সূর্য ওঠার আগে

শুক্রবার, ৯ আগস্ট ২০১৯

রফিকুর রশীদ

ধারাবাহিক উপন্যাস : ১০

এই ত্রিশূল আক্রমণের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বুঝিয়ে বলেন যে আজম চৌধুরীর নেতৃত্বে এক কোম্পানি সৈন্য আজ বিকেলেই চুয়াডাঙ্গা পোড়াদহ কাঁচা রাস্তা ধরে কুষ্টিয়ার অদূরে এ্যাম্বুশ করবে, তারা শহরের দক্ষিণ পশ্চিম কোণ অর্থাৎ সার্কিট হাউসের দিক থেকে আক্রমণ করবে। একই সময়ে প্রাগপুর-ভেড়ামারা থেকে আরও এক কোম্পানি সৈন্য সুবেদার মুজাফফরের নেৃতত্বে কুষ্টিয়ার পশ্চিমে মশানের বাঁশবাগানে অপেক্ষা করবে। মেহেরপুর-গাংনী থেকে রওনা হওয়া তিন প্লাটুন আনসার মুজাহিদ গিয়ে সেই বাঁশবাগানে মিলিত হবে। সুবেদার মুজাফফরের নেতৃত্বে এরা কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনের দিকে আক্রমণ করবে। এদিকে এক প্লাটুন সৈনিক এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর একটি দল শহরের পূর্ব দিকে অবস্থান নিয়ে মোহিনী মিল এবং ওয়ারলেস স্টেশনের দিক থেকে আক্রমণ করবে। একই সঙ্গে এই তিন দিক থেকে শত্রু সেন্যের উপরে আক্রমণ শুরু হবে ২৯ মার্চ রাত আটটার পর।

এদিকে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে যেন সৈন্য অস্ত্র বা রসদ কুষ্টিয়ায় সরবরাহ করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করার জন্য অধিনায়ক ওসমান চৌধুরী চুয়াডাঙ্গা থেকে এক কোম্পানি সৈনিক সকালেই পাঠিয়েছেন ঝিনাইদহে প্রধান সড়কে ব্যারিকেড সৃষ্টি করার জন্য।

যুদ্ধের এত সব খুঁটিনাটি জানার পর খোকনের দু’চোখ বিস্ফোরিত হবার জোগাড়। এমন বড় রকমের এক যুদ্ধ তৎপরতার ঘটনা এভাবে যে তাদের চোখের সামনেই ঘটে যাবে তা যেন ভাবতেই পারেনি সে। তার মনে প্রশ্ন জাগে যুদ্ধ হবে কুষ্টিয়ায়, অধিনায়ক চুয়াডাঙ্গা থেকেই তার নেতৃত্ব দেবেন?

জানা গেল, হ্যাঁ, তাই দিবেন। এ ধরনের যুদ্ধে ফিল্ড টেলিকম্যুনিকেশন একটি বড় ভূমিকা পালন করে। এই জরুরি কাজটি সমাধা করেছে চুয়াডাঙ্গার টেলিফোন বিভাগ। পোড়াদহের খোলা মাটে অতি দ্রুত একটি ফিল্ড টেলিফোন এক্সচেঞ্জ স্থাপন করে আন্তঃবাহিনী টেলি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষিণ-পশ্চিম কমান্ডের অধিনায়ক মেজর আবু ওসমান চৌধুরী অত্র কমান্ডের আওতাধীন এলাকায় পদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে টেলিফোন যোগাযোগে গোপনীয়তা রক্ষার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্থান ও কর্মকর্তার জন্য ‘চার্লি’, ‘ব্রেবো’ ‘মাদ্রাহ-১’, ‘জাপান’ প্রভৃতি সাংকেতিক কোডও বরাদ্দ করেছেন। কাজেই চুয়াডাঙ্গা থেকে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব কিছুই না। তবে তিনি দিকের তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে সার্বিকভাবে কুষ্টিয়া যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ডেপুটি কমান্ডার এ আর আজম চৌধুরীর উপরে।

খোকনকে সঙ্গে নিয়ে গাংনী থেকে বেরিয়ে আসে হাফিজুর। আসন্ন যুদ্ধ নিয়ে দু’জনের মনে নানান কৌত‚হল কিলবিল করে। কিন্তু সে সব প্রশ্ন করবে কোথায়, কার কাছে? এই যে সামান্য কিছু রাইফেল নিয়ে যুদ্ধ যাত্রা করেছে প্রতিরোধ যোদ্ধারা, যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে কি এই অস্ত্রগোলাবারুদ নিয়ে টিকে থাকা যাবে! লাঠি বল্লম, হেঁসে-কাঁচি দিয়ে কি আদৌ যুদ্ধ হয়! এসব দেশি অস্ত্রের চেয়ে জামাত কানা কিংবা শক্তি দাসের হাতে তৈরি বোমা অনেক বেশি শক্তিশালী এবং কার্যকর। ২৬ তারিখেই জেলখানা থেকে এই সব দুর্ধর্ষ ডাকাতদের মুক্তি দেয়া হয় বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে। প্রথম শর্ত- ভারত থেকে বিস্ফোরক দ্রব্যাদি এনে মানিক মিয়ার গুদাম ঘরে বসে শক্তিশালী বোমা তৈরি করে দিতে হবে, যা কুষ্টিয়া যুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। দ্বিতীয় শর্ত ডাকাতি করা চলবে না। সেই থেকে মনের আনন্দে বোমা বানাচ্ছে জামাত কানা, আকবর, ইদ্রিস, শক্তি দাস। সেই বোমা গুনে নিয়ে খাতায় লিখে রেকর্ড রাখছেন শাহাবাজউদ্দিন লিজু এবং নজরুল ইসলাম। কিন্তু এ বোমাই কি যথেষ্ট? ভারত থেকে সামরিক সাহায্য না পেলে চলবে কী করে!

হাফিজুর সহসা খোকনের পিঠে হাত রেখে বলে বসে,

যুদ্ধ তাহলে শুরু হয়ে গেল, কী বলিস খোকন?

খোকন সরাসরি উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করে,

এ যুদ্ধে আমরা যোগ দেব না হাফিজ ভাই?

আমরা তো যুদ্ধের মধ্যেই আছি। এই যে যুদ্ধের জন্য খাদ্য সংগ্রহ, সেটা পৌঁছে দেয়া… না, মানে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যাওয়া তো হয়নি।

হয়নি, হবে। মুক্তিযুদ্ধ অনেক বড় ব্যাপার। আমরা এখন অস্ত্র পাবো কোথায়? আমিও তো তাই বলছি।

তেঁতুলবাড়ির ঘটনা শুনেছিস তো! ইপিআর ক্যাম্পে বাংলাদেশের পতাকা তুলতে দেবে না অবাঙালি আকরাম খান। রাইফেল হাতে তেড়ে আসে। নিরস্ত্র জনগণই তার জবাব দিয়েছে। যুদ্ধ তো শুরু হয়েছে তখন থেকেই।

অ। নূরু চেয়ারম্যান তাহলে মারেনি তাকে!

আহা, সবাই তো নূরু চেয়ারম্যানের লোক। মানে জয় বাংলার লোক। কারো হুকুমের অপেক্ষা করেনি তো। স্থানীয়ভাবে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে।

আর আমরা?

আমরাও এই প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গেই আছি। তারপর সময় হলে মুক্তিযুদ্ধেও যাব। তৈরি হয়ে থাক।

ইন্ডিয়ায় গিয়ে ট্রেনিং নেব। অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করব, তাই না?

ভেরি গুড। সময় হলেই যুদ্ধে যাব।

বার.

সামরিক পরিভাষায় কুষ্টিয়া-অভিযানের সাংকেতিক নাম দেয়া হয় ‘অপারেশন ফাস্টলেগ।’ অনিবার্য কারণে এই অপারেশন ২৪ ঘণ্টা পিছিয়ে দিতে হয়। একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় পতিত হবার জন্য সুবেদার মুজাফফরের কোম্পানি যথাসময়ে পূর্ব নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছুতে পারে না। ফলে সমগ্র অভিযানই একদিনের জন্য পিছিয়ে দিতে হয়।

এই সংবাদে তৌফিক এলাহী চৌধুরীর মনটা একটু দুলে ওঠে। কিন্তু সে ক্ষণিকের ব্যাপার মাত্র। সামনে তার অনেক কাজ। মন খারাপ করলে চলে? তাঁরই চিঠির প্রেক্ষিতে নদীয়ার জেলা প্রশাসক ২৯ তারিখে মেহেরপুরের বিপরীতে ভারতীয় বিওপি বেতাইয়ে সাক্ষাতের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। মাত্র মাইল তিনেক উত্তর-পশ্চিমে ভারতীয় ছোট্ট শহর বেতাই। বর্ডারের দুই পারে একই মাটি, একই ফসল, চোখ জুড়ানো সবুজ শ্যামল প্রকৃতি, তবু ভারতীয় ভূখণ্ডে পা দিতেই দেহে মনে কী এক অচেনা অনুভূতি খেলা করে। বেতাই বিওপিতে তৌফিক এলাহী চৌধুরীকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান নদীয়ার জেলা প্রশাসক মি. মুখার্জি এবং ৭৬ বিএসএফ-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল চক্রবর্তী। বাংলাদেশের আন অফিসিয়াল দূত হিসেবে তাঁকে গার্ড অফ অনার প্রদান করে বিএসএফ-এর একটি ছোট্ট দল।

বেতাই বিওপিতে প্রায় ঘণ্টা খানেকের এই বৈঠকে নদীয়ার জেলা প্রশাসক বাংলাদেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির খবর এবং মেহেরপুরের অবস্থা জানতে চান। বাংলাদেশের মুক্ত সংগ্রামে ভারতীয় জনগণ ও সরকারের পক্ষ থেকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন জানান এবং সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তবে মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসকের ২৬ তারিখের চিঠির উল্লেখ করে মি. মুর্খাজি বলেন,

থ্রু প্রপার চ্যানেল আমি যে চিঠি সরকারের উপর মহলে পাঠিয়েছি।

ম্যানি থ্যাংকস স্যার!

ওহ, মাই ইয়াং ফ্রেন্ড, ইউ স্যুড নট এ্যাড্রেস মি স্যার। লাকিলি বোথ অফ উই আর বাঙালি, উই মে টেক ইট কর্ডিয়ালি।

থ্যাঙ্ক য়্যু। তাহলে বাংলাতেই বলি।

বলুন মশাই বলুন। ওপরের বাংলা উচ্চারণ শুনি।

আমরা ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছি।

বিএসএফ-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল চক্রবর্তী জানান,

খুব শিগগিরই আমরা সেটা আপনাকে জানাতে পারব বলে আশা করছি।

উই আর এগারলি ওয়েটিং ফর দিস। কারণ আমাদের যোদ্ধারা অলরেডি কুষ্টিয়া অভিযানে চলে গেছে। অস্ত্র গোলাবারুদ আমাদের খুবই দরকার।

ও পক্ষের দু’জনেই এক সঙ্গে আশ্বস্ত করেন।

নিশ্চয় আপনারা সেটা পাবেন। আপনারা বিজয়ী হোন।

ধন্যবাদ আপনাদের।

বিদায় নেবার মুহূর্তে বিএসএফ-এর অধিনায়ক মেহেরপুরের এসডিও’র হাতে বেশ কয়েকটি খবরের কাগজ তুলে দিয়ে বলেন, আমাদের দেশের কাগজে আপনার সেই চিঠি কত গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে দেখবেন।

তাই নাকি! তৌফিক এলাহী চৌধুরী এক টানে কাগজের ভাঁজ খুলতেই দেখতে পান গত দুতিন দিনের ‘অমৃতবাজার’ এবং ‘যুগান্তর’ নামের দৈনিক। পাতা উল্টাতে যাবেন এমন সময় মি. চক্রবর্তী বলেন, মেহেরপুরে গিয়েই দেখবেন প্লিজ। আর একটা কথা। যে কোনো জরুরি প্রয়োজনে কাউকে পাঠালে কাগজে আপনার অফিসিয়াল সিল মেরে পাঠাবেন। আপাতত এটাই বাংলাদেশের পাসপোর্ট বলে গণ্য হবে।

বেতাই বিওপি থেকে ফিরে আসার পর বিকেল নাগাদ বিশেষ মাধ্যমে খবর আসে- তৌফিক এলাহী চৌধুরী যেন একজন সামরিক অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে ৩০ মার্চ চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে চেংখালি চেকপোস্টের অদূরে ভারতীয় বিওপিতে গিয়ে দেখা করেন। প্রয়োজনীয় সামরিক সহযোগিতার নানা দিক নিয়ে সেখানেই কথা হবে বিস্তারিত।

মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক এলাহী চৌধুরীর দুচোখ আনন্দে চকচক করে ওঠে। কুষ্টিয়া অভিযান শুরু হবে আগামীকাল রাতে। এ সময় প্রচুর অস্ত্র গোলাবারুদের প্রয়োজন। কিন্তু সামরিক অফিসার হিসেবে কাকে নেবেন সঙ্গে? (শেষ)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj