স্বভাবে লাজুক প্রেমাঙ্গনে সাহসী

শুক্রবার, ২ আগস্ট ২০১৯

মাকিদ হায়দার

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর একটি কবিতায় স্মৃতি এবং মর্মবেদনার কথা জানিয়েছেন অগণিত পাঠকদের, কবিতাটি পাঠান্তে যে কোনো পাঠকই মুহূর্তের ভেতরেই ফিরে যেতে পারেন তাঁর অতীতের কাছে। ‘চোখ বন্ধ করলে যেন সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাই’।

আমার অভিধায় জীবিত মানুষরা বর্তমানের চেয়ে অতীতের ফেলে আসা দিন-রাত আষাঢ়-শ্রাবণের অক্লান্ত বৃষ্টিধারা, বাঁশ ঝাড়ের মাথার ওপর চাঁদ, মুগ্ধ সন্ধ্যা লাগতে না লাগতেই হাজার হাজার জোনাক পোকার আরেক জঙ্গলে অথবা কারো গোয়াল ঘরের গৃহস্থের উঠোন পেরিয়ে চলে যায় দূরদূরান্তে। সন্ধ্যার প্রদীপ পূজার শঙ্খ আর ঘণ্টাধ্বনি। মসজিদে মসজিদে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি আর তখনই শুরু হয় আষাঢ় কিংবা শ্রাবণ সন্ধ্যায় শেয়ালের হাঁক। দূরের মাঠে কিংবা পাড়ার মাঠেই ফুটবল খেলা শেষে সমস্ত শরীরে কাদামাটি মাখিয়ে আমরা যারা একদা হারিয়ে এসেছি সোনামাখা দিন, স্মৃতি জাগানিয়া দিনরাত- সেই কথাই কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার কবিতায় জানিয়েছেন। চোখ বন্ধ করলে সবকিছু যেন স্পষ্ট দেখতে পান, এমনকি দেশ ভাগ, পরিচিতজনদের পিছে ফেলে দেশ থেকে দেশান্তরী হওয়ার মর্মবেদনার কথা। আমরা কেউ-ই সেই মোহ থেকে মুক্ত নয় বলেই চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ১৯৬৪ সালের হিন্দু-মুসলিমদের দাঙ্গা। দাঙ্গাটি পূর্ব পাকিস্তানের লাট সাহেবের আদেশে নাকি না-পাক পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির নির্দেশে সংঘটিত হয়েছিল, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ- সবই দেখলাম। দেখেছি যে আমি একাই, সে কথা নিশ্চিত করে না বলাই সমীচীন। দেখেছেন এ দেশের কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষরা। সেই সব বীভৎস, অন্ধকারাচ্ছন্ন দিন-রাত কার কীভাবে গিয়েছে, মৃত্যু শংকার ভয়, সবকিছু মিলিয়ে হয়তো সেই দুঃসময়ের মধ্যে ছবি এঁকেছেন শিল্পী, কেউ কেউ লিখেছেন গল্প, উপন্যাস, কবিতা, স্বদেশের প্রতি তার প্রেম। একজন লেখক বা কবির সেই অতীত দিনের দৃশ্য এবং বর্তমানের কাছেই সমর্পিত। সেটা নির্ভর করবে লেখকের রচনাশৈলীতে।

কবি মাত্রাই উদবাস্তু। স্বদেশের স্বভূমে থেকেই তার দৃষ্টি উড়ে বেড়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে। অন্বেষণ করেন ইউরোপ আমেরিকা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ভারতীয় শিল্প-সাহিত্য ও কবিতা- যদি তিনি অখ্যাত বা খ্যাতিমান কবি হিসেবে সমাদৃত অথবা নন্দিত। নিন্দিত পাঠকের কাছে, তাতে সেই কবিরই জয়জয়াকার। নিন্দিত পাঠককুল নন্দিত কবির কবিতা পাঠান্তেই তখনই বলবেন, কবিতাটি মোটেই ভালো লাগেনি তাঁর। অথচ কবিতাটি তো পাঠককে সদানন্দেই পড়তে হয়েছে। না পড়লে তিনি কি করে বলবেন- কি করে জানাবেন অভিমত। ভালো কি মন্দ পদ্যটি।

বিশেষত একজন কবির সব কবিতাই যে সুখপাঠ্য হবে- তেমনটি না ভেবে পাঠককুলকে মানতেই হবে, কবিতাটি তার অতীতকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে- সেই ফেলে আসা স্মৃতি জাগানিয়া শঙ্খধ্বনি, ক্লান্ত দুপুরে বাবলা গাছের ডালে অথবা বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে একটি পাখি অথবা ঘুঘু ডেকে চলেছে তার প্রিয়তম অথবা প্রিয়াকে, আমার বা আপনার চারদিকে নিত্যনৈমিত্তিক যে সব ঘটনাসমূহ আমি আপনি দেখতে পাই, সেই দৃশ্যটাকে অথবা স্মৃতি থেকে প্রায় হারিয়ে যাওয়া একদার স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়ের সুশ্রী সহপাঠীনীর সঙ্গে হঠাৎ দেখা- যেমন ‘হঠাৎ দেখা’ হয়েছিল রেল গাড়ির এক যাত্রীর সাথে আরেক যাত্রীর, যিনি মাথায় দিয়েছেন শাড়ির আঁচল। সেই আঁচলের নিচে ঢাকা পড়েছে অতীত কাহন। তবু ব্যর্থ প্রেমিককে আমরা বলতে শুনি, ‘আমাদের যে দিন গিয়েছে’- একেবারেই কি? প্রেমিক যাকে জিজ্ঞেস করলেন বা জানতে চাইলেন, তিনি নিরুত্তরই রয়ে গেলেন, এমনকি থেমে গেলেন পরের ইস্টিশনে, কাল নিরবধি। নিরুত্তরই থেকে গেল সেই রেল গাড়ির যাত্রীর কাছে। হঠাৎ দেখার চিত্রটি এঁকেছিলেন ব্যর্থ প্রেমিক সেই কবি ব্যর্থতাই একদিন হারিয়ে গিয়েছিল। উৎকৃষ্ট কবিতা বা নিকৃষ্ট কবিতা যে কোনো কবিই লিখতেই পারেন- সেটি যতকাল প্রকাশিত না হবে সেটি তার নিজের মনের গভীরে, মননেই থেকে যাবে। যখন সেই গদ্য অথবা পদ্য ছাপা বা প্রকাশিত হলো- সেটি তখন আর কবি-লেখকের রইলো না, হয়ে গেল পাঠকের। যেহেতু পাঠক পত্রিকাটির মালিকানা পেয়েছেন অর্থের বিনিময়ে। আর তখনি পাঠকের নিজস্ব চিন্তায় এবং চেতনায় থিতু হয় ভালো-মন্দের।

অতিসম্প্রতি একটি কবিতাগ্রন্থ পাঠ শেষে আমাকে কবি মহাদেব সাহা রচিত একাধিক কবিতা মোহিত করেছে। প্রসঙ্গক্রমে একটু সেই পেছনের দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকালেই দেখি ছিপছিপে পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত এবং স্বল্পভাষী একজন কবির সারল্যে প্রীতিময় একটি মুখ। কবির সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের বয়স ইতোমধ্যে ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে বলেই মনে হলো। মাত্র কয়েক মাস আগের একটি প্রীতিময়-স্মৃতিময় সন্ধ্যায় তাঁর সাথে দেখা উত্তরা মডেল টাউনের ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি কলেজ মিলনায়তনে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন সস্ত্রীক কবি। স্থানীয় একটি সাংস্কৃতিক সংঘের আমন্ত্রণে এসেছেন।

একই সঙ্গে ড. রতন সিদ্দিকী [সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ টেক্সট বুক বোর্ড] রাজউক স্কুল এন্ড কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর। কলেজের কবিতা প্রেমিক তরুণ-তরুণী, অধ্যক্ষ এবং তার কলেজের অধ্যাপক এবং আমিসহ মিলনায়তনটি ছিল পূর্ণ। যেহেতু দিনটি ছিল শুক্রবার।

কবি মহাদেব সাহা স্বভাবে লাজুক, প্রেমাঙ্গনে সাহসী, তার একাধিক কাব্যগ্রন্থ, ইতোমধ্যে একাধিক কবিতা বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। তার পাঠক মাত্রই জানেন তিনি উচ্চ শিক্ষিত, জন্ম বৃহত্তর পাবনা জেলায় এবং সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। ড. রতন সিদ্দিকী কবির কবিতা নিয়ে বার্তা দিলেন অনুরূপভাবে ভারতীয় একজন কথক এবং আমি- হয়তো কেউ জানতে চাইবেন।

কবি যদি স্বভাবে লাজুক হন, তাহলে প্রেমাঙ্গনে সাহসী হয় কীভাবে? সহজ উত্তর, কবি মাত্রই প্রেমিক, কেউ একাধিক প্রেমে বা একটি প্রেমে ব্যর্থ। আবার কেউ একাধিক প্রেমে সফল। সেই সফলতার সিঁড়ি বেয়েই কবিকে লিখতে হয় কবিতা এবং আজো প্রেমিক-প্রেমিকাদের জানিয়ে দিতে হয়, ‘সর্বাঙ্গে তোমার গুঞ্জন’।

সেই গুঞ্জনে আছে গুঞ্জরিত মৌমাছি। আছে প্রেমের গুচ্ছগুচ্ছ কবিতা, সংক্ষেপে কয়েকটি কবিতার শিরোনাম দিলে তার পাঠককুল পেয়ে যাবে কবিতার গুঞ্জন। তোমার চলে যাবার পর, দরজা তুমি নাও খুলতে পারো, তোমাকে ছাড়বো না, কোনো আঘাতই কেউ বেশিদিন মনে রাখে না, তোমাকে একবার চুম্বনের জন্য এই দীর্ঘ প্রস্তুতি, প্রেমসূত্র, তোমার কাছে বর্ষা চেয়ে কী হবে, হাত ছেড়ে দাও সঙ্গে যাবো।

প্রেমিক মাত্রই প্রেমিকার হাতের স্পর্শ পেলেই শিহরিত। মহাদেব সাহা, সেটি না বলে বলছেন হাত ছেড়ে দাও।

অথচ তিনি সঙ্গে যাবেন। প্রেমিকাকে প্রতারিত করবেন না, কেননা প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন সঙ্গে যাবেন। অথচ কবিতা পাঠান্তে বারবার মনে হয়েছে, তিনি সার্থক প্রেমাঙ্গনে, তাই তিনি অনুভব করেন ‘সর্বাঙ্গে তোমার গুঞ্জন’।

মহাদেব সাহা প্রায়শই লোকচক্ষুর অন্তরালে, স্বদেশ ছেড়ে সুদূর কানাডায় গিয়ে থিতু হয়ে দেশের টানে তাকে ফিরতেই হয়- কেন তিনি দেশে ফিরে এসেছেন, সে কথা সেদিনের সেই সন্ধ্যায় কলেজ মিলনায়তনে জানালেন। দুই পুত্র কানাডা নিবাসী। তাদের স্ত্রীদ্বয়েরা কর্মক্ষেত্রে বের হয়ে গেলে কবিকে থাকতে হয় সারাদিন নিঃসঙ্গ। একমাত্র বিদেশের আকাশ আর মানুষ দেখা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো কর্ম নেই। কথা বলার কোনো লোকও নেই। জীবন্ত কবিকে থাকতে হয় নির্বাণের ভূমিকায়। দুর্বিষহ জীবন। তারচেয়ে স্বদেশে ফিরে এলে স্বজনরা অন্তত তাকে সঙ্গ দিতে পারবেন এবং কবি সময়-সুযোগ নিয়ে ফিরে যেতে পারেন তার সেই অতীতের প্রিয় মুখগুলোর কাছে। যে মুখগুলো তাকে হয়তো আবার মনে করিয়ে দেয়, হয়তো কবিকে জানিয়ে দেয় অতীত গুঞ্জনের স্মৃতিময় প্রীতিময় দিনগুলোর কথা, যে কথা আমার প্রিয় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বহুকাল আগেই জানিয়েছেন আমাদের। আমরা জানি প্রেম-ভালোবাসা মানুষের প্রবলতম অনুভূতি। আরো জানি কবি দান্তের প্রেমের কথা। মহান কবি দান্তে তিনি তাঁর প্রেমাস্পদী বিয়াত্রিচিকে সম্ভবত বারদুয়েক দেখেছিলেন। তার সঙ্গে কবির আলাপও হয়নি, পরিচয়ও হয়নি কখনো, কোনোদিন। কবি দান্তে একটি সাঁকোর পাশে বিয়াত্রিচিকে প্রথমবার দেখেই তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন, যে প্রেম আমৃত্যু তাঁর জীবনে আলো ফেলেছিল, তাই তাঁর অমর কাব্য ‘ডিভাইন কমেডি’-তে বিয়াত্রিচিকে অসামান্য মর্যাদায় স্থান দিয়েছেন তার কাব্যে।

অপরদিকে কবি মহাদেব সাহার একটি চমৎকার বিরহের কবিতা আমাকে আন্দোলিত করেছিল। ‘এক কোটি বছর দেখি না তোমাকে’। কবির দীর্ঘশ^াস, প্রবাহিত বাতাসে যখনই ভেসে বেড়ায় তখনি বারবার মনে হয়- বিরহ যেমন আছে বক্ষজুড়ে তেমনি আছে প্রেম। সেই বিরহগাথায় রবীন্দ্রনাথও আছেন- ‘তার পাশেই আছি তবু একা।’ রবীন্দ্রনাথের পশ্চিম-যাত্রীর ডায়রিতে দেখতে পাই- ১৫/০২/১৯২৫ তারিখে লেখা ‘যাকে উদাসীনভাবে দেখি তাকে পুরো দেখিনে, যাকে প্রয়োজনের প্রসঙ্গে দেখি তাকেও না/যাকে দেখার জন্যেই দেখি তাকেই দেখতে পাই।’ সেটি হতে পারে কবির বিরহ, হতে পারে প্রেমাস্পদের মুখ, হতে পারে কবি মহাদেব সাহার ‘সর্বাঙ্গে তোমার গুঞ্জন’।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj