মহাদেব সাহার কবিতা : সুতীব্র জীবনবোধ

শুক্রবার, ২ আগস্ট ২০১৯

সাইফুজ্জামান

বাংলা কবিতায় কবি মহাদেব সাহা স্বতন্ত্র ধারার এক কণ্ঠস্বর। তার কবিতায় অনুভূতি, আবেগ ও জীবনের কলস্বর তীব্র। প্রেম ও প্রকৃতি যুগল বন্দি করে তিনি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছেন। বেঁচে থাকার আকুলতা, সংগ্রাম যূথবদ্ধ সুখ-দুঃখের পাঠ কবিতার চেতনাকে সংহত করেছে। তার কবিতা জীবনালেখ্যের গভীর অনুরণের দোলাচালে ভরপুর। হৃদয়স্পর্শী পঙ্ক্তিমালা অভিজ্ঞতা, জীবনযাপন ও স্বপ্নে বন্দি। নিত্যদিনের ঘটনা, দৃশ্যমান জগতের ভেতর অবগাহন শেষে একজন প্রকৃত কবি তুলে আনেন জীবনাবিজ্ঞতার উপাদান কবিতায় ধরা পড়ে কবির বিচিত্র বোধ যা শব্দ ও বাক্যে গ্রথিত হয়। এসব কিছু মা, মাটি, মানুষ যার সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্কিত।

মানব-মানবীর সংবেদনশীলতায় সৃষ্ট জীবন রহস্যের গাঢ় আবেদন কবিতার অন্তর্গত ভূমিকে আর্দ্র করে তোলে। মহাদেব সখেদে যা উচ্চারণ করেন তার মধ্য থেকে আমাদের চেনা জগত খুঁজে পাওয়া যায়। এই গৃহ, এই সন্ন্যাস, কাব্য গ্রন্থের মাধ্যমে ১৯৭২ সালে তার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা আজ দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় পরিণত। কবিতা দর্শনের ও জীবনের টানাপড়েন শুদ্ধ সুষমার জন্ম দেয়। মহাদেব সাহা আধুনিক। তার কবিতায় মানবিক সম্পর্ক, বেড়ে ওঠা ও সময় অতিক্রমণের জীবন্তগাথা যেন সৌন্দর্যের আধার। নিত্যদিন দেখা, কথাবার্তা আর ভাব বিনিময়ের মধ্যে প্রেম জাগ্রত থাকে। প্রেমাস্পদের স্পর্শে ধন্য হয়ে ওঠে মন। প্রেমে বিরহ এক মৌলিক সত্তা। ফেসবুক, ইন্টারনেট, মুঠোফোনের যুগে যোগাযোগের কষ্ট কাউকে পীড়া দেয় কিনা আমরা জানি না। এক সময় যোগাযোগের এই আধুনিক মাধ্যম ছিল না তখন ‘চিঠি’ ছিল মনের ভাব আদান-প্রদানের প্রতিনিধি। প্রেমের আকুতি ছিল। প্রেমিক কতো আবেগে উচ্চারণ করেছে :

করুণা করেও হলে চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও

আঙুলের মিহিন সেলাই

ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলে তাও,

এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো

অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।

চুলের মতন কোন চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও

সমুদ্র বোঝাতে চাও, মেঘ চাও, ফুল পাখি সবুজ পাহাড়

বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখের মতো চিহ্ন কিছু দিও!

আজো তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি,

আসবেন অচেনা রাজার লোক

তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে।

এক কোনে শিশির দিও এক ফোঁটা, সেন্টের শিশির চেয়ে

তৃণমূল থেকে তোলা ঘ্রাণ।

এমন ব্যস্ততা যদি শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো তোমার কুশল

[চিঠি দিও]

মহাদেবের কবিতায় প্রকৃতি ও প্রেম একাকার হয়ে আছে। দয়িতা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন তিনি প্রকৃতির কাছে আশ্রয় চাইবেন। একজন মানস প্রতিমার আচলই হতে পারে প্রেমিক কবির আশ্রয়স্থল। ব্যথিত কবি সেবাশ্রম, স্বাস্থ্য নিবাস ছেড়ে মানসীর কাছে পরম শান্তি ও স্বস্তির জন্য পৌঁছে যাবেন। নর-নারীর শাশ^ত প্রেমাকাক্সক্ষী কবিতার ধ্যানমগ্ন কবি উচ্চারণে বলেন :

সবখানে ব্যর্থ হয়ে যদি যাই

তুমিও ফেরাবে মুখ ¯িœগ্ধ বনভূমি

ক্ষুধায় কাতর তবু দেবে না কি অনাহারী মুখে দুটি ফল?

বড়োই ব্যথিত যদি কোন ¯েœহ ঝরাবো না অনন্ত নীলিমা

সবাই ফেরাবে মুখ একে একে, হয়তো বা শুষ্ক হবে

সব সমবেদনার ধারা

তুমিও কি চির প্রবাহিনী নদী দেবে না এ তৃষিত অঞ্জলি ভরে জল?

(সবাই ফেরালে মুখ)

মহাদেব সাহা বাংলা কবিতায় জাগর উচ্চারণ ও মানবিক জাগরণের সুতীব্র জীবনবোধ কবিতায় সংস্থাপন করেছেন। বৈশি^ক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য লগ্নতা তার কবিতাকে পেলবতা দান করেছে। ক্লান্তি, হতাশা দুঃখবোধ তার কবিতার সহজ জাত উপাদান। প্রেম, প্লেটোনিক আকর্ষণ ও বিরহের অনুরণনত্ত আমরা কান পেতে থাকলে শুনতে পাই। সৌন্দর্য সন্ধান করে কবি নিজেকে চিহ্নিত করেছেন।

শ্রাবণে অবগাহিত মহাদেব ‘শ্রাবণ’ বন্দনায় মুখর। তার কবিতা অশ্রæসজল বিধুর। গ্রামে তার জন্ম। সে কারণেই বোধ হয় বুকের ভেতর এক অনন্ত শ্রাবণকে তিনি ধারণ করেছেন। মহাদেব তার আবেগ, অনুভূতির সাথে একাত্ম হয়ে প্রকৃত কবির দুঃখ কষ্টে লীন হয়ে আছেন। প্রকৃতি, নদী, মানুষ, বর্ষা তার কবিতায় বার বার ফিরে আসে। স্মৃতি, গ্রাম, মন কেমন করা প্রহর নিয়ে অঝোর শ্রাবণ ধারায় মহাদেব শেকড় সংলগ্ন হয়ে পড়েন। ব্যস্ততার ভিড়ে এই শহরে কিংবা প্রবাসে তার গ্রাম স্মৃতি ফুড়ে ওঠে। সঙ্গত কারণে নদীর কাছে পাওয়া, না পাওয়ার গল্প বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নদী কারো ব্যক্তিগত সুখ দুঃখে উত্তাল হয়ে ওঠে না। নদী সর্বংসহা মায়ের মতো ¯েœহ ধারা ও গোপনতার পানচুন রপ্ত করা রমণীর মতো বহমান। নদী ¯্রােতস্বিনী। তাকে বলতে শোনা যায় :

বড়ো ইচ্ছে করে নদী, কিছুক্ষণ তোমার পাশে গিয়ে দাঁড়াই

শৈশবে মন খারাপ হলে যেমন তোমার কাছে গিয়ে দাঁড়াতাম

একবার বুক উজাড় করে সব কথা তোমাকে বলি

দু’হাতে এই মুখ ঢেকে কতো যে কাঁদি, কেউ তা জানে না।

কী যে ভালো হয় আজ যদি তোমার জলে

সব কলঙ্ক ধুয়ে ফেলি।

মহাদেব গীতল প্রেমের কবিতার মধ্য দিয়ে অনন্ত তৃষ্ণাকে ধারণ করেছেন। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, চাওয়া পাওয়ার তাড়না তার কবিতাকে সৌন্দর্যময় করে তুলেছে। বিষাদ-কাতরাতা তার নিত্য সঙ্গী। দুঃখ বিলাস নয় দুঃখ জয়ের মন্ত্রণা মহাদেব সহজ করায়ত্ত করে পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘ পথ। কতো আপন করে তাই তাকে বলতে শুনি : হায় আমার দুঃখ আছে কত রকম/ বুকের ক্ষত/ বুকের গাঢ় জখম/মা যেমন বলেন/হলো না তার ঘটি বাটি সোনার বাসন/ন্যায্য আসন/সবাই আমরা দুঃখ করি/দুঃখ করি হাজার রকম/সবাই এই বুকের নীচে সুনীল জখম/সবাই আমরা দুঃখ করি/একটা কিছুই দুঃখ করি/ ঘটি বাট, বসত বাড়ি, ফুল দানী বা সোনার বাসন/নিজের জন্য হলো না ঠিক যোগ্য আসন/হাত বাড়াবার শক্ত লাঠি/পরিপাটি সোনার জীবন হলো না ঠিক/যেমনটি চাই/দুঃখ করি /দুঃখ আছে কত রকম।

নারী ও প্রকৃতি, প্রেম আর কাতরতা মহাদেবের কবিতায় স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে সংযোজিত। তিনি একদিকে বাউল অন্যদিকে প্রেমিক ও আগন্তুক। মহাদেব সাহা শীর্ষ কবি। তার কবিতায় যাপিত জীবনের যন্ত্রণা ও আনন্দ প্রকাশিত। প্রায় ৮০ খণ্ডের কাব্যগ্রন্থে নিরন্তর প্রণয়-বিরহ, সংগ্রাম ও রক্তাক্ত হওয়ার বিবরণ বিধৃত। এ সত্যগুলো আমাদের বলতে হবে। তিনি শীর্ষ কবি। তার কবিতায় সুঘ্রাণ, তীব্রতা ও দহনের অবিরাম শব্দ প্রতিধ্বনি হয়। পাওয়া কিংবা হারানোর মধ্যে থেকে তিনি ‘প্রেম’ স্পর্শ করে মানবীর এই পৃথিবীতে প্রদক্ষিণ করেন :

একটি নারীও যদি অবশিষ্ট থাকে একটি

গোলাপও যদি উন্মোচিত

রাখে তার বুক,

আমি শুধু তারই জন্য আরো দীর্ঘদিন বেঁচে

থাকবো, বেড়াবো।

মনে হয় না কোথাও একটি নারী থাকতে এ

শরীর ঢলে পড়ে

যাবে, জ¦র হবে, অ¤øপীড়া হবে

মহাদেব সাহার কবিতায় খণ্ড খণ্ড চিত্র ভেসে ওঠে। নাগরিক জীবনের কোলাহল, ক্রুরতা, অগ্নিতাপের মাঝে তিনি শীতলতা খুঁজে ফেরেন। তার কবিতায় ঐতিহ্যের নিদর্শনের অনুসন্ধান অব্যাহত আছে। উপমা-উৎপ্রেক্ষা চিত্রকল্প ও নন্দনতত্ত্বের চারদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, প্রেম-স্মারক ও প্রকৃতি স্বমহিমায় উজ্জ্বল। হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা আক্রান্ত একদল মানুষ পৃথিবীর সুন্দর তছনছ করে দিচ্ছে। মহাদেব পৃথিবীর রূঢ়তায় কষ্ট পেয়েছেন :

মানুষের ঘরে জমেছে অনেক হিংসা,

কিন্তু কোনো ভালোবাসা নেই

তবে কি ফুরিয়ে গেছে মানুষের হৃদয়ের যা কিছু সঞ্চয়,

অনেক জমেছে তার নোট, টাকাকড়ি, সোনার মোহর

কিন্তু কেন নেই একটি বৃক্ষের ছায়া, দুটি কচিপাতা

নেই সামান্য শিশির, একটু ঝরনা ধারা এক বিন্দু জল।

ধ্বংসের মধ্যে সৃষ্টি উল্লাস তার অন্বেষার বিষয়। শেকড় লগ্ন কবি প্রকৃতি, মানুষ, জন্ম গ্রামে ফিরে যাওয়ার আর্তি প্রকাশ করেন। তার যাত্রা ইতিহাস, ঐতিহ্য, বীর যোদ্ধা আর জন্মভূমির সোনালী দিনের দিকে। মহাদেব ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ বিশেষ করে পঁচাত্তরের মর্মন্তুদ ঘটনা জাতি পিতার হত্যা পরবর্তী ঘটনা আপন যতেœ কবিতার অংশ করেছেন/স্বাধীনতা পরবর্তী সামরিক শাসন, স্বৈরাচারের অগণতান্ত্রিক কর্মযজ্ঞে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষার মৃত্যু মহাদেবকে ব্যথিত করেছে। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ উচ্চকিত হয়েছে :

বাংলাদেশ চায় না তোমাকে, তুমি চলে যাও, যাও

কতো যে মায়ের খালি বুক ফেলে দীর্ঘশ^াস-

রক্তমাখা হাত, তুমি ক্ষমা চাও, ক্ষমা ভিক্ষা চাও।

তোমাকে চায় না এই সোনালী ধানের ক্ষেত, কচি দূর্বা, দীর্ঘ শালবন

চায় না ভোরের মুখ, কলাপাতা, গায়ের উঠোন;

কতো না পিতার বক্ষে তুমি জে¦লেছো আগুন তুমি চলে যাও;

একটি স্বর্ণচাপার কাছে এবার আমি নতজানু/একটি জুঁই, একটি কোমল ঝর্ণা, একটি মুগ্ধ শালিক/তোমরাই আমার বিচারক/বিশ^াস করো আমার অক্ষমতাই রাসেলের হত্যাকারী/সুলতানার ঘাতক….আমারই ব্যর্থতা, আমারই ব্যর্থতা/ সে এই স্বল্প ভালোবাসা স্বাধীনতা ও শেখ মুজিবের হত্যাকারী/এই হত্যার বিচার চাই/মুজিব হত্যার বিচার চাই/আমিই তোমার হত্যাকারী, আমার ফাঁসি চাই।

পরিশেষে বলা যায় মহাদেব সাহা আত্মজৈবনিক কবি। তিনি কবি হয়েছেন অনুভূতিপ্রবণ মনন ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার অভিঘাতে। তার জীবনে যেমন অপার আনন্দ আছে তেমন রয়েছে বেদনা ও বিরহের প্রশান্ত ছায়া। সমাজের অবক্ষয়, মানবিক বিপর্যয়, সমাজ ব্যবস্থার অসমতা ও মানুষের অন্তর্গত বোধ তাকে কবি হিসেবে আবির্ভূত হতে সাহায্য করেছে। তার কবিতা সমকালীনতা, রাজনীতি, প্রেম বিরহ বেদনায় আকীর্ণ নারী-নিসর্গ সমানভাবে উপস্থিত থাকে তার কবিতায়। নস্টালজিয়া ও জন্ম গ্রামের টান মহাদেব উপেক্ষা করতে পারেন না। সাম্য ও সৌম্যের দিকে তার পক্ষপাত। পৃথিবীর তাবৎ মানুষের চেতনায় ফলগুধারায় অবগাহিত হয়ে। তার অভিজ্ঞ বাণী মালা মহাকালের গর্ভে গভীর চিহ্ন রেখে যেতে বাধ্য, নির্দ্বিধায় বলা যায়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj