৃষ্টি করা হয়। কারণ সারাদেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব দিয়ে ২০০৫ সালে গঠন করা হয়েছিল নন গভর্নমেন্ট টির্চাস রেজিস্ট্রেশন এন্ড সার্টিফিকেশন অথরিটির (এনটিআরসিএ)। যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল উত্তীর্ণ প্রার্থীদের সনদ প্রদান করার। এতে স্বজনপ্রীতির বিস্তর অভিযোগ থেকেই যায়। কারণ কমিটির হাতে নিয়োগ প্রদানের ক্ষমতা থাকায় স্বজনপ্রীতির কাছে পরাস্ত হয়ে কম নম্বরধারীরা চাকরি পেলেও উচ্চ নম্বরধারী অনেকেই চাকরি পায়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যখন এমন হাজার হাজার স্বজনপ্রীতির অভিযোগপত্র এলো তখন জাতির মেরুদণ্ড গঠনের যোগ্য কারিগর বাছাইয়ে সব ধরনের নিয়োগ বাণিজ্যকে ঝেটিয়ে বিদায় করার মানসে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সাল থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিয়োগ দানের সব ক্ষমতা দিয়ে দেন এনটিআরসিএর হাতে।

তার পর দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষকের শূন্য পদের বিপরীতে শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যে জারি করা হয় গণবিজ্ঞপ্তি। যেখানে প্রার্থীদের অনলাইনে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আবেদন করার কথা বলা হয়। প্রাপ্ত আবেদনগুলো জাতীয় মেধা তালিকার ভিত্তিতে বাছাই করে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করা হবে বলে জানানো হয়। এতে করে স্বজনপ্রীতি, নিজ এলাকার আধিপত্য, বেশি নম্বরধারীর স্থানে কম নম্বরধারীকে নিয়োগ এসব কিছুর মূলোৎপাটন করে অনলাইনে আবেদনের মাধ্যমে কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে আবেদনকারীদের প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাছাই করে নিয়োগ প্রদান করা হয়। এর ফলে দেখা যায়, এই নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত হলেও নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অধিকাংশই নিজ উপজেলা তো দূরের কথা নিজ বিভাগেও নিয়োগ পায়নি। এতে অধিকাংশ শিক্ষকই পরিবার ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে চাকরি করায় পারিবারিক বন্ধন থেকে যেমন বঞ্চিত হচ্ছেন তেমনিভাবে স্বল্প বেতন থেকে আবার বাড়ি ভাড়া বাবদ একটি বড় অঙ্ক খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়া এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়ে শিক্ষকদের করা পাঠদান আত্মস্থ করতে শিক্ষার্থীদেরও বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।

এসব সমস্যা থেকে উত্তরণে বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি প্রথা চালুর দাবিতে গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছেন সারাদেশ থেকে আগত শিক্ষকরা। বেসরকারি শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি এ বদলি প্রথার বাস্তবায়ন। আশার কথা হলো, এ বিষয়ে বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকারের সিদ্ধান্তও ইতিবাচক। কারণ ২০২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বেসরকারি শিক্ষকদের ঐচ্ছিক বদলি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল, যার সব কার্যক্রমই হবে অনলাইনে। সরকারের এমন সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে আশার আলো দেখছেন শিক্ষকরা।

পরিশেষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাতি গড়ার কারিগর মেধাবী শিক্ষকদের প্রাণের দাবি সারাদেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবৈধ ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগের যে করাল গ্রাস থেকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আপনি উদ্ধার করেছেন, তেমনিভাবে অনলাইনে ঐচ্ছিক বদলির ব্যবস্থার অনুমোদন দিয়ে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার সুযোগ দিন।

জাহিদ হাসান

শিক্ষক, ঢাকা।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj