মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মা ও ভাইয়ের সাক্ষ্য : নুসরাত হত্যা মামলার রায় এ মাসেই

বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক ও ফেনী প্রতিনিধি : ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসলি হাফেজ আহম্মদ ও বাদীর আইনজীবী শাহজাহান সাজু যুক্তিতর্ক শুরু করেন। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক শেষে চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে রায়ের তারিখ ঘোষণা করতে পারেন আদালত। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া মামলায় ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার ও ছোট ভাই রাসেদুল হাসান রায়হান। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন।

ফেনী জেলা জজ আদালতের পিপি হাফেজ আহাম্মদ ও বাদীর পক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু বলেন, শুরু থেকেই মামলার বিচার বিলম্বিত করার সব প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আসামিপক্ষ। এরপরও নুসরাত হত্যা মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে মাত্র ৪০ কার্যদিবসে ৮৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন আদালত। গত রবিবার ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ৩৪২ ধারায় সব আসামিকে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং আজ (বুধবার) থেকে যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়েছে। আশা করছি যুক্তিতর্ক শেষে এ মাসেই রায় ঘোষণা হবে।

তবে বিচার বিলম্বিত করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসামিপক্ষের আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ নান্নু বলেন, পিপির অভিযোগ ভিত্তিহীন। মামলার তদন্ত সংস্থা পিবিআই নুসরাত হত্যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এত অল্প সময়ে ৮৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করে মামলা এ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া নজিরবিহীন। তিনি আরও দাবি করেন, এ মামলার ১২ জন আসামি পিবিআইয়ের নির্যাতনের মুখে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য হয়েছে। এই জবানবন্দিতে কাউকে সাজা দিতে পারেন না আদালত।

ফেনীর আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, বিচারক, আইনজীবী, পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা চাইলে যেকোনো মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পারে। নুসরাত হত্যা মামলার ক্ষেত্রে আমরা সেই প্রচেষ্টা দেখতে পাচ্ছি। আমরা এ মামলায় প্রকৃত অপরাধীদের ফাঁসির দাবি করছি।

এদিকে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের দেয়া সাক্ষ্যে নুসরাত জাহান রাফির মা শিরিন আক্তার বলেন, গত ২৭ মার্চ আমার মেয়ে নুসরাতসহ সোনাগাজী থানায় অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করতে যাই। তখন ওসি মোয়াজ্জেম আমার মেয়ের জবানবন্দি গ্রহণ করেন। ওসির রুমে আমাকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। রুম থেকে বের হয়ে নুসরাত বলে, আমার নেকাব খুলে ওসি জবানবন্দি ভিডিও করেছে।

নুসরাতের ছোট ভাই রাসেদুল হাসান রায়হান বলেন, গত ২৭ মার্চ আমাদের বাইরে রেখে নুসরাতকে ওসির রুমে নিয়ে যায় পুলিশ সদস্যরা। রুম থেকে বের হয়ে নুসরাত বলে, ওসি তাকে আপত্তিকর কথা বলেছে। পরবর্তীতে ১২ এপ্রিল ফেসবুকে এই ভিডিওটি দেখতে পাই।

সাক্ষ্য দেয়ার পর ওসি মোয়াজ্জেমের আইনজীবী ফারুক আহমেদ তাদের জেরা করেন। এসময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নজরুল ইসলাম শামীম আদালতে উপস্থিত ছিলেন। মামলার একমাত্র আসামি মোয়াজ্জেম হোসেনকেও আদালতে হাজির করা হয়।

চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর নুসরাতের বক্তব্য গ্রহণের সময় তা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ ওঠে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে। পরে ৬ এপ্রিল ওই মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। টানা পাঁচদিন মৃত্যু সঙ্গে লড়ে মারা যান তিনি।

এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। গত ২৯ মে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করে পিবিআই। ৩০ মে মামলাটি ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ২০ জুন অভিযুক্ত ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বিচারিক আদালত। এরপর ২৭ মামলার বাদী ও নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানকে জেরার মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচার কাজ শুরু হয়।

অন্যদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গত ২৭ মে ট্রাইব্যুনালে ১২৩ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দেন পিবিআইয়ের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রীমা সুলতানা। এরপর বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। গত ১৬ জুন দুপুরে রাজধানীর শাহবাগ এলাকা থেকে মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তার করে শাহবাগ থানা পুলিশ। পরদিন ১৭ জুন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj