৪ কারণে তারল্য সংকট

বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯

মরিয়ম সেঁজুতি : সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট চলছে। এমনকি বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংকগুলোতেও এখন নগদ টাকার সংকট। নিয়ম মানতে গিয়ে ছোট ব্যাংকগুলোও পারছে না ঋণ বিতরণ করতে। এমন সংকটে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো উচ্চসুদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে বিশেষ রেপোতে অর্থ ধার নিচ্ছে। ফলে কলমানি ও আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে সুদহার বেড়েছে। গত মাসে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার ইন্টার ব্যাংক রেপোতে ধার নেয়ার পরিমাণ ও সংখ্যা দুটোই বেড়েছে।

জানা গেছে, সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি হওয়ায় গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ হয়েছে এ খাতে। এর বাইরে খেলাপি ঋণ, অফশোর ইউনিটের ঋণের বিপরীতে বিধিবদ্ধ জমা ও ডলার কেনায় ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থ আটকে গেছে। ফলে অর্থবছরের গত আট মাসে ব্যাংকের বিনিয়োগযোগ্য অতিরিক্ত তারল্য কমেছে অর্ধেকের বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক খাতগুলোর মধ্যে সুদহার সমন্বয় করা প্রয়োজন, নইলে বিশৃঙ্খলা আরো বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য কমছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উদ্বৃত্ত তারল্য এত কমতে দেখা যায়নি। এদিকে তারল্যের ওপর চাপের কারণে সুদহার কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। ব্যাংকের এমডিদের মতে, ব্যাংক খাতে এখন সবচেয়ে খারাপ সময় যাচ্ছে। একদিকে আমানত সংগ্রহে বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণ আদায়ও বাড়ানো যাচ্ছে না। এতে তারল্য সংকট বাড়ছে, ফলে কমছে বিনিয়োগযোগ্য তহবিল। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো মুদ্রাবাজার থেকে তাদের ধার করার প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। বাড়ছে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে সুদের হার, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত মার্চ মাস পর্যন্ত তারল্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব মিলিয়ে ১০ থেকে ১২টি ব্যাংকের বিনিয়োগ করার মতো তহবিল আছে। বাকি ব্যাংকগুলো টাকা ধার করে দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাচ্ছে।

দেখা গেছে, ঋণখেলাপির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে নিরাপদে থাকতে আগে তিন মাসের মাথায় এক ধরনের ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধ করতেন। কিন্তু এখন খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন হওয়ায় ব্যবসায়ীরা সময় পাচ্ছেন ৯ মাস। অর্থাৎ এখন ৯ মাস পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপি মুক্ত থাকতে পারছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে যারা আগে তিন মাসের শেষ সময়ে ঋণ পরিশোধ করতেন এখন তারা ৯ মাসের মাথায় এসে ঋণ পরিশোধ করছেন। এতে ব্যাংকে নগদ টাকার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ঋণখেলাপিদের নানা সুযোগ দেয়ার ঘোষণায় ঋণ পরিশোধে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছেন কিছু উদ্যোক্তা। যারা এত দিন নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তাদের অনেকেই হঠাৎ করে ঋণ পরিশোধ বন্ধ করে দিয়েছেন।

সবমিলে ব্যাংকে নগদ আদায়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকের নগদ আদায় কমে যাওয়ায় মহাবিপাকে পড়েছে কিছু ব্যাংক। যারা অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে (ওবিইউ) বৈদেশিক মুদ্রায় বেশি বিনিয়োগ করেছেন ওই সব ব্যাংক মেয়াদ শেষে বৈদেশিক মুদ্রায় দায় পরিশোধ করতে বেকায়দায় পড়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় দুঃসময় যাচ্ছে। ধীরে ধীরে তা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও দেশের অন্যান্য খাতের তুলনায় ব্যাংক খাত ছিল অপেক্ষাকৃত সুশৃঙ্খল। কিন্তু এই খাতে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে ব্যাংক খাত চাপের মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক হিসাবে দেখা গেছে, গত এক বছরে আমানত ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ বাড়লেও একই সময়ে ঋণ বেড়েছে ১২ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অন্যদিকে মার্চ শেষে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৯১ শতাংশ। তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতে এখনো আমানত সংগ্রহের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি।

এদিকে চলতি অর্থবছরে (২০১৮-১৯) জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি অর্থবছরের গত আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) খাতটি থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ৩৫ হাজার ৬০২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অন্যদিকে ব্যাংক খাত থেকে নিয়েছে মাত্র ১০ হাজার ৮০ কোটি টাকা। ব্যাংকের চেয়ে সুদহার বেশি হওয়ায় এ খাতে ঝুঁকছেন আমানতকারীরা। আবার আমদানি বাণিজ্য বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো ডলার সংকটে ভুগছে। ব্যাংকগুলোর কাছে চলতি বছরে প্রায় ২০০ কোটি ডলার বিক্রির বিপরীতে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংকের নগদ অর্থের পরিমাণ কমে গেছে। অন্যদিকে গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর বাইরে অবলোপন করা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া পুনঃতফসিল করা হয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঋণ। সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা আটকে আছে একশ্রেণির ব্যবসায়ীদের হাতে। এসব ঋণের মধ্যে মন্দ ঋণের বিপরীতে শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়েছে বার্ষিক আয় থেকে। এভাবেও কমছে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের পরিমাণ। ২০১৮ সালে ব্যাংক খাতে তরল সম্পদ বা তারল্যর পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৬৪ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। আট মাস পরে তা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৪৭ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। আট মাসে তারল্য কমেছে ১৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকা বা ছয় দশমিক ৪৮ শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারি শেষে ব্যাংক খাতে সর্বনি¤œ তরল সম্পদ সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল এক লাখ ৮৩ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। এর ফলে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ব্যাংকগুলোর হাতে বিনিয়োগযোগ্য অতিরিক্ত নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। এই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল চার শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তা নেমেছে ছয় হাজার ৩৯৯ কোটি টাকায়। এই সাত মাসে কমেছে পাঁচ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি নেমেছে দুই দশমিক ৫৯ শতাংশে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, কয়েকটি ব্যাংকের আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণে সামগ্রিকভাবে ঋণ-আমানত অনুপাত বেশি। একটি বেসরকারি ব্যাংকের কেলেঙ্কারির ঘটনায় আমানতকারীরা ব্যাংকের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি। নিরাপদ ও সুদহার বেশি হওয়ায় সবাই ছুটছেন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে। এ জন্য সঞ্চয়পত্র জনপ্রিয় হচ্ছে। অবশ্য আগেও সঞ্চয়পত্রের চেয়ে ব্যাংক আমানতের সুদহার কম ছিল। তারপরও ব্যাংকগুলো আমানত পেত, কিন্তু এখন পাচ্ছে না। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও ব্যাংকগুলো সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে পারছে না।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj