গণপরিবহনে সংরক্ষিত আসন : শাস্তিযোগ্য অপরাধ জানা নেই কারও

শনিবার, ১৬ মার্চ ২০১৯

সেবিকা দেবনাথ : গণপরিবহনে ‘নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে’ কোনো পুরুষ বসলে এক মাসের কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রেখে ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এই আইন সংসদে পাস হয়। আইনের ৪৯ নং ধারার (মোটরযান চলাচলের সাধারণ নির্দেশাবলি) দ্বিতীয় অংশের (ঘ) উপধারায় বলা আছে, ‘নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী এবং বয়োজ্যেষ্ঠ যাত্রীর জন্য সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনো যাত্রী বসবেন না বা বসার অনুমতি দেওয়া যাবে না।’ আইনের ৯২ ধারার (মোটরযান চলাচলের সাধারণ নির্দেশাবলি সংক্রান্ত ৪৯-এর বিধান লঙ্ঘনের দণ্ড) ২ নং উপধারায় বলা আছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ৪৯-এর উপধারা (১) এ উল্লেখিত সাধারণ নির্দেশাবলির ২য় অংশের কোনো বিধান লঙ্ঘন করেন তাহা হইলে উক্ত লঙ্ঘন হইবে একটি অপরাধ। এবং এ জন্য তিনি অনধিক এক মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক এক পয়েন্ট কর্তন হবে। আইনে এই সংরক্ষণ শুধু নারীর জন্য নয়, শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্যও।’

আইন অনুযায়ী, বাসের ভেতরে ‘মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত নয়টি আসন’ এই বাক্যটি লেখা ছাড়া বাস্তবে এ পর্যন্ত আইনে উল্লিখিত শাস্তির কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। কারাদণ্ড তো দূরের কথা এ পর্যন্ত কোনো যাত্রীর কাছ থেকে এ ধরনের ‘অপরাধে’ কোনো জরিমানাও আদায় করা হয়নি। তাই আইনের কথা কাগজেই সীমাবদ্ধ। সরকারের পক্ষ থেকে এই আইনের প্রচারে কোনো ধরনের উদ্যোগ এ পর্যন্ত চোখেও পড়েনি। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যকেও সংরক্ষিত আসনে বসে থাকতে দেখা যায়। ভুক্তভোগীরা বলছেন, অনেকে ‘সংরক্ষিত’ শব্দের মানেও বোঝেন না। তারা মনে করেন বাসে নারীদের জন্য ওই নয়টি সিটই বরাদ্দ। বাকিগুলো পুরুষদের। অভিধান অনুযায়ী, সংরক্ষিত শব্দের অর্থ হচ্ছে বিশেষ উদ্দেশ্যে বা প্রকারে সতর্কভাবে রক্ষিত বা পালিত হয়েছে এমন। আর আইনজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের ২৮ (৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নারী বা শিশুদের অনুক‚লে কিংবা নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সমতার ¯্রােতে নিয়ে আসার জন্য নারী, ক্ষুদ্র জাতি, প্রতিবন্ধীদের জন্য অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন নেয়া হয়। এটি কোনোভাবেই সমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না। একে পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন বা ইতিবাচক বৈষম্যও বলা হয়।

ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশের ন্যাশনাল এডভোকেসি অফিসার মারুফ রহমান বলেন, মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি সড়ক পরিবহন আইনে গণপরিবহনে সংরক্ষিত আসনে পুরুষ বসলেই তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে বলে যে বিধান রাখা হয়েছে- এ পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন এক কথায় শূন্য। তবে সংরক্ষিত আসন থাকার মানে এই নয় যে, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়োজ্যেষ্ঠরা অন্য সিটে বসতে পারবেন না। তবে অন্যান্য গণপরিবহনের তুলনায় বিআরটিসি গাড়ির চালক ও হেল্পাররা সংরক্ষিত আসনের বিষয়ে অনেকটা সচেতন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) আব্দুস সাত্তার বলেন, আইনটি নতুন। তাই এ সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাজিস্ট্রেটরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। তারা গাড়ির এবং চালকের কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখেন। এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম থাকলে চালক এবং গাড়ির কোম্পানির বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়। তবে ৪৯নং ধারার (ঘ)-উপধারা ভঙ্গে কোনো চালক কিংবা কোনো যাত্রীর বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা সে বিষয়ে কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই বলে জানান তিনি। ঢাকা মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) কামরুজ্জামান বলেন, ট্রাফিকের এমন অনেক আইন আছে যেখানে বিধি অনুযায়ী আমাদের ক্ষমতা দেয়া হয় না। সেগুলো মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়।

এই আইনেও যদি বিধি অনুযায়ী আমাদের ক্ষমতা দেয়া হয় তবে আমরা সে ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেব।

বিধি না থাকায় এ আইন প্রয়োগে কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা- জানতে চাইলে সেন্টার ফর ল এন্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের সেক্রেটারি আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, আইন অনুযায়ী তা বাস্তবায়নে পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাই যথেষ্ট। সার্জেন্টরাই তা কার্যকর করতে পারেন। এর জন্য বিধির প্রয়োজন নেই।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj