একজন শুদ্ধ শিল্পী

শুক্রবার, ২ আগস্ট ২০১৯

মো. জাকারিয়া হোসেন

বাংলা কবিতায় মহাদেব সাহার (জ. ১৯৪৪) প্রতিষ্ঠা যদিও স্বাধীনতা-উত্তরকালে তবে ষাটের দশকেই কবি হিসেবে তাঁর আবির্ভাব। ষাটের দশকে বাংলা কবিতার উর্বরতার সেই মহাজাগরণে রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, আব্দুল মান্নœান সৈয়দ, হুমায়ুন আজাদ, সিকদার আমিনুল হক, মোহাম্মদ রফিক প্রমুখদের সমান্তরালে সাহাও একজন গুরুত্বপূর্ণ সহরথী। কবিতাপ্রেমিক মহাদেব সাহার যাত্রাপথের সূচনা মফস্বলে। কলকাতা কিংবা ঢাকার বাইরে অবস্থান করেও কেবলমাত্র কবিতাকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন প্রতিক‚লতা সত্ত্বেও তিনি সামনে এগিয়ে গেছেন। এ ক্ষেত্রে ফারুক সিদ্দীকীর সঙ্গে যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত ছোটকাগজ ‘বিপ্রতীপ’ মহাদেব সাহার শিল্পচর্চায় প্রথম অভিযাত্রা। প্রকাশিত হয় বগুড়া থেকে। সে সময় সাহিত্যে চলছিল বিভিন্ন আন্দোলনের জোয়ার। হাঙ্রি জেনারেশন, বিট জেনারেশন, অ্যাংরি জেনারেশন প্রভৃতির হাওয়া ঢাকাসহ দেশের সাহিত্যমণ্ডপগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। মফস্বল শহর বগুড়াতেও একদল তরুণের মধ্যে সেই হাওয়া দোলা দিয়ে যায়। এ সময় মহাদেব সাহাও প্রভাবিত হন। আর এভাবে প্রান্ত থেকেই আরম্ভ হয় তাঁর কবিতাচর্চা।

কবি মহাদেব সাহা আমাদের কাব্যধারায় শুদ্ধতম শিল্পের একজন অন্যতম পূজারী। দেশ বিভাগ-পরবর্তী বাংলাদেশের কাব্যচর্চায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উত্তাল পরিস্থিতির অনুষঙ্গে রচিত ¯েøাগানসর্বস্ব কবিতার যে ট্রেন্ড শুরু হয় তিনি সে পথ অনুসরণ করেননি। বরং নিজেকে দেশ, মাটি ও নিসর্গের সাথে সম্পৃক্ত রেখেই তিনি এগিয়েছেন মানবমনের চিরন্তন অনুভূতির সন্ধানে। তাঁর কবিতায় তিনি প্রেম, প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের কথা বলেছেন। গুরুত্ব দিয়েছেন হৃদয়ের আকুতি ও ব্যক্তিক অনুভূতিকে। ষাটের দশকের কাব্যিক উন্মাদনাকে সঙ্গে নিয়েও নিজস্ব গতিপথে তাই তিনি জীবন ও শিল্পের কাছে বারবার ফিরে এসেছেন। বস্তুত একজন প্রকৃত শিল্পীর পক্ষে তার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি উপেক্ষা করা কঠিন। কেননা নিশ্চিতভাবেই চারপাশের ঘটনা সংবেদনশীল কবি-হৃদয়কে আলোড়িত করে। সেই আলোড়ন আরো ভীষণভাবে অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায় যখন রাষ্ট্রীয় সংকট চরমে পৌঁছায়, মুক্তিযুদ্ধের মতো বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয় কিংবা গণনায়ক হিসেবে উপস্থিত থাকেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মহাদেব সাহা নিজেও এ সমস্ত কিছুকে পাশ কাটিয়ে কেবল প্রেম, প্রকৃতি কিংবা চিরন্তন বিষয়কেই শুধু তাঁর কবিতার বিষয় হিসেবে প্রধান অবলম্বন করেননি। তাঁর কবিতাতেও উঠে এসেছে সমকালীন রাষ্ট্রীয় সংকট, স্বাধীনতা সংগ্রাম কিংবা বঙ্গবন্ধু।

প্রায় শতকের কাছাকাছি রচিত কাব্যগ্রন্থে তিনি জগতের বৈচিত্র্যকে জটিল ভাবনায় ধোঁয়াশাচ্ছন্ন না করে সরল ও সহজ অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করেছেন। জীবনের গূঢ়তাকে সূ²-গভীর মনন ও চেতনার সংস্পর্শে সাজিয়েছেন সাবলীল ভঙ্গিতে। সাহার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’ (১৯৭২)। এরপর তিনি ক্রমান্বয়ে যেসব কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন তন্মধ্যে বিশেষভাবে চিহ্নিত করতে হয় যেসব গ্রন্থগুলোকে তা হলো : ‘মানব এসেছি কাছে’ (১৯৭৩), ‘চাই বিষ চাই অমরতা’ (১৯৭৫), ‘কী সুন্দর অন্ধ’ (১৯৭৮), ‘তোমার পায়ের শব্দ’ (১৯৮২), ‘লাজুক লিরিক’ (১৯৮৪), ‘মানুষ বড় ক্রন্দন জানে না’ (১৯৮৯), ‘অস্তমিত কালের গৌরব’ (১৯৯২), ‘যদুবংশ ধ্বংসের আগে’ (১৯৯৪), ‘বিষাদ ছুঁয়েছে আজ মন ভালো নেই’ (১৯৯৬), ‘কেন মোহে কেন বা বিরহে’ (২০০০), ‘অন্ধের আঙ্গুলে এত যাদু’ (২০০৯), ‘অক্ষরে বোনা স্বপ্ন’ (২০০৯), ‘হাতে অমৃত কুম্ভ পান করি বিষ’ (২০০৬), ‘মাটির সম্ভার’ (২০১৭) প্রভৃতি। শিশুতোষ কিছু গ্রন্থও রয়েছে তাঁর। রয়েছে প্রবন্ধের বই। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ : ‘গরিমাহীন গদ্য’ (২০০৯), ‘আনন্দেও মৃত্যু নাই’ (২০১১), ‘ভাবনার ভিন্নতা’ (২০১১)।

মহাদেব সাহাকে বলা হয়ে থাকে প্রধানত প্রেমের কবি। এই অভিধাটি তাঁর মতো খ্যাতিমান কবিকে ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বেঁধে ফেলে কিনা সে আলোচনাকে পাশে রেখেও এ কথা সহজেই স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় হিসেবে প্রেমই যুক্তিগতভাবে এগিয়ে। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রকাশিত কবিতা সংকলনের শিরোনাম লক্ষ করলেই স্পষ্ট হওয়া যায়। ‘মহাদেব সাহার প্রেমের কবিতা’, ‘প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা’, ‘প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতা’ শিরোনামে প্রকাশিত এই কবিতা সংকলনসমূহ প্রেমের কবি হিসেবে তাঁর জনচাহিদার প্রমাণ রাখার সাথে সাথে তাঁর কাব্যঝোঁকের দিকটিকেও নির্দেশ করে। এ ক্ষেত্রে আরেকটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি তাঁর কাব্যগ্রন্থের নামকরণে ভালোবাসা ও প্রেম শব্দ যতবার ব্যবহার করেছেন বাঙালি আর কোনো কবি সম্ভবত তা ব্যবহার করেননি। উদাহরণস্বরূপ : ‘কোথা সে প্রেম কোথাসে বিদ্রোহ’ (১৯৯০), ‘কেউ ভালোবাসে না’ (১৯৯৭), ‘ভালোবাসি হে বিরহী বাঁশি’ (১৯৯৮), ‘অর্ধেক ডুবেছি প্রেমে অর্ধেক বিরহে’ (২০০৭)। যদিও নামকরণে প্রেম-ভালোবাসা শব্দের উপস্থিতির আধিক্যই কবি হিসেবে তাঁকে ‘প্রেমের কবি’ অভিধায় আখ্যায়িত করার মাপকাঠি হতে পারে না কিন্তু যখন একশর কাছাকাছি কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশের নামকরণ কোনো বিশেষ বিষয়কে অবলম্বন করে আবর্তিত হয় তখন আর কোনোভাবেই তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় যে প্রেম তা অস্বীকারও করা যায় না। তাঁর কবিতাপাঠে আরও বেশি করে আমরা সেই উপলব্ধির দিকেই ধাবিত হই। তাঁর কবিতাই বলে দেয় তিনি সংকটময় রাষ্ট্র, স্বাধীনতাযুদ্ধ, রাজনীতি, বঙ্গবন্ধু কিংবা ফুল, মাটি ও নিসর্গের কথা বললেও তাঁর মূল শেকড় মানব-মানবীর চিরন্তন অনুভূতিকে আঁকড়ে রয়েছে। তাই তিনি বারবার; বারংবার হাত পেতেছেন প্রেম-ভালোবাসার অনাবিল সৌন্দর্যের দ্বারে। তবে তাঁর প্রেম প্রতিনিয়তই বিরহের যন্ত্রণায় আবিষ্ট। তাঁর ভালোবাসাও কোথাও না কোথাও যেন দুঃখবোধ, না-পাওয়া এবং চাপা কষ্টে আচ্ছন্ন। কবির এই বিরহও আবার পৌনঃপৌনিক। মহাদেব সাহার বিরহপ্রধান কিছু কাব্যগ্রন্থ : ‘বিষাদ ছুঁয়েছে আজ, মন ভালো নেই’ (১৯৯৬), ‘কেউ ভালোবাসে না’ (১৯৯৭), ‘মন কেন কাঁদে’ (১৯৯৮), ‘অর্ধেক ডুবেছি প্রেমে অর্ধেক বিরহে’ (২০০৭) প্রভৃতি।

মহাদেব সাহার কবিতায় প্রেম সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে। তবে তিনি প্রেমের কবি হিসেবে খ্যাত হয়েছেন কেবল তাঁর প্রেম বিষয়ক কবিতার সংখ্যার কারণেই নয়। এ ক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য যে, শৈল্পিক উপস্থাপন ও আবেগময় আকুতির সমন্বয়ই তাঁর কবিতাকে উৎকর্ষমণ্ডিত করেছে। রাজনৈতিক ডামাডোল, সামাজিক অস্থিরতা, হিংসা, দ্বেষ, কলুষতা সবকিছুকে ভুলে কবির প্রেমিক-মন অবলীলায় ধরা দিয়েছে নির্মল বিশুদ্ধতার কাছে। প্রেমিকার আঁচল সন্ধানে সুখশোভা নিমজ্জিত অমৃত পানের দিকে উন্মুখ হয়েছেন। বৃষ্টি¯œাত ভালোবাসার লোকপ্রিয় মসৃৃণ পথে বেহালার সুর তুলে অগণিত অনুভূতিসর্বস্বদের মোহমায়ায় আচ্ছন্ন করেছেন তিনি। আদিম বাঁশির সুরের লহরীতে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন কোটি হৃদয়। পিপাসার্ত আত্মাদের তৃপ্ত করেছেন তাঁর অন্তরের সুধারস বিতরণ করে। আর তাঁর কবিতায় সৌকর্যসুরভিতে আচ্ছন্ন শব্দলহরী শাণিত করেছে প্রেমপ্রত্যাশীদের।

প্রেম ও ভালোবাসাকে অন্তরের গহীন থেকে বাস্তব জগতে ছড়িয়ে দেয়ার প্রত্যাশী কবি। তিনি বিশ্বাস করেন ভালোবাসলেই জীবন শুদ্ধ হয়, সমস্ত কিছুকে মনে হয় সবুজ ও সুন্দর এবং ভালোবাসলেই বন্ধ হতে পারে দুনিয়ার হানাহানি ও সংকট।

বাঙালি কবিদের মুগ্ধদৃষ্টি ও সখ্য নতুন নয়। বর্ষার কদম, শরতের আকাশ ও কাশফুল কিংবা বসন্তের কোকিলের ডাক বাঙালি কবিদের বহুল ব্যবহৃত উপাদান। মহদেব সাহাও তার ব্যতিক্রম নন। কিন্তু তিনি প্রকৃতির এই পটপরিবর্তনকে প্রিয়জনের প্রিয় মুহূর্ত, ভালোবাসায় ভুলানো সুন্দর ক্ষণকে ঋতুবৈচিত্র্যের সৌন্দর্যে তাঁর কবিতায় ধারণ করেছেন। শীতের আনুক‚ল্যে প্রেয়সীর কাছে যাওয়ার আবেদন করেছেন বিভিন্ন অনুষঙ্গে। শীতের গরম পোশাকে, উষ্ণ কাঁথা, উপাদেয় রোদ, শুভ্র সানবাথ, কোল্ড ক্রিম, তুচ্ছ প্রসাধনী এমনকি শীতের উদ্ভিদ হয়েও ভালোবাসার ভালো থাকায় তার সান্নিধ্য পেতে চেয়েছেন। কবির পঙ্ক্তি :

যে কোনো ঋতু ও মাস, বৃষ্টি কিংবা বরফের চেয়ে

মনোরম তোমার সান্নিধ্য, আমি তাই

কার্ডিগান নয় বুকের উষ্ণতা দিয়ে ঢেকে দেই

তোমার শরীর-

(এই শীতে আমি হই তোমার উদ্ভিদ)

হৃদয়ার্তির অনুপম প্রকাশ থাকে প্রেমে। প্রেম মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয় জীবনের দুর্গম কঠিন পথ অনায়াসে পাড়ি দিতে। ভালোবেসেই মানুষ অসাধ্যকে সাধন করে, বাধ্য করে অবাধ্যকে। ভয়-ডর-শঙ্কা সমস্তকিছুকে পেছনে ফেলে হৃদয়ের এক অবিরাম উচ্ছ¡াসে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। প্রেমকে পেতে, প্রেমিকার সংস্পর্শে নিজেকে একবার উপস্থাপন করতে মানুষের প্রচেষ্টা থাকে দুর্দম। কবি মহাদেব সাহাও এরকম এক দুর্দমনীয় ভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তাঁর ‘এককোটি বছর হয় তোমাকে দেখি না’ শীর্ষক কবিতাটিতে। প্রেমিকাকে দেখতে সমস্ত বাধা অতিক্রম করে সবকিছু জয় করতে তিনি প্রত্যয়ী।

প্রেমে ভাবের আদান-প্রদানে চিঠির ব্যবহার ক্লাসিক। মহাদেব সাহার কবিতায় প্রেম ও চিঠির দুর্দান্ত সমন্বয় ঘটেছে। প্রেমিকাকে একখানা চিঠি লিখতে কবির যে প্রস্তুতি ও প্রগাঢ় অনুভূতি তা প্রতিটি পাঠককেই ছুঁয়ে যায়। তাঁর এসব কবিতায় নিঃসংকোচ মনের ভাবাবেগ দারুণ শব্দপ্রয়োগে কবি উপস্থাপন করেছেন। নদীর কল্লোল, ঝরণার গান, পাখির শিস, ভোরের শিশির এ সমস্তকিছুর কাছে কবি চিঠি লেখার প্রস্তুতির জন্য দ্বারস্থ হয়েছেন। তবুও লেখা হয়নি কবির প্রতাশিত সেই গূঢ়তম চিঠি। কবি বলছেন : ‘তোমাকে লিখব বলে জীবনের গূঢ়তম চিঠি/হাজার বছর দ্যাখো কেমন রেখেছি খুলে বুক।’ একটা চিঠির জন্য প্রেমিকহৃদয়ে যে কী গভীর আকুলতা থাকতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মহাদেব সাহার কবিতা ‘চিঠি দিও’।

মহাদেব সাহা তাঁর কবিতায় একজন একনিষ্ঠ প্রেমিক এবং একই সাথে রমনপ্রিয়। নারীর সৌন্দর্যে তাঁর যেমন মুগ্ধতা তেমনি শরীরী আবেদনেও সমান তাঁর আগ্রহ। এছাড়া মর্মস্পর্শী চিত্রময় প্রেম তাঁর কবিতার প্রধান শক্তি। তাঁর কবিতা আনন্দ, স্বপ্ন, আর্তি ও প্রেমকে সমর্থন করে। মানবমনের সৌন্দর্যের খোঁজ নিতে কবি বারবার ছুটে যান নারী, নিসর্গ ও হৃদয়ের গহীন বন্দরে। সেখানে যুগপৎ অবস্থান করে প্রেম ও বিরহ। তিনি বাংলাদেশের কবিতায় এমনই একজন যিনি প্রায় রসলুপ্ত, প্রাণহীন শৈলীসর্বস্ব আধুনিক কাব্যধারার সমারোহে ব্যতিক্রমী সরল সবুজায়নের রূপকার। প্রেম এবং প্রেমজাত দুঃখবোধ রূপায়ণে একজন শুদ্ধ কবিসত্তার রুদ্র মূর্তি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj