প্রণয়সিন্ধু মন্থনের কবি মহাদেব সাহা

শুক্রবার, ২ আগস্ট ২০১৯

ফরিদ আহমদ দুলাল

বাংলাদেশের কাব্যাঙ্গনে ষাটের একজন অগ্রগণ্য কবির নাম মহাদেব সাহা। কাব্যমহলে মহাদেব সাহার নামে একটা বদনাম শোনা যায়; তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের ঠোঁটকাটা কেউ কেউ মহাদেব সাহার প্রসঙ্গ উঠলে কবির বন্ধুদের সামনেই বলে দেন, ‘দুঃখের আরেক নাম মহাদেব সাহা!’ কবির সমসাময়িক বন্ধুদের কখনো আমি প্রতিবাদ করতে শুনিনি, তাঁরা রহস্যের হাসি হেসে মহাদেব সাহা সম্পর্কে উচ্চারিত কথাটিকেই সত্য বলে প্রতিষ্ঠায় পরোক্ষ সমর্থন করেছেন। কবি মহাদেব সাহা সম্পর্কে উচ্চারিত ‘বিষণœকবি’ বিষয়ক অভিধাটি নিয়ে আমি বহুদিন ভেবে একটা সিদ্ধান্তে আসতে চেষ্টা করেছি। ব্যক্তিগতভাবে কবি মহাদেব সাহাকে আমার সব সময়ই ষাটের একজন প্রভাব সৃষ্টিকারী কবি বলেই মনে হয়েছে। মূলত মহাদেব সাহার কবিতায় তাঁর পাঠক সহজেই খুঁজে পান একাকিত্বের সৌন্দর্য, প্রেম-বিরহ, মুক্তিযুদ্ধ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-সুষমা; খুঁজে পান দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সাহসী হবার শক্তি আর সমতার সমাজ গড়ার আর্তি; সমাজ সচেতনতার এত অনুষঙ্গ থাকার পরও কি বলা যায় তিনি বিষণœতার চাদরে মোড়া একজন কবিপুরুষ? কবিতায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠার প্রশ্নে ষাটের নির্মলেন্দু গুণ সবার চেয়ে এগিয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু কবি আবুল হাসান নিজের সময়ে খুব বেশি পিছিয়েও ছিলেন না; দীর্ঘ কাব্যাভিযাত্রায় আবুল হাসান সরে দাঁড়ালে জনপ্রিয়তায় মহাদেব সাহা-ই দীর্ঘ সময় তাঁর বন্ধু গুণের কাঁধ ছুঁয়ে ছিলেন-আছেন। না, কবিদের এ জনপ্রিয়তার বিষয়টি কোনো জরিপের ফল নয়, এটিকে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণও বলা যায়; সুতরাং এর সাথে কেউ ভিন্নমত পোষণ করলে আমি তাকে নাকচ করে দিতে পারি না। আমি ‘জনপ্রিয়’ শব্দটিকে শুধু স্থ‚ল অর্থে বলিনি, বরং কবিতাকর্মী এবং কবিতা সংশ্লিষ্টদের পছন্দের তালিকার কথাই বলতে চেয়েছি। পর্যবেক্ষণের আরো একটি ফল হিসেবে বলতে পারি মহাদেব সাহার পাঠকদের বড় একটা অংশ তাঁর নারীপাঠক। তাহলে কি বলতে পারি তাঁর সময়ে অন্যদের তুলনায় নারীর হৃদয়োপলব্ধির কথা কবি মহাদেব সাহা-ই সঠিক নিরূপণ করতে পেরেছেন? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর অবশ্য আমার জানা নেই; কবির কবিতা পড়ে সচেতন পাঠক মাত্রই এ বিষয়ে নিজের মতো করে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন বলেই বিশ্বাস।

কবি মহাদেব সাহা সম্পর্কে দুষ্টু বন্ধুদের উচ্চারিত ‘দুঃখের কবি’ অভিধাটির সাথে আমি কখনোই একমত নই, তাহলে প্রশ্ন কবি মহাদেব সাহা আমার চোখে কোন ঘরানার কবি? আমার কাছে সহজ উত্তর মহাদেব সাহা ষাটের কবিদের মধ্যে সংবেদনশীল আবেগী কবি, স্পর্শকাতরতায় তিনি যেন গলে যাওয়া একজন কবিপুরুষ; এক কথায়, তাঁর সময়ে তিনিই সবচেয়ে বেশি গভীর রোমান্টিকতার কবি। আমার এ ধারণাটি জন্মেছিল ১৯৮২-তে প্রকাশিত কবি শিশির দত্ত সম্পাদিত ‘স্বনির্বাচিত’ সংকলনে সম্পাদক কর্তৃক উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে সংকলিত কবিদের বয়ান পড়ে। কবিদের কাছে সম্পাদকের প্রশ্ন ছিল তিনটি, প্রশ্ন তিনটি ছিল, ক. অবসর কীভাবে কাটাতে ভালোবাসেন; খ. প্রিয় কবি স্বদেশি : বিদেশি এবং গ. প্রথম কবিতা রচনার অভিজ্ঞতা? তিনটি প্রশ্নের উত্তরে কবি মহাদেব সাহা প্রায় তিন পৃষ্ঠার জবাব লিখেছেন। মহাদেব সাহার সে সব উত্তর থেকেই প্রথমত আমি কবির রোমান্টিকতা আবিষ্কারের চেষ্টা করবো। মহাদেব সাহার উত্তর থেকে সামান্য কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি-

ক. ‘প্রকৃত অর্থে আমার কোনো অবসর সময় নেই, যা আছে তা কিছু কর্মহীন মুহূর্ত। কিন্তু দেখা যায় তখনো কোনো না কোনোভাবে ব্যাপক হয়েই আছি। কিছু না করাটাও আমার কাছে একটি কাজ, অনেক সময়ই বেশ বড় কাজ। তাই অবসর যাপনের কিছু কিছু স্বচ্ছ ও মনোরম অভ্যাস গড়ে তোলার আমার তেমন সৌভাগ্য হয়নি, আগ্রহও নেই। বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তই আমার কাছে এক অর্থে রক্তাক্ত আত্মক্ষরণ; পরিবেশ, পরিস্থিতি ও নিজের সঙ্গে অবিশ্রান্ত সংগ্রামেই নিয়োজিত থাকা।….’

খ. ‘একজন কবি বা লেখকের যা যা থাকে কিংবা থাকতে হয় যেমন প্রিয় কবি বা লেখক,… রবীন্দ্রনাথ, ইয়েটস ও নেরুদাসহ আরো বহু কবি ও লেখকের বহু রচনাই আমার অতিশয় প্রিয়। বিশেষভাবে কয়েকটি নির্বাচিত নামের ঘোষণা দিয়ে কি হবে?’

গ. ‘অভিজ্ঞতার আগেও তো আরো বহু অভিজ্ঞতা থাকে, সেইসব বহু অজ্ঞাত অভিজ্ঞতার উপলব্ধি প্রভাব ও প্ররোচনাই হয়তো একজন কবিকে কবিতা রচনার এই প্রতারণাময় জগতে হাতছানি দিয়ে টেনে নিয়ে যায়।….আমি সমাজের প্রতি কবির অঙ্গীকারকে যে কোনো মহৎ রচনারই অন্যতম প্রধান শর্ত বলে মনে করি।….তবে একজন কবি কিংবা লেখকের রচনার প্রতিক্রিয়া বা সমাজ প্রগতির উপাদান থাকা স্বাভাবিক; আর এ ক্ষেত্রে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ ও লক্ষণীয়। কবি কোনো দেশকাল ও সমাজ বহির্ভূত ব্যক্তি নন, সমাজের উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাত, সুদিন-দুর্দিন তাঁকেও সমান আক্রান্ত করে। এসব ঘটনা কখনো তাঁকে বিচলিত করে, কখনো উদ্বুদ্ধ করে বলেও জানি। তাই সমাজের প্রতি তাঁর দায়িত্বও অপরিসীম।….কোনো প্রশ্নেরই তো কোনো শেষ বা সম্পূর্ণ উত্তর হয় না। আমিও সে চেষ্টা করিনি। আপনাদের প্রশ্নের উত্তরে তাই এতক্ষণ আমি যা বলতে চেয়েছি তা এইসব জিজ্ঞাসা বা অনুসন্ধানের কিছু আংশিক ও অসম্পূর্ণ মতামত বা উত্তর ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (স্বনির্বাচিত \ সম্পাদক : শিশির দত্ত \ প্রথম প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২)। তিন প্রশ্নের উত্তর থেকে যেমন কবির রোমান্টিসিজম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গিয়েছিল, একইভাবে তাঁর অভিমানের একটা সূত্রও আবিষ্কৃত হয়েছিল সেই কথা থেকে, যখন তিনি বলেন, ‘অজ্ঞাত অভিজ্ঞতার উপলব্ধি প্রভাব ও প্ররোচনাই হয়তো একজন কবিকে কবিতা রচনার এই প্রতারণাময় জগতে হাতছানি দিয়ে টেনে নিয়ে যায়।’

কবি মহাদেব সাহা সম্পর্কে উপরে যেসব প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হলো, আমরা এবার তাঁর কবিতায় প্রবেশ করে সেসব সূত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাই। মহাদেব সাহার প্রথম কাব্য ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’, এরপর প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘মানব এসেছি কাছে’, ‘চাই বিষ অমরতা’, ‘কী সুন্দর অন্ধ’, ‘তোমার পায়ের শব্দ’, ‘ধুলো মাটির মানুষ’, ‘আমি ছিন্নভিন্ন’, ‘লাজুক লিরিক’, ‘ফুল নেই শুধু অস্ত্রের উল্লাস’, ‘বেঁচে আছি স্বপ্নমানুষ (১৯৯৫)’, ‘অক্ষরে বোনা স্বপ্ন (২০০৯)’, ‘পাতার ঘোমটা-পরা বাড়ি (২০১০)’, ‘একবার নিজের কাছে যাই (২০১১)’ ইত্যাদি। ইতোমধ্যেই মহাদেব সাহার ষাটোর্ধ্ব কাব্য প্রকাশিত হয়েছে, এ ছাড়াও প্রেমের কবিতা, শ্রেষ্ঠ কবিতা, নির্বাচিত কবিতা, কবিতা সমগ্র ইত্যাদি মিলিয়ে তা সত্তরোর্ধ্ব। কবি মহাদেব সাহার শতাধিক কবিতার ইংরেজি অনুবাদ ঝবষবপঃবফ চড়বসং ড়ভ গধযধফবা ঝধযধ প্রকাশিত হয়েছে, যা অনুবাদ করেছেন কবি শামসুল ফয়েজ। সব মিলিয়েই তাঁকে নিয়ে আলোচনা। কবির কবিতায় একাকিত্ব, সৌন্দর্যচেতনা, প্রেম-বিরহ, মুক্তিযুদ্ধ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-সুষমা, দেশপ্রেম, আন্তর্জাতিকতা, মানবাধিকার এবং সর্বোপরি রোমান্টিকতা; ইত্যাদি স্থান পেলেও সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রেমই মহত্তম হয়ে উঠেছে; আর সে প্রেমাকুতিতে বিরহচেতনাই মুখ্য হয়ে উঠেছে যেন। আসুন এ পর্যায়ে আমরা তাঁর দু’একটি প্রেমের কবিতার কিছু পঙ্ক্তি স্মরণ করতে চেষ্টা করি-

আমার প্রেমিকা….. নাম তার খুব ছোট দুটি অক্ষরে

নদী বা ফুলের নামে হতে পারে

এই দ্বিমাত্রিক নাম,

হতে পারে পাখি, বৃক্ষ, উদ্ভিদের নামে

কিন্তু তেমন কিছুই নয়, এই মৃদু সাধারণ নাম

সকলের খুবই জানা,

আমার প্রেমিকা প্রথম দেখিছি তারে বহুদূরে

উজ্জয়িনীপুরে।

……….. ………. ……….

আমার প্রেমিকা তার নাম সুদূর নীলিমা

রক্তিম গোধূলি,

নক্ষত্রখচিত রাত্রি, উচ্ছল ঝরনার জলধারা

উদ্যানের সবচেয়ে নির্জন ফুল, মন হু-হু করা বিষণœতা

সে আমার সীমাহীন স্বপ্নের জগৎ;

দুচোখে এখনো তার পৃথিবীর সর্বশেষ রহস্যের মেঘ,

আসন্ন সন্ধ্যার ছায়া-

আমার প্রেমিকা সে যে অন্তহীন একখানি বিশাল গ্রন্থ

আজো তার পড়িনি একটি পাতা, শিখি নাই

এই দুটি অক্ষরের মানে।

আমার প্রেমিকা \ মহাদেব সাহা)

এখানে দেখি শেষ পঙ্ক্তিতে কীভাবে তিনি পাঠকের অন্তরে বিষাদ সংক্রমণ করেন। আবার অন্য কবিতায়, যেখানে তিনি প্রেমাকুতি প্রকাশের মুন্সিয়ানায় পাঠকের হৃদয়কে পলকে সিক্ত করে তোলেন-

করুণা করেও হলে চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও

আঙুলের মিহিন সেলাই

ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,

এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো

অক্ষরের পাড় বোনা একখানি চিঠি। (চিঠি দিও \ মহাদেব সাহা)

কবি মহাদেব সাহার কবিতায় অনুষঙ্গ হিসেবে প্রেম, অজ¯্র-সহ¯্র দেয়া যায়; এবং তাঁর প্রেমের কবিতাগুলো যেমন হৃদয়গ্রাহী তেমনি স্পর্শকাতরও। তাঁর ‘চাই না কোথাও যেতে’, ‘এখনো রোমাঞ্চ হয়’, ‘যতটা সম্ভব’ ইত্যাদি শিরোনামসহ অসংখ্য কবিতার নামই উচ্চারণ করা যায়; কিন্তু প্রেমের কবিতা উচ্চারণের ফাঁকে যখন তিনি তার সাথে যুক্ত করে দেন আন্তর্জাতিকতা, তখন আমরা অভিভূত না হয়ে পারি না। আসুন আমরা তাঁর তেমনি একটা কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধার করি-

একা হয়ে যাও, নিঃসঙ্গ বৃক্ষের মতো

ঠিক দুঃখমগ্ন অসহায় কয়েদির মতো

নির্জন নদীর মতো,

তুমি আরো পৃথক বিচ্ছন্ন হয়ে যাও

স্বাধীন স্বতন্ত্র হয়ে যাও

খণ্ড খণ্ড ইউরোপের মানচিত্রের মতো;

………. ………… ………..

এতো দূরে যাও যাতে কারো ডাক না পৌঁছে সেখানে

অথবা তোমার ডাক কেউ শুনতে না পায় কখনো,

সেই জনশূন্য নিঃশব্দ দ্বীপের মতো,

নিজের ছায়ার মতো, পদচিহ্নের মতো,

শূন্যতার মতো একা হয়ে যাও।

(একা হয়ে যাও \ মহাদেব সাহা)

কবি মহাদেব সাহা তাঁর যাপিত জীবনে অগণন কবিতা লিখেছেন, তাঁর কবিতার বৈচিত্র্য অনুসন্ধানে রচনার কলেবর বিবেচনায়ই বিভিন্ন অনুষঙ্গের নমুনা উপস্থাপনের চেষ্টা করছি আমি, আগ্রহী পাঠক নিশ্চয়ই একজন সম্পূর্ণ মহাদেব সাহাকে আবিষ্কার করে নেবেন নিজস্ব নিবিষ্ট পাঠে। সমাজবাস্তবতা আর অসঙ্গতির কথা উচ্চারণে যখন তিনি উচ্চারণ করেন-

এ-কী বৈরী যুগে এসে দাঁড়ালাম আমরা সকলে

সূর্য নিয়ত ঢাকা চিররাহুগ্রাসে, মানবিক

প্রশান্ত বাতাস এখন বয় না কোনখানে

শুধু সর্বত্র বেড়ায় নেচে কবন্ধ-দানব;

তাদের কদর্য চিৎকারে ফেটে যায় কান,

চোখ হয়ে যায় কী ভীষণ রক্তজবা, সহসা

দিগন্ত জুড়ে নেমে আসে ঘোর সন্ধ্যার আঁধার।

(যদুবংশ ধ্বংসের আগে \ মহাদেব সাহা)

সামাজিক অনাচার আর মূল্যবোধের অধোপতন পড়তে আমরা নিচের কবিতাটিও পড়ে নিতে পারি।

আজ লোহা সীসা আর ইস্পাতের রেকর্ড উৎপাদন, ঘাস

শিশির ফুরিয়ে যাচ্ছে,

এই ইস্পাত পৃথিবীতে কোথায় পা রাখি?

সুচ, তারকাঁটা, আলপিনে ঢাকা পড়ে গেছে চন্দ্রমল্লিকা,

নিরাপত্তার কঠিন চাদরে মোড়ানো এই জ্যোৎস্না

আর জোনাকির গন্ধভরা শহরের গলি,

পার্ক, নগরপল্লী দমবন্ধ, দাঁড়াবো কোথায়?

(ইস্পাত পৃথিবীতে আমরা যেভাবে তলিয়ে যাচ্ছি \ মহাদেব সাহা)

কবি মহাদেব সাহার কাব্যশৈলী অবিষ্কারের জন্য আমরা এবার তাঁর দেশপ্রেমের যে কবিতাটি পাঠ করতে চাই, সেখানেও দেখবো তাঁর কাব্যশৈলীর স্বাতন্ত্র্য। এই যে স্বাতন্ত্র্য, যে স্বাতন্ত্র্যের জন্যই তাঁর কবিতাকে আলাদা করে চিনে নেয়া যায়। সবার ভেতর থেকে কবির এই আলাদা হয়ে যাবার যোগ্যতাটিকে খাটো করে দেখবার অবকাশ নেই।

তাহলে কি গোলাপেরও দেশপ্রেম নেই

যদি সে সবারে দেয় ঘ্রাণ,

কারো কথামতো যদি সে কেবল নাই ফোটে রাজকীয় ভাসে

বরং মাটির কাছে ফোটে এই অভিমানী ফুল

তাহলে কি তারও দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ উঠবে চারদিকে।

(দেশপ্রেম \ মহাদেব সাহা)

কবি প্রশ্নোত্তরে সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন; তাঁর সেই দায়বদ্ধতার অনুষঙ্গ খুঁজতে চাই। সমাজে যখন নারী-নির্যাতন, ধর্ষণ, রিরংসা বাংলার পশ্চাৎপদ নারী জাতিকে পেছনে ঠেলে দিতে তৎপরতা দেখাচ্ছে, ধর্মান্ধতা যখন নারীর চোখে-মুখে ‘ঠোয়া’ পরিয়ে দিতে চাইছে, যখন একবিংশের ডিজিটাল বিশ্বে বাংলার নারীকুলকে বাকরুদ্ধ করার ষড়যন্ত্র চলছে; তখন একজন সমাজ সচেতন কবি হিসেবে দেখতে পাই তাঁর কবিতায় নারী প্রসঙ্গ; একই সঙ্গে দেখি সেখানে সর্বধর্মীয় প্রসঙ্গ।

যে হও, সে হও তুমি

যার হও, অনার্যা রমণী হও, হও বানুবংশের দুহিতা

উজ্জ্বল খৃস্টানী হও, বৌদ্ধের যুবতী তুমি হও,

সেও তুমি শরীরে ধারণ করো সেই একই নীলবর্ণ শিলা।

ওষ্ঠে ধরো শিশুর আহার

কপালে কলঙ্ক ধরো

ভুরুতে কটাক্ষ ধরো

হেলানো গ্রীবায় ধরো বুনো রাজহাঁস

যে হও সে হও তুমি

যাহার কুমারী কন্যা হও, পরনারী হও

সেও তুমি বক্ষে ধারণ করো তৃণের স্বভাব;

(নারী \ মহাদেব সাহা)

কবি মহাদেব সাহার কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গের উল্লেখ করেই আমি আজকে আলোচনার ইতি টানতে চাই। আমরা দেখেছি স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে, বিশেষত পঁচাত্তর-পরবর্তীতে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠেছিল ‘পাশ কেটে যাওয়া’ অনুষঙ্গ; কিন্তু বাংলাদেশের কবিকুল সব সময়ই থেকেছেন সত্যের সপক্ষে সোচ্চার; মহাদেব সাহাও তার ব্যতিক্রম নন; তাঁর কবিতায় বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ এসেছে প্রবলভাবে। নিচে দুটি কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তির উদ্ধৃতি দিচ্ছি; আমার বিশ্বাস কবিতা দুটি পাঠ করলেই মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাঁর শ্রদ্ধাবোধ সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

একজন মুক্তিযোদ্ধার ডায়েরি খুলে আমি

এখনো শুনতে পাই জয় বাংলা ধ্বনি,

এখনো দেখতে পাই রমনার মাঠে জনতার উত্তাল সমুদ্র

ডায়েরির পাতায় এখনো পদ্মা-মেঘনা ধীরে বয়ে যায়,

এখনো প্রত্যহ হয় সূর্যোদয়, জ্বলে হৃদয়ের আলো;

(একজন মুক্তিযোদ্ধার ডায়েরিতে \ মহাদেব সাহা)

টুঙ্গিপাড়া একটি সবুজ গ্রাম, এই গ্রাম

গাভীর চোখের মতো সজল করুণ

আজ সবকিছুতেই উদাসীন, বিষণœ-বাউল;

(টুঙ্গিপাড়া \ মহাদেব সাহা)

কবি মহাদেব সাহা এভাবেই তাঁর কবিতা দিয়ে বাংলাদেশের কবিতা পাঠকদের আচ্ছন্ন করে রেখেছেন; এবং নিজেকে একজন রোমান্টিক কবিব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাধারণের কথা না-ই বা বললাম, সৃষ্টিশীল প্রতিটি মানুষের মধ্যে অমরতা লাভের একটা স্বপ্ন থাকে; প্রকাশ্যে অথবা গোপনে। মহাদেব সাহার মধ্যেও হয়তো সে আকাক্সক্ষা অঙ্কুরিত হয়েছিল, হয়তো তাঁর তৃতীয় কাব্যের নাম হয়, ‘চাই বিষ অমরতা’। তাঁর মধ্যে যে বেদনাবোধ, সে বেদনা নীলকণ্ঠ হবার বেদনা; যে বেদনা বিষমুক্ত বিশ্ব পাবার আকুতির বেদনা। ভারতীয় পুরাণের অন্য এক মহাদেব, দেবাদিদেব ধূর্জটি-পিনাক-শিব, সিন্ধুমন্থন শেষে সমস্ত অমৃত দেবতাকুল যখন পান করে চলে যায়, তখন সমুদ্র থেকে উৎসারিত বিষ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে ‘নীলকণ্ঠ’ হয়েছিলেন; তেমনি আমাদের কবি মহাদেব সাহা প্রেম-বিরহের সমস্ত বিষাদকে তাঁর কবিতায় ধারণ করেছেন; যে বিষাদের মধ্যে আছে, বঞ্চনা থেকে মানুষের মুক্তি না পাবার বেদনা; সাম্যের পৃথিবী না পাবার কষ্ট; সুশাসন না পাবার, বৈষম্য থেকে মুক্তি না পাবার যন্ত্রণা। তাই কবি মহাদেব সাহাকে বলতে চাই প্রণয়সিন্ধু মন্থনের কবি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj