তালিকাচ্যুত কোম্পানি : ২৫ বছরেও উদ্ধার হয়নি আটকে পড়া বিনিয়োগ

বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : দেখতে দেখতে পার হয়ে গেছে ২৫ বছর। ফিরে পাওয়া যায়নি বিনিয়োগকৃত অর্থ। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে নিঃস্ব হওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়। আইন বা বিধি না থাকায় ২৫ বছর আগের বিনিয়োগ ফিরে পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। এই দীর্ঘ সময়ে এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা স্টেকহোল্ডার কারো কোনো তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি। গত ২৫ বছরে পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত হয়েছে ৩৮টি কোম্পানি। ১৯৯৪ সাল থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই তালিকাচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। এ ৩৮টি কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের ১৩১ কোটি ৩৬ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা আটকা পড়েছে। টাকার এই অঙ্ক কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ফেসভ্যালু অনুযায়ী। যখন এসব কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত হয়েছে, সেই সময়কার শেয়ারের বাজার মূল্য ধরলে আটকে থাকার টাকার অঙ্ক আরো বেশি হতো। শুধু তাই নয়, তালিকাচ্যুত এসব কোম্পানির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ধরলে টাকার অঙ্ক আরো বাড়বে।

আটকে থাকা টাকা উদ্ধারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কেউ এর দায় নিতে চায় না। ফলে দীর্ঘদিন আটকে পড়া এই বিপুল অঙ্কের টাকা উদ্ধারে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো ফল পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। এমন অনেক বিনিয়োগকারী আছেন যারা তাদের বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। এদিকে তালিকাচ্যুত কোম্পানিতে বিনিয়োগ উদ্ধারে নেই কোনো আইন বা নীতিমালা। ফলে বিনিয়োগকারী নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে তার বিনিয়োগ ফেরতের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানাতে পারেন না। আর সে কারণে বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও এই টাকা উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। তবে বিএসইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, কোম্পানি আইন-১৯৯৪ অনুযায়ী কোনো কোম্পানি অবলুপ্ত হলে শেয়ারহোল্ডারদের দায়দেনা মিটিয়ে দিতে পরিচালনা পর্ষদ বাধ্য থাকবে। বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজনে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। তবে পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত হলে সেই কোম্পানি যদি আইন অনুযায়ী অবলুপ্ত না হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ উদ্ধারে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারেন না। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা বলছেন, একটি কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার সময় সঠিকভাবে যাছাই-বাছাই না করলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। স্টক এক্সচেঞ্জকে কোনো কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করার আগে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ফেরতের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে বিনিয়োগ সুরক্ষা তহবিল গঠন করা যেতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবিএর সভাপতি শাকিল রিজভী ভোরের কাগজকে বলেন, কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের করার কিছুই থাকে না। তারা একত্রিত হয়ে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। তবে কোম্পানি যদি অবলুপ্ত হয়, তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের প্রাপ্য অংশ বুঝে নিতে পারেন। কিন্তু আমাদের দেশে কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো কোম্পানি অবলুপ্ত হওয়া অনেক সময়সাপেক্ষ। তা ছাড়া তালিকচ্যুতির পর অবলুপ্ত হওয়ার নজির নেই।

অনেক কোম্পানির উদ্যোক্তারা ইচ্ছে করেও তালিকাচ্যুত হয়েছে এমন নজির রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোম্পানির উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে বাজারে থাকা সব শেয়ার কিনে নেন। বাজারে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শেয়ার না থাকলে সে কোম্পানি নিয়ম অনুযায়ী তালিকাচ্যুত হয়। এভাবেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঠকানোর নজির রয়েছে। এ ধরনের সমস্যা থেকে উত্তরণে বাইরের দেশে তালিকাচ্যুত হতে যাওয়া কোম্পানির মালিকানা পরিবর্তন বা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন বা কোনো ভালো কোম্পানির সঙ্গে একীভূত করার পদ্ধতি চালু রয়েছে। আমাদের দেশে এ ধরনের প্র্যাক্টিস নেই। শাকিল রিজভী বলেন, তালিকাচ্যুতির আগে একটি কোম্পানি ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে থাকে। এই মার্কেটটিও ভালো মতো কাজ করছে না। ওটিসিতে থাকা অবস্থায় কোম্পানির পরিস্থিতি খারাপ হলে সেটি অন্য কোনো ভালো কোম্পনির সঙ্গে একীভূত করা যেতে পারে।

আবার ব্যবস্থাপনা বা মালিকানাও পরিবর্তন করা গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লাভবান হতে পারেন। এ জন্য ওটিসি মার্কেটকে আরো সক্রিয় ও কার্যকর করা এবং কোম্পানির অবলুপ্তির পদ্ধতি সহজ করা দরকার। তাহলে কোনো কোম্পানি তালিকাচ্যুত হলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ অনেকাংশে সুরক্ষিত থাকবে।

এদিকে শেয়ারবাজার থেকে তালিকাচ্যুত হওয়ার কারণে হারিয়ে যাওয়া এসব কোম্পানি থেকে টাকা ফেরত নিতে পারছেন না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এবং ফেরত পাওয়াটাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এদিকে এসব কোম্পানির স্থাবর-অস্থাবর কোটি কোটি টাকার সম্পদ ভোগ করছেন এককভাবে কোম্পানির পরিচালকরা। বিনিয়োগকারীদের টাকা লুট করে আরাম-আয়েশে পরিচালকরা দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারী।

অর্থ-শিল্প-বাণিজ্য'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj