অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে গুরুত্ব দিচ্ছি : সংসদে প্রধানমন্ত্রী

বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : তিস্তাসহ অন্যান্য সব অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে বাংলাদেশ যাতে ন্যায্য হিস্যা পায় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং সতর্কতা গ্রহণ করা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানিপ্রবাহ হ্রাসের বিষয়ে আমাদের উদ্বেগ ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে এবং এটি সুরাহার তাগিদ দেয়া হয়েছে। পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির জন্য ভারতের সঙ্গে আমাদের জোর ক‚টনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত আছে।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে মুজিবুল হক চন্নুর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা আরো বলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে এখনো তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তাদের সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় সমস্যার সমাধানের আশ^াস দিয়েছেন। আগামী অক্টোবরে ভারত সফরের সময়ও আমি এ বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করব।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে রুমিন ফারহানার প্রশ্ন ছিল, দেশে বর্তমানে মানুষ হত্যা হতে মশা মারা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা প্রয়োজন হয়। যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেঙে পড়া, অকার্যকর হওয়ার ইঙ্গিত। এই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো কি রাষ্ট্রপরিচালনায় সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা চিত্র তুলে ধরে না?

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারপ্রধানের দায়িত্ব হলো- সব মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয় করা। মন্ত্রীদের কাজের তদারকি করা। জনগণ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য। আরাম-আয়াসের জন্য আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিনি। আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। যিনি তার জীবনটাই উৎসর্গ করেছিলেন এ দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। তার কন্যা হিসেবে জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতার একটা আলাদা জায়গা রয়েছে। আমি সেটাই প্রতিপালনের চেষ্টা করি। সে জন্যই দিন-রাত পরিশ্রম করি। কোনো প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার জন্য নয়, সব প্রতিষ্ঠানকে আরো সক্রিয় রাখার জন্য আমি সদা-সর্বদা সচেষ্ট থাকি।

রুমিন ফারহানার প্রতি পাল্টা প্রশ্ন রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনার নেত্রী খালেদা জিয়ার মতো বেলা ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালে কি প্রশ্ন করে খুশি হতেন? আমরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না। কোনো প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার জন্য নয়, সব প্রতিষ্ঠানকে আরো সক্রিয় রাখার জন্য আমরা সচেষ্ট রয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশে^র রোলমডেল। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায়। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। এসব আপনা-আপনি হয়নি। সব পরিশ্রমে হয়েছে। প্রতিষ্ঠান অকার্যকর থাকলে সব অর্জন সম্ভব হতো না। কারণ রাষ্ট্র একটি যন্ত্রের মতো। এই যন্ত্রের বিভিন্ন কলকবজা যখন সমন্বিতভাবে কাজ করে, তখন রাষ্ট্র ভালো থাকে। বাংলাশে এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র ভালোভাবে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অকার্যকর রাষ্ট্রের উদাহরণ বিএনপি সৃষ্টি করেছিল। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়- এমন ব্যক্তির কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রী ঘুমিয়ে থাকতেন, তার পুত্র হাওয়া ভবন থেকে মনমতো সিদ্ধান্ত নিত। মন্ত্রী, সচিবরা হাওয়া ভবন থেকে নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনতেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য একটি অনাকাক্সিক্ষত ও অবান্তর প্রশ্ন করেছেন। তিনি মানুষ হত্যা আর মশা মারাকে একই সমতলে নিয়ে এসেছেন।

আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ^াসী হলে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়ার শাসনামলে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টার, মমতাজউদ্দীনসহ আমাদের ২১ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকেসহ আওয়ামী লীগের পুরো নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল। আইভী রহমানসহ আমাদের ২৪ নেতাকর্মী সেদিন নিহত হয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় মদদে খুনের নেশায় মত্ত হয়েছিল বিএনপি। এই সংসদে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আমি নাকি আমার ভ্যানিটি ব্যাগে করে নিয়ে জনসভায় ছুড়েছিলাম। এসব ধারণা থেকেই প্রশ্ন করে আমাকে খালেদা জিয়ার সমান্তরালে ফেলেছেন।

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ যখন আমাকে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠিয়েছে এবং আমি যখন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি, তখন আমি মনে করি মানুষের ভালোমন্দ দেখা আমার দায়িত্ব। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ ঘণ্টা ঘুমাই। বাকি সময় দেশের কোথায় কী হচ্ছে খোঁজ রাখার চেষ্টা করি এবং তার সমাধান করি। তবে সব কিছু আমাকেই দেখতে হবে তা নয়।

দেশেই ডেঙ্গু রোগের কিট তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে : সরকার ডেঙ্গু রোগীর অনুপাতে চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল বাড়িয়েছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ডেঙ্গু মৌসুমে চলতি বছরের ৩ আগস্ট পর্যন্ত ১ লাখ ৫৭ হাজার এনএস-আই এবং কম্ব কিডসহ মোট ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ ডেঙ্গু রোগ শনাক্তকরণ কিট আমদানি করেছি। গত ৬ আগস্ট থেকে বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে দেশেই ডেঙ্গু রোগের কিট তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে প্রতিদিন ৩৫ হাজার কিট সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ডেঙ্গু রোগ শনাক্তে কিট ঘাটতির কোনো আশঙ্কা নেই। মো. রুস্তম আলী ফরাজীর প্রশ্নের উত্তরে সংসদকে এসব কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, শনাক্ত এবং চিকিৎসা দেয়ার জন্য দেশের অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে আওয়ামী লীগ ৬৪ জেলায় মনিটরিং টিম তৈরি করেছে। এর লক্ষ্য হলো- জনসচেতনতা তৈরি, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজে উৎসাহিত করা, সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে, প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিতে সহায়তা করা।

বিশ^নেতার দাবিদার আমি নই : বিশ^নেতা বঙ্গবন্ধু এবং বিশ^নেতা শেখ হাসিনাকে কীভাবে আপনি হৃদয়ে ধারণ করেছেন? সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানের এই সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বিশ^নেতা নই। এটি আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম। বিশ^নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি স্বাধীনতাহীন জাতিকে মুক্ত করেছেন। নিজের জীবনের দিকে তিনি তাকাননি কখনো। জাতির পিতার সঙ্গে কারো তুলনা চলে না। তিনি দেশ শুধু স্বাধীনই করেননি। দেশের ৮২ শতাংশ মানুষ ছিল দারিদ্র্য সীমার নিচে। যখন দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাকে হত্যা করা হয়। আর এর ক্ষতির সম্মুখীন হয় দেশের মানুষ। জাতির পিতা যে উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই আমার উদ্দেশ্য। এটিই আমার উদ্দেশ্য।

রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ক‚টনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত : বাংলাদেশে আশ্রিত ১১ লাখ রোহিঙ্গার সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকার জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক ও আসিয়ানসহ অন্যান্য আঞ্চলিক ফোরামে ক‚টনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলে জানিয়েছেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। চীন, জাপান ও ভারতসহ বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালনের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। আশা করছি, বাংলাদেশের অব্যাহত ক‚টনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার শিগগিরই রাখাইনে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রুমানা আলীর ফরাজীর প্রশ্নের উত্তরে সংসদকে এসব কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj