রবীন্দ্রনাথ, বাঁশি ও বাংলার সুর

শুক্রবার, ৯ আগস্ট ২০১৯

সেলিনা হোসেন

বাঁশি বাংলার সংস্কৃতিতে নিজস্ব সুর। বাঁশির সুর আমাদের জীবনে একটি অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। আমার বিবেচনায় তার কারণ মূলত তিনটি। এক. আমাদের বাঁশির গঠনের বিশিষ্টতা। সাধারণ মানুষের হাতে তৈরি এ বাঁশি একদিকে জীবিকার উপকরণ, অন্যদিকে সাধারণের মধ্যে অসাধারণ। আমাদেরই মাটিতে জন্মানো বাঁশ দিয়ে তৈরি, কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যে ধরনের বাঁশি ব্যবহৃত হয় সেগুলোর মতো নয়। দুই. আমাদের লোকসঙ্গীতে দুটি যন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়- বাঁশি ও একতারা। আমাদের লোকসঙ্গীতের একটি বিশেষ ধারায় বাঁশি প্রাধান্য লাভ করে। সে ধারাটি ভাটিয়ালি গানের ধারা। তিন. আমাদের পুরাণ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বাঁশির যোগ আছে। এর প্রমাণ শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিতে রাধা আকুল হন। সে বাঁশির সুরে নারী-পুরুষের সম্পর্কের অনুষঙ্গ থাকে, আধ্যাত্মিকতার গভীরতা থাকে এবং সে বাঁশির সুর যুগ-যুগান্তর পেরিয়ে এখনো আমাদের মনোজগতে ধ্বনিত হয়।

বাঁশি-সংক্রান্ত যে ঐতিহ্য রবীন্দ্রনাথ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন, সে ঐতিহ্যকে তিনি তাঁর নিজস্ব দর্শন, অনুভবের প্রতীকে পরিণত করেন। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি জীবনের অপূর্ণতাকে পূর্ণতার সমান্তরালে স্থাপন করে আমাদের। কবির উপলব্ধির মধ্য দিয়ে এসব কবিতার সত্য মানুষকে জীবন-উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি লৌকিক এবং অলৌকিক অনুভবের আলোছায়ায় সম্পৃক্ত করে আমাদের। আমরা তাঁর রচনায় কখনো দৃশ্যমান বাঁশির সুর শুনি, কখনো অনুক্ত উচ্চারণে সে সুর আমাদের মাঝে জেগে থাকে। তার বাঁশির সুর শুধু ব্যক্তি জীবনকে নয়, ভেঙে দেয় ব্যক্তি জীবনের গণ্ডিকে। সে বাঁশি সমষ্টির হয়। কখনো দিকনির্দেশনারও কাজ করে।

ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি কাব্যগ্রন্থের সূচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘বোম্বাইয়ে মেজদাদার কাছে যখন গিয়েছিলুম তখন আমার বয়স ষোলোর কাছাকাছি, বিলাতে যখন গিয়েছি তখন আমার বয়স সতেরো। নতুন-প্রকাশিত পদাবলি নিয়ে নাড়াচাড়া করছি, সে আরো কিছুকাল পূর্বের কথা। ধরে নেয়া যাক, তখন আমি চোদ্দোয় পা দিয়েছি।’

কৈশোর এবং যৌবনের এই মধ্যবর্তী সময়ে রচিত ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থে বাঁশি একটি বিশিষ্ট উপাদান। এ বাঁশি কৃষ্ণের বাঁশি। প্রেমের প্রতীক, জীবনের আর্তি। তারপরও রবীন্দ্রনাথ একই সূচনায় লিখেছেন, ‘পদাবলী শুধু কেবল সাহিত্য নয়, তার রসের বিশিষ্টতা বিশেষ ভাবের সীমানার দ্বারা বেষ্টিত। সেই সীমানার মধ্যে আমার মন স্বাভাবিক স্বাধীনতার সঙ্গে বিচরণ করতে পারে না। তাই ভানুসিংহের সঙ্গে বৈষ্ণবচিত্তের অন্তরঙ্গ আত্মীয়তা নেই। এই জন্য ভানুসিংহের পদাবলী বহুকাল সংকোচের সঙ্গে বহন করে এসেছি। একে সাহিত্যের একটা অনধিকার প্রবেশের দৃষ্টান্ত বলেই গণ্য করি।’

প্রথম গানটি লিখেছিলুম একটা ¯েøটের উপরে, অন্তঃপুরের কোণের ঘরে-

‘গহনকুসমকুঞ্জমাঝে

মৃদুল মধুর বংশি বাজে।’

‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থে বাঁশি উপস্থাপিত হয়েছে সরাসরি- তার সুর এবং সুরের ব্যঞ্জনা নিয়ে।

যেমন :

ছয় সংখ্যক পদাবলী : ইতি ছিল নীরব বংশীবটতট,

কথি ছিল ও তব বাঁশি?

সাত সংখ্যক পদাবলী : শুন সখি, বাজত বাঁশি

গভীর রজনী, উজল কুঞ্জপথ

চন্দ্রম ডারত হাসি।

এমনকি উনিশ সংখ্যক পদাবলী, যার শুরু : মরণ রে,/ তুহুঁ মম শ্যাম সমান- এই পদাবলীতে বাঁশি এসেছে এভাবে :

দূর সঙে তুহুঁ বাঁশি বজাওসি,

অনুখন ডাকসি, অনুখন ডাকসি

রাধা রাধা রাধা!

আগেই বলেছি শ্রীকৃষ্ণের এই বাঁশি রবীন্দ্রনাথকে অনুপ্রাণিত করেছিল। অন্তঃপুরের কোণের ঘরে বসে ¯েøটের উপর লেখা দুটি পঙ্ক্তির মধ্যে যে বাঁশি তিনি বাজিয়েছিলেন, পরবর্তী জীবনে সে বাঁশিকে আরও বিচিত্রতর করেছেন।

‘পুনশ্চ’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা আছে, তার নাম ‘বাঁশি’। এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বাঁশির সুরকে নানা প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ব্যবহার করেছেন। এই ব্যবহার কখনো সরাসরি, কখনো অনুচ্চারিত। তিনি আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির মধ্যে কোনো তফাৎ খুঁজে পাননি। কেননা মৃত্যু নামক সত্যের কাছে বাদশা কিংবা সাধারণ মানুষের কোনো পার্থক্য নেই। মৃত্যুর বাস্তবতা অভিন্ন। এক বৈকুণ্ঠের দিকে সবাইকেই যেতে হয়। তিনি বলেন : ‘আকবর বাদশার সঙ্গে/হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই/বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে/ছেঁড়াছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে এক বৈকুণ্ঠের দিকে।’

মৃত্যুর সঙ্গে বাঁশির এই যোগ আমাদেরকে অর্ফিয়াসের বাঁশির কথাও মনে করিয়ে দেয়। প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যু হলে অর্ফিয়াস পাতালের দেবতাকে খুশি করেছিলেন বাঁশি বাজিয়ে। বাঁশির সুরে মুগ্ধ দেবতা অর্ফিয়াসের স্ত্রীকে মর্ত্যে ফিরিয়ে দেয়ার আবেদন মঞ্জুর করেন। শর্ত ছিল পাতালের দরজা পার হওয়ার আগে পর্যন্ত অর্ফিয়াস পেছন ফিরে তাকাতে পারবে না। কিন্তু পাতালের দরজা পার হওয়ার আগে নিজেকে সামলাতে পারেনি অর্ফিয়াস। ভাবে, পিছে পিছে আসছে তো ইউরিডাইস?

মুহূর্তে ঘুরে তাকালে শর্ত ভঙ্গের অপরাধে অদৃশ্য হয়ে যায় ইউরিডাইস। বুক-ভাঙা আর্তনাদ নিয়ে ফিরে আসে অর্ফিয়াস। বেদনার এক অদৃশ্য বাঁশির সুর ঘিরে থাকে অর্ফিয়াসকে। ‘বাঁশি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথও বেদনার এক হিম-শীতল অনুভব ছড়িয়ে দিয়ে শেষ করলেন এভাবে :

‘এ গান যেখানে সত্য/অনন্ত গোধূলিলগ্নে/সেইখানে/বহি চলে ধলেশ্বরী; তীরে তমালের ঘনছায়া; আঙিনাতে/ যে আছে অপেক্ষা করে, তার/পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’

এই পঙ্ক্তির মধ্যেও অদৃশ্য বাঁশির করুণ সুর আছে, সেটা অলৌকিক বাঁশি- এ বাঁশি অনন্ত গোধূলিলগ্নে বাজে, যার কাল পরিসীমা নেই, যে বেদনা মানুষের জীবনের চিরসত্য, রবীন্দ্রনাথ বাঁশির সঙ্গে তার যোগ সবচেয়ে বেশি নিবিড় দেখেছেন। ‘ঘরেতো এলো না সে তো, মনে নিত্য আসা যাওয়া/পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’

কেন ‘বাঁশি’ কবিতায় এমন গভীর কষ্ট? বাঁশি ছাড়া কি অন্য নাম হতে পারতো না কবিতাটির? ‘কিনু গোয়ালার গলি’ দিয়ে যে কবিতার শুরু সেটা শেষ হয়েছে ধলেশ্বরী নদীর পাড়ের একটি গ্রামে একজন অপেক্ষারত নারীর ছবির মধ্যে। বাঁশির সুর যে রূঢ় বাস্তব ভুলিয়ে দিতে পারে এবং এক স্বপ্নময়, ছায়াময়, মোহময় জগতে তার উত্তরণ ঘটাতে পারে, এই বোধই এই কবিতাকে পাঠকের মনের কাছে নিয়ে যায়। এই ‘বাঁশি’ রবীন্দ্রনাথের নিজের।

‘পলাতকা’ কবিতায় একটি পোষা হরিণ এবং পাহাড় থেকে আনা একটি কুকুরছানা এক সঙ্গে খেলে বেড়ায় এবং বড় হতে থাকে। এর মধ্যে হঠাৎ করে একদিন ফাল্গুন মাসে দক্ষিণের পাগল হাওয়া বইতে শুরু করে এবং হরিণ যেন কার উদাস করা বাণী হঠাৎ শুনতে পায়। তারপর একদিন বিকেলবেলায় হরিণ মাঠের পর মাঠ পার হয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।

‘সম্মুখে তার জীবনমরণ সকল একাকার/অজানিতের ভয় কিছু নেই আর।’

হরিণের বুকে বহু যুগের ফাল্গুন দিনের সুরে বাঁশি বেজে ওঠে এবং কোথায় কোনদূরে তার আপনজন আছে তার খোঁজে সে বেরিয়ে পড়ে এবং কখনো আর ফেরে না। এই কবিতায় বসন্তের সঙ্গে বাঁশি এক হয়ে যায় এবং বসন্তের ডাক প্রেমের যে অনুভব সৃষ্টি করে তা এই কবিতার মুখ্য বিষয় হয়ে যায়। এখানে প্রকৃতির একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। বসন্তের বাঁশি যখন প্রকৃতিতে বেজে ওঠে তখন তা কেবল মানুষকে আকুল করে না, সমস্ত প্রকৃতিকেই বিহŸল করে দেয়। এই বিহŸল করে দেয়ার মধ্য দিয়ে বাঁশি এই কবিতায় একটি বিশেষ মাত্রা লাভ করে।

রবীন্দ্রনাথের একটি গান এমন : ‘আমার একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে/ভরে রইল বুকের তলা, কারো কাছে হয়নি বলা/কেবল বলে গেলেম বাঁশির কানে কানে।’

বাঁশি এখানে মানুষ, তার ওপর ব্যক্তিত্ব আরোপ করা হয়েছে। এ বাঁশির কান আছে। বুকের ভেতরের যে কথাটি অন্য কাউকে বলা যায় না, তা বাঁশিকে বলা যায়, অর্থাৎ বাঁশির সুরে সেই না বলা কথা ঘন যামিনীর মাঝে ফুটে ওঠে। এভাবে একটি ভাবনা থেকে আর একটি ভাবনায় প্রবেশ করা যায়, যেখানে বাঁশি অদৃশ্য। কিন্তু আপাত সরল অর্থের অন্তরালে মনে হয় বাঁশিকে যে ব্যক্তি ভেবে নিজের কথা বলে সে নারী। বাঁশি এ গানে নারী-জীবনের প্রতীক। যেন বাঁশি নিজেই এখানে বাঁশিওয়ালার ভূমিকা পালন করছে।

রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থে একটি কবিতার নাম ‘বাঁশিওয়ালা’। একে যদি আমি নারীবাদী কবিতা বলি তাহলে কি ভুল বলা হবে? এই কবিতায় বাঁশির সুর শুনে একটি নারীর জেগে ওঠার কথা তিনি জানিয়েছেন। বলছেন : ‘তোমার ডাক শুনে একদিন/ঘরপোষা নির্জীব মেয়ে/অন্ধকার কোণ থেকে/বেরিয়ে এল ঘোমটা খসা নারী।’

এ নারী রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে দেখা মানুষ। তার পরিচয় এমন : ‘আমি তোমার বাংলাদেশের মেয়ে। সৃষ্টিকর্তা পুরো সময় দেননি/আমাকে মানুষ করে গড়তে/রেখেছেন আধাআধি করে।’

যখন বাঁশিওয়ালা বাঁশি বাজায় তখন এই মেয়ে শুনতে পায় তার নতুন নাম। তার বেলা কাটে না। জোয়ার-জলের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। মুক্তিপারের খেয়া তার সামনে দিয়ে ভেসে যায়, ভেসে যায় ধনপতির ডিঙা। তার সামনে দিয়ে চলতি বেলার আলোছায়াও ভেসে যায়। তখন সে শুনতে পায় বাঁশির ডাক। বলে, ‘এমন সময় বাজে তোমার বাঁশি/ভরা জীবনের সুরে/মরা দিনের নাড়ির মধ্যে/দবদবিয়ে ফিরে আসে প্রাণের বেগ।’

বাঁশিওয়ালাকে তার প্রশ্ন, ‘কী বাজাও তুমি।’ তার ধারণা সেই সুর অন্যের মনে হয়তো কোনো ব্যথা জাগায়, কিন্তু ও নিজে শুনতে পায় দক্ষিণা হাওয়ার নবযৌবনের গান। শুনতে শুনতে ওর মনে হয়- ‘যে ছিল পাহাড়তলির ঝিরঝিরে নদী/তার বুকে হঠাৎ উঠেছে ঘনিয়ে/শ্রাবণের বাদলরাত্রি।’

বাঁশির সুর এভাবে তাকে সাহসী নারী করে তোলে। সকালে উঠে সে নিজের ভেতর দেখতে পায় ঝিরঝিরে নদীর পরিবর্তন। যে নদীর প্রবল ¯্রােত পাড় ভেঙে ফেলছে এবং পাথরগুলো ঠেলে সরিয়ে ফেলতে চাইছে। সে বাঁধভাঙা জোয়ারের তাড়নায় অনুভব করে :

‘আমার রক্তে নিয়ে আসে তোমার সুর।/ঝড়ের ডাক, বন্যার ডাক/ আগুনের ডাক/পাঁজরের উপরে আছাড় খাওয়া/মরণসাগরের ডাক/ঘরের শিকল-নাড়া উদাসী হাওয়ার ডাক।’

পর মুহূর্তে পাল্টে যায় বাঁশির প্রতীক- কবি বলেন ‘বজ্রে, তোমার বাজে বাঁশি, সে কি সহজ গান/সেই সুরেতে জাগব আমি, দাও মোরে সেই কান’- একদম ভিন্ন চিত্রকল্প। এ বাঁশি জীবনের ভিন্ন একটি দিককে উদ্ভাসিত করে। ‘অশান্তির অন্তরে যেথায় শান্তি সুমহান’- সব প্রতিক‚লতার বিরুদ্ধে বাঁশি প্রতিবাদী সুরে বেজে ওঠে।

গীতবিতানে অসংখ্য গানে রবীন্দ্রনাথ বাঁশির প্রতীক, বাঁশির চিত্রকল্প নানা ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছেন। ব্যক্তি থেকে সমষ্টি, সমষ্টি থেকে জাতি, জাতি থেকে দেশ সর্বত্র রবীন্দ্রনাথের বাঁশির সুর প্রবাহিত হয়ে গেছে। এ বাঁশি বাংলার, এ বাঁশি বাঙালির।

যখন বলেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি/চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস/আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি’- তখন জগৎ-সংসার তোলপাড় করে। ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে চলে যায় অনুভবের তীব্রতা। মাটি থেকে, প্রকৃতি থেকে, লোকালয় থেকে প্রতিটি মানুষের হৃদয় মথিত হয়ে যে শব্দ বেরিয়ে আসে তার নাম দেশপ্রেম। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি দেশপ্রেমের প্রতীক।

বাঁশিকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা, এমন কি বাঁশির উল্লেখ পর্যন্ত করা, কোনো কবির অবশ্য কর্তব্য হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও এটি অবশ্য কর্তব্য ছিল না। তবু রবীন্দ্রনাথ বাঁশিকে তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন, বাঁশিকে প্রতীক করে তুলেছেন এবং বাঁশির চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে মানব হৃদয়ের গভীর অনুভব ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। বাংলা ভাষায় অন্য যাঁরা কবিতা রচনা করেছেন, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের সমকালে কিংবা তাঁর পরবর্তীকালে, তাঁদের মধ্যে খুব বেশি সংখ্যক কবি বাঁশির এ ধরনের ব্যবহার করেছেন বলে আমার জানা নেই।

রবীন্দ্রনাথ একান্তভাবেই বাংলার ও বাঙালির কবি। বিশ্বের নানা বিষয় অনুভবে ধারণ করা সত্ত্বেও তিনি বিশেষভাবে বাংলারই কবি। অন্যদিকে, বাঁশি বাংলার প্রাণের সুরকে বিশেষভাবে ধারণ করে, এটিই সম্ভবত প্রধান কারণ। যার জন্য রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বাঁশি একটি বিশেষ স্থান লাভ করেছে। অন্য কথায় রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বাঁশি বাংলার প্রাণের সুরকে ধরে রাখে।

বাংলার জীবন বাঁশির চিত্রকল্পের ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায়, গদ্য রচনায় বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। বাঁশিকে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বের একটি মূল বিষয় এখানে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। তিনি আবহমানতাকে, ঐতিহ্যকে, আশপাশের পরিচিত জগতকে আত্মস্থ করে নেন এবং তাদের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই নিজের কণ্ঠস্বরকে স্থাপন করেন। এ কারণে বাংলার প্রতিদিনের সুর রবীন্দ্রনাথের নিজের সুর হয়েও বাংলার চিরায়ত সুর হয়, আবার রবীন্দ্রনাথের সুর হয়েও ¯্রােতস্বিনীর মতো বাংলার সুরই থেকে যায়। এজন্য রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে সব সময়ের মতো নতুন হয়ে থাকেন।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj