উজাড় হচ্ছে ক্ষেত, খামার ও নার্সারি : রোহিঙ্গা আসায় সীমান্তে নানা সমস্যায় নারী

শনিবার, ১৬ মার্চ ২০১৯

শাহীন শাহ, টেকনাফ (কক্সবাজার) থেকে : আনোয়ারা বেগম (৪০)। বেশির ভাগ সময় ক্ষেত, খামার ও নার্সারিতে কাজ করে সংসার চালান। পাশাপাশি দুবছর আগেও হোয়াইক্যং বন বিভাগের সহায়তায় নার্সারি করেছিলেন। কিন্তু মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসাতেই তার কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে গেছে। তার আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গাদের লক্ষাধিক বসতি। রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে ক্ষেত-খামার ও নার্সারি উজাড় হতে থাকে। রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেত-খামার নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে নালিশ করেও কোনো সুরাহা মেলেনি। এখন তিনি জীবিকা নির্বাহের তাগিদে এখানে-সেখানে আসা যাওয়া করছেন। স্বামী পরিত্যক্তা এই আনোয়ারা টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বদি আলমের মেয়ে। একই উপজেলা ও ইউনিয়নের মনিরঘোনা এলাকার আলী আকবরের মেয়ে রুমানা আক্তারও (৩৫) বন নির্ভরশীল ছিলেন। তিনি এখন নার্সারি বাদ দিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চাকরির চেষ্টা করছেন। শুধুমাত্র আনোয়ারা বেগম ও রুমানা আক্তার নন। কক্সবাজার জেলার সীমান্ত উপজেলা উখিয়া-টেকনাফের অসংখ্য পেশাজীবী নারী নানা সমস্যায় জর্জড়িত। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগসহ নানা বিষয়ে তারা বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি।

বেশ কয়েকজন পেশাজীবী নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার আগে সীমান্ত উপজেলা উখিয়া ও টেকনাফে অস্থিতিশীল পরিবেশ ছিল না। এখন পরিস্থিতি তা অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় চিকিৎসার জন্য নারীদের যেতে হয় কক্সবাজার শহরে। উখিয়া ও টেকনাফ থেকে নারীদের জেলা শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেয়া বেশ কঠিন। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আগে টেকনাফ শহর থেকে কক্সবাজারে পৌঁছতে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগত। এখন সময় লাগছে তার দ্বিগুণ। এ ছাড়া হাসপাতালগুলোতে রোহিঙ্গা রোগীদের ভিড় বেশি। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন চাকরির সুবাধে কক্সবাজার জেলা শহরকে নানাভাবে বিষিয়ে তুলছেন। ফলে তা নারীদের জন্য অত্যন্ত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পণ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতিতে নারীরা ভোগান্তির মুখে পড়েছে।

এসব ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের বিভিন্নভাবে উৎসাহ প্রদান করছে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা। নারীদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিকসহ নানাভাবে সহায়তা করছে এসব সংস্থা। আবার অনেক সংস্থা নারীদের কৃষি সরঞ্জামাদি দিয়ে চাষ ও ক্ষেত খামারে আগ্রহী কনে তুলছে। এদের মধ্যে হোয়াইক্যং কাটাখালী এলাকার মোহাম্মদ আলী স্ত্রী রুবিনা আক্তার (৩০), ছালেহ আহমদের স্ত্রী হাসিনা আক্তার (৩৫), মনিরঘোনা এলাকার আব্দু রশিদের স্ত্রী খাদিজা আক্তার (৩৫) এবং ছালেহা আক্তার (৩৩)-সহ ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের স্থানীয় কৃষি অফিসের সহায়তায় গড়ে তোলা ক্ষেত-খামারে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করছেন এলএফ পাপিয়া সুলতানা। এই নারী কর্মী জানান, আন্তর্জাতিক কৃষি সংস্থা এবং কৃষি অফিসের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের কৃষিকাজের নানা সরঞ্জাম প্রদান করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা রোহিঙ্গাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাদের কারণে স্থানীয় নারীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসানের দাবি জানান তারা।

এদিকে এসএসসি বা এইচএসসি পাস করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চাকরিতে যোগদান করছেন নারীরা। এতে ভবিষ্যতে তাদের মানসম্মত লেখাপড়া নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে সচেতন মহল। তারা মনে করছে, এ কারণে এই অঞ্চল থেকে নারীরা উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করতে পিছিয়ে থাকবে।

কক্সবাজার কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী পাপিয়া সুলতানা পপি। ভালো ফলাফল করে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। তিনি এখন এনজিওতে চাকরি করছেন। তিনি তার মেধা ও মনন এখন চাকরিতে খাটাচ্ছেন। ফলে ব্যাহত হচ্ছে ভালো পড়ালেখা। শুধু পপি নয়, অল্প শিক্ষিত নারীরা লেখাপড়া করা অবস্থায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চাকরির দিকে ঝুঁকছেন। তাদের লেখাপড়ার ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলে জানান থাইংখালী রাহমতের বিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রুবিনা আক্তার। তিনি বলেন, দরিদ্রতা ও অজ্ঞতার কারণে অভিভাকরা তাদের মেয়েদের লেখাপড়া শেষ না করে চাকরিতে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।

হোয়াইক্যং ফাঁড়ির সামনে একটি ছোট্ট চায়ের দোকানি মনোয়ারা আক্তার সুমি (৩০)। আমতলী এলাকার সিরাজুল হকের স্ত্রী তিনি। তিনি জানান, রোহিঙ্গা আসাতেই ব্যবসা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে নানা সমস্যায় তাদের পড়তে হচ্ছে।

উনচিপ্রাং পুটিবনিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প লাগোয়া আব্দুল জব্বারের স্ত্রী সুফিয়া বেগম (৫৫) বলেন, যেখানে আমরা যুগ যুগ ধরে ধান চাষ ও ক্ষেত খামার করতাম। সেসব জায়গা রোহিঙ্গারা বসতি গড়ে তোলায় আমরা চাষবাস থেকে বঞ্চিত। রোহিঙ্গাদের কারণে লাখ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি গুনতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি। সীমান্ত উপজেলায় নারীদের সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন নারীরা।

হোয়াইক্যং বিট কর্মকর্তা সৈয়দ আশিক আহমেদ রোহিঙ্গা আসার কারণে নারীদের নানা সমস্যর কথা জানিয়ে বলেন, দুস্থ পরিবারের সংসারে বিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটছে। তার কারণ হিসেবে তিনি রোহিঙ্গাদের দায়ী করেন।

টেকনাফ উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর কবির জানান, হোস্ট কমিউনিটির নারীদের নানাভাবে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে ভিজিডি কার্ডের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এসব ভিজিডি কার্ডধারী প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল পাচ্ছেন।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিউল হাসান জানান, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে নারীদের সমস্যার কথা মাথায় রেখে নানাভাবে সহায়তা করছে সরকার। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার আগে কেবল ৩ হাজার ৪৬১ জন নারী ভিজিডি কার্ডের চাল পেতেন। এখন এ সংখ্যা ২০ হাজার। পাশাপাশি নারীদের দুই মাস ধরে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, মিয়ানমারে সামরিক অভিযান শুরুর পর ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে অবস্থান নিয়েছে উখিয়া ও টেকনাফের দুটি উপজেলায়। বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা উখিয়া-টেকনাফের প্রায় ৩০টি অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj