ডাকসু নিয়ে উত্তেজনার রাজনীতি কতটুকু জমবে?

শনিবার, ১৬ মার্চ ২০১৯


গত ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনের ফল খুব একটা অপ্রত্যাশিত হয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। ক্যাম্পাসের খোঁজখবর যারা রাখেন তারা এমন আভাস আগেই দিয়েছিলেন যে ডাকসুতে ছাত্রলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। কারণ যেভাবেই হোক না কেন, ক্যাম্পাস ছিল ছাত্রলীগের দখলে। তবে ডাকসুর ভিপি পদে কোটা আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নূরের জয়লাভের সম্ভাবনার কথা ক্যাম্পাসে আলোচিত ছিল। ক্যাম্পাসে আরো একটি জনপ্রিয় নাম হলো ছাত্রলীগের সাদ্দাম হোসেন। এজিএস পদে তার জয় নিয়েও কারো সংশয় ছিল না। তিনি ঠিকই সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে এজিএস নির্বাচিত হয়েছেন। এমন প্রচার আছে যে, সাদ্দামকে যদি ডাকসুর ভিপি পদে মনোননয়ন দেয়া হতো তাহলে নুরুল হক নূর হয়তো ভিপি পদে নির্বাচন না করে জিএস পদে দাঁড়াতেন কিংবা নির্বাচন থেকে দূরে থাকতেন। অর্থাৎ সাদ্দামের জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করার অবস্থা নূরের নেই। ডাকসুর জিএস পদে ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে কোটা আন্দোলনের রাশেদ খানের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতো, কিন্তু একই পদে আরো দুজন জনপ্রিয় প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগাভাগি হয়েছে। সহজ জয় পেয়েছেন ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানী। স্বতন্ত্র দুজন জিএস প্রার্থী- উম্মে হাবিবা বেনজির ও আসিফুর রহমান কোটার রাশেদ খানের কপাল পুড়িয়েছেন। এ দুজন যে ভোট পেয়েছেন সেগুলো রাশেদ পেলে তার জয়ও ঠেকানো যেত কিনা সন্দেহ।

এবার ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তেমন আলোচনা ছিল না। ছাত্রদল ডাকসুতে জিতবে এমন আলোচনা গণমাধ্যমে কিছু থাকলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা কখনো ছাত্রদলকে তাদের পাশে পাননি। প্রগতিশীল ছাত্রজোটের (ছাত্র ইউনিয়ন) লিটন নন্দী ভিপি পদে যতটা আলোচনায় ছিলেন ছাত্রদলের মোস্তাফিজুর রহমান তাও ছিলেন না। লিটন ক্যাম্পাসে সক্রিয় এবং পরিচিত নাম। কিন্তু তাই বলে কেউ এমনটা মনে করেননি যে, লিটন নন্দী ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হবেন! ভিপি বাদে ডাকসুর ২৫ পদের ২৩টি পেয়েছে ছাত্রলীগ। ভিপিসহ মাত্র দুটি পেয়েছে কোটা আন্দোলন।

নির্বাচনে অনিয়ম-কারচুপির অভিযোগ এনে ভোট শেষ হওয়ার আগেই ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য পাঁচ প্রতিদ্ব›দ্বী প্যানেলের প্রার্থীরা ভোট বর্জন করেন। বর্জনকারীদের মধ্যে ভিপি হিসেবে নির্বাচিত নূরও ছিলেন। তিনি ভোট বর্জন করলেন আর তিনিই কিনা নির্বাচিত হলেন! বলা হচ্ছে, এটাও একটা ষড়যন্ত্র। ফলাফল জায়েজ করার জন্য ছাত্রলীগ নাকি নূরকে জিতিয়ে দিয়েছে। এমন হাস্যকর যুক্তি যারা দেন তারা আসলে কোনো কিছুকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারেন না। একদিকে বলছেন, ছাত্রলীগ ডাকসুতে ভোট ডাকাতি করেছে। আবার বলছেন, নূরের জেতার পেছনেও ষড়যন্ত্র আছে! ডাকাত কি কখনো এভাবে বিবেচনাবোধের পরিচয় দিয়ে ডাকাতি করে? মূল পদ ছেড়ে দিয়ে ছাত্রলীগ যদি ‘উদারতা’ দেখিয়ে থাকা তাহলে তো তাদের ‘সুবুদ্ধি’র প্রশংসাই করা উচিত।

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের সূচনা হয় ভোটগ্রহণ পর্ব শুরু হওয়ার আগেই কুয়েত মৈত্রী হলে বস্তাভর্তি ব্যালট পাওয়ার পর। এটা একটা রহস্যময় ঘটনাই বটে। ব্যালট বাক্স ভরে না রেখে বস্তা ভরে এমন জায়গায় রাখা হলো যেটা অন্যরা দেখে ফেলল এবং ধরে ফেলে হুলস্থুল কাণ্ড বাধিয়ে ফেলল? এই সতর্ক চোখগুলো বস্তা ভরা ও রাখার সময় কোথায় ছিল? যে বা যারা এই ‘ব্যালটকাণ্ড’ ঘটিয়েছেন তারা কি ছাত্রলীগের কেউ? হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ সবকিছু তো তাদেরই নিয়ন্ত্রণে! ছাত্রলীগের বা তাদের হিতাকাক্সক্ষীদের পক্ষেই এটা করা সম্ভব। বিষয়টা চাউর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। হলের প্রভোস্টকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন প্রভোস্ট নিয়োগ দেয়া হয়। এ থেকেও মনে হয় যে, কর্তৃপক্ষ একটি একটি ভালো নির্বাচনই করতে চেয়েছে। কিন্তু সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও ব্যক্তিরা এটা মানবেন কেন? তারা ওঁৎ পেতে আছেন সরকারকে ঘায়েল করার জন্য। কুয়েত মৈত্রী হলের কেলেঙ্কারি অন্য হলগুলোতেও হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। অথচ অন্য কোনো হলে ‘ব্যালটবস্তা’ পাওয়া গেল না কেন? যা হোক, দুর্জনের যেমন ছলের অভাব হয় না, তেমনি পরাজয় মানতে না চাওয়া পক্ষেরও কুযুক্তির অভাব হবে না।

নির্বাচনকে বিতর্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ, কলঙ্কিত যাই বলা হোক না কেন ফল যা হয়েছে তা তাকে বানানো বা সাজানো বলার পক্ষে তথ্যপ্রমাণ হাজির করা যাবে বলে মনে হয় না। বছরের পর বছর ক্যাম্পাস আছে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। ছাত্রলীগের প্রধান প্রতিপক্ষ ছাত্রদল বহু দিন ধরে ক্যাম্পাস ছাড়া। তাদের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল। বাম ছাত্র সংগঠনগুলো সক্রিয় থাকলেও তাদের প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমর্থন নেই। তাদের নেতা যত কর্মী তত নেই। সমর্থক আরো কম।

ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করলেও সেখানে এরই মধ্যে ভেতরে ভেতরে যে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে সেটা না বুঝতে পেরেছে ছাত্রলীগ, না অন্য সংগঠনগুলো। কোটা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে শিক্ষার্থীরা একটি আলাদা শক্তি হয়ে উঠেছে, ওই আন্দোলনের নেতারা যে ট্রাডিশনাল অন্য সব ছাত্রনেতাদের বিকল্প হয়ে উঠেছেন সেটা অনেকেই বুঝতে পারেননি। এই বুঝতে না পারার জন্যই ডাকসুর ফলাফলে অনেকেই হোঁচট খেয়েছেন। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, যত সুষ্ঠু নির্বাচনই হোক না কেন প্রতিদ্ব›দ্বী ২১ জনের কি ভিপি নির্বাচিত হওয়া সম্ভব? তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, বাইরে যাই হোক, ভেতরে ভেতরে তাদের আশা ছিল ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য যে কারো বিজয় তারা মেনে নেবে। ফল ঘোষণার পর ছাত্রদল প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য যে কারো বিজয় মেনে নিতে তারা আপত্তি করবে না। ছাত্রলীগ বনাম অন্য সবাই নির্বাচন যদি সেভাবে হতো তাহলে ভোটের ফল ছাত্রলীগের অনুক‚লে না যাওয়ারই সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সবাই পদ চেয়েছে, সবাই নিজেকে সবচেয়ে জনপ্রিয় ভেবেছে বলে সবাই মিলে বৃহত্তর ঐক্য গঠন সম্ভব হয়নি। ছাত্রলীগ জয় পেয়েছে তাদের অটুট সাংগঠনিক শক্তির কারণে, ভোটে কারচুপি, অনিয়ম জয়-পরাজয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়নি।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মাঠ গরম করার একটা চেষ্টা বিভিন্ন মহলেরই আছে বলে মনে হচ্ছে। ডাকসু নির্বাচনকে নিয়ে শুরু থেকেই এক ধরনের উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা চলছে বলে আমার মনে হয়। নির্বাচনের আগে বলা হয়েছে সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। সব সংগঠন বা প্রার্থী প্রচারের সমান সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কোনো মারামারি-হানাহানির খবর পাওয়া যানি। কারো রক্ত ঝরেনি। কেউ আহত হননি। ডাকসু নির্বাচন অতীতে এতটা শান্তিপূর্ণ হয়েছে কিনা সন্দেহ।

নির্বাচনের দিন থেকেই কিছুটা ব্যতিক্রমী অবস্থার তৈরি হয়। ডাকসু নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হলে তো সরকারকে চাপে ফেলার বৃহত্তর পরিকল্পনা কার্যকর করা যায় না। তাই শুরু হয় নির্বাচনকে কলঙ্কিত করার পরিকল্পিত প্রচারণা। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুবর্ণের শিক্ষক রাজনীতি এমনকি সরকার সমর্থক শিক্ষকদের গ্রুপিংও হয়তো আগুনে ঘি ঢেলে দেয়ার কাজটি নানা উপায়ে করেছে। তবে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করে খুব সুফল পাওয়া যাবে না বলেই মনে হচ্ছে। ১১ মার্চের নির্বাচন বাতিল করে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে দাবি তোলা হয়েছে তা আদায় করা সম্ভব হবে না। কারণ এই দাবিতে সাধারণ ছাত্ররা বড় কোনো আন্দোলন চাইলে ১২ মার্চই ক্যাম্পাস উত্তাল হয়ে উঠত। এখন ফুঁ দিয়ে আন্দোলনের ভেজা পাঠকাঠিতে আগুন ধরানোর চেষ্টা সফল হবে না। চেষ্টা করলে হয়তো ধোঁয়া বের হতে পারে, কিন্তু দাউদাউ করে আগুন জ্বলবে না। ক্যাম্পাস অশান্ত হোক, শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হোক- সেটা কোনো শিক্ষার্থী চান না। যারা নেতৃত্ব দিতে চান তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করুন। যেসব ছাত্র সংগঠনের প্রতি ছাত্রদের সমর্থন নেই সেসব সংগঠনের উস্কানির ফাঁদে ক্যাম্পাসের নতুন জেগে ওঠা ‘স্বতন্ত্র’ শক্তির পা দেয়া কোনোভাবেই উচিত হবে না। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সবাই দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে। তারুণ্যের আবেগকে যুক্তিবোধের সীমা অতিক্রম করতে প্ররোচিত করাও কোনো পক্ষের উচিত হবে না।

বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj