দুদকের প্রতিবেদন এবং সিলেটের বিমানবন্দর

শনিবার, ১৬ মার্চ ২০১৯


বিমানের বিভিন্ন অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা কোনো নতুন বিষয় নয়। মার্চ মাসের প্রথম দিকেই দুদক বিমানের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ অনুসন্ধান পর্যবেক্ষণ শেষে যে প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছে, এতে সরকারে পক্ষ থেকেই এই দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। যে প্রতিবেদনটি গত ৩ মার্চ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলীর কাছে পৌঁছে দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ৮ ধরনের দুর্নীতির মধ্যে আছে : ১. উড়োজাহাজ কেনা ও লিজ নেয়া নিয়ে দুর্নীতি ২. রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিং নিয়ে দুর্নীতি ৩. গ্রাউন্ড সার্ভিস নিয়ে দুর্নীতি ৪. কার্গো এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট নিয়ে দুর্নীতি ৫. প্যাসেঞ্জার নিয়ে দুর্নীতি ৬. অতিরিক্ত ব্যাগেজের চার্জ আত্মসাৎ ৭. টিকেট বিক্রি নিয়ে দুর্নীতি এবং ৮. বিমানের ফুড ক্যাটারিং নিয়ে দুর্নীতি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘উড়োজাহাজের খুচরা যন্ত্রাংশ ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্টস কেনা নিয়ে বিপুল অঙ্কের অবৈধ লেনদেন হয়। উড়োজাহাজ কেনা ও লিজ নিয়েও চলে দুর্নীতি। ঠিকানাবিহীন কম্পিউটার-নেট সর্বস্ব মধ্যস্থতাকারী কিছু প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে জড়িত। বিমানের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কিছু বোর্ড পরিচালক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতির জাল বিস্তার করেছে। আর এতে হাজার কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে। প্রতি বছর অভ্যন্তরীণ ও সরকারি নিরীক্ষা হিসেবে গোঁজামিল পেলেও দুর্নীতিবাজদের কিছুই হচ্ছে না।’

বিমানের দুর্নীতির ব্যাপকতা এ লেখার উপজীব্য নয়। বিমানের যাত্রী সেবা নিয়ে আছে যাত্রীদের বিস্তর অভিযোগ। আন্তর্জাতিক রুটে একদিনই আমি বিমানের যাত্রী হয়েছিলাম এবং সেদিনের স্মৃতি আমার মতো অনেকেরই গেঁথে থাকবে আজীবন। ২০১০ সালের এপ্রিলে পরিবেশগত কারণে লন্ডনে ল্যান্ড না করতে পেরে লন্ডনের আকাশ থেকেই ব্রাসেলস এয়ারপোর্টে অবতরণ করেছিল বিমান। ওইদিন অসহায় শিশু-নারীসহ শত শত মানুষকে শরণার্থী করে বিমানের পাইলট এবং কর্মকর্তারা কীভাবে পালিয়ে গিয়েছিল, তার দুঃসহ চিত্র পরের দিন উঠে এসেছিল বেলজিয়ামের টিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

এ ঘটনার পরবর্তী চিত্রটা তুলে ধরতেই এখানে দুদকের প্রতিবেদনের একটা দিকের সামান্য চিত্র উল্লেখ করতে চাই। প্যাসেঞ্জার খাতের দুর্নীতির বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ট্রানজিট প্যাসেঞ্জার ও লে-ওভার প্যাসেঞ্জারের হিসেবে এদিক-সেদিক করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। প্রতিদিন ট্রানজিট প্যাসেঞ্জারের সংখ্যা যতজন হয়, তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে খাবারের বিল করে অতিরিক্ত টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। লে-ওভার প্যাসেঞ্জারদের জন্য নিয়মানুযায়ী হোটেলের প্রতি রুমে একজন রাখার কথা। কিন্তু বাস্তবে প্রতি রুমে ৪/৫ জন রাখা হয়। আর বিল তৈরি করা হয় জনপ্রতি। অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্যতা অনুযায়ী প্যাসেঞ্জারদের খাবার ও হোটেল দেয়া হয় না, কিন্তু যথারীতি বিল করে টাকা তুলে আত্মসাৎ করা হয়।’

শত শত যাত্রী সেদিন ব্রাসেলস না হয়ে যদি সিলেট কিংবা চট্টগ্রাম কিংবা অন্যান্য শহরের যাত্রী ঢাকায় আটকা পড়তেন, তাহলে ঠিকই হোটেল পাওয়া যেত। প্রতি রুমে ৪/৫ জন করে হলেও মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলতো, ডাল ভাতেরও স্বাদ উঠত হয়তো জিহ্বায়, কারণ ওই চক্র ঢাকায় ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। হোটেল মালিক পক্ষের সঙ্গে যোগসাজশে ওইদিন কোটি কোটি টাকা বানিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু ব্রাসেলসে তাই এর কোনোটাই করা হয়নি। সে জন্য বেলজিয়াম সরকারের স্থানীয় বিভাগ এবং ‘রেডক্রস’ এসে শিশুদের সুরক্ষা দিয়েছিল, অসুস্থ মানুষের পাশে ডাক্তার এসেছিল। এয়ারপোর্টের উপরের তলায় একটা জায়গা খালি করে একরাত সাময়িক বিছানার ব্যবস্থা করেছিল কর্তৃপক্ষ। যদিও পরের দিনি টিভি-নিউজ পেপার তথা গণমাধ্যমে দেখে দূতাবাসের কর্মকর্তারা এসে বাংলাদেশের মান রক্ষা করেছিল। মাত্র ক’দিন আগে সিলেটের লন্ডনগামী একজন যাত্রীকে বিমানে বেঁধে কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, তার ফুটেজ দেখেছে বিশ্বের অগণিত মানুষ। মাতাল যাত্রীকে যদি সামলানো না যায়, তাহলে এলকোহল সার্ভ করার কি কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে। মাতাল যাত্রীদের সামলাতে ভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে পৃথিবীর সব উড়োজাহাজ কর্তৃপক্ষই।

অসংখ্য-অগণন অভিযোগের মাঝে ব্রাসেলসের ঘটনাটা আমার ব্যক্তিগত একটা অনুভূতি মাত্র। সেই অনুভূতিরই আরেকটা দিক আমি সিলেটের রুট ব্যবহারকারী হিসেবে উল্লেখ করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছি এই নিবন্ধে।

উন্নয়ন কিংবা যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে ঢাকার হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরের মতো সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরেরও যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে না, তা আমরা বলতে পারি না। এখানেও দালান প্রশস্ত হয়েছে। ওয়েটিং এলাকায় যাত্রীদের জন্য স্থান সংকুলানের জায়গা আছে। আগের তুলনায় ভিড় কমেছে। শৌচাগার উন্নয়ন হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা চোখে পড়ার মতো। হালকা খাবারের জন্য ¯œ্যাকসের দোকানগুলো মনে হয়েছে উন্নতমানের। প্রার্থনার জায়গাটা আছে। কিন্তু যাত্রীদের সঙ্গে ইমিগ্রেশনের অভ্যন্তরের অফিসার কিংবা কর্মকর্তাদের আচরণ প্রশ্নবোধক। বিশেষ করে একটু দুর্বল মানুষ পেলে কীভাবে নিরাপত্তা কর্মী কিংবা এমনকি টেবিলে বসে যেসব কর্মকর্তা প্রবাসীদের ডাটা এন্ট্রিতে ব্যস্ত থাকেন, তাদের কেন জানি চোখ থাকে ওই দুর্বল মানুষগুলো প্রতি। ‘কিউ’ ভেঙে পেছনের যাত্রী আগে নিয়ে তাদের ইমিগ্রেশন শেষ করে দেয়া হয় নিমিষেই। হালে চট্টগ্রামে বিমান ছিতাইয়ের চেষ্টা কিংবা ইলিয়াস কাঞ্চনের পিস্তল উপাখ্যান প্রভৃতিতে সারাদেশের বিমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আবারো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অথচ দেশ থেকে বেরিয়ে আসার সময় সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি রীতিমতো ঘামিয়ে ফেলে, এমনকি নির্ধারিত ওজন বহন করার সীমায় থেকেও আমি কিছু বই নিয়ে আসতেও তিন/চার বছর আগে ভোগান্তিতে পড়েছি ওসমানী বিমানবন্দরে।

এখন যাচ্ছি সিলেট বিমানবন্দরের ভিন্ন একটা প্রসঙ্গে। সিলেট বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করে। এই মানুষদের সংখ্যাগরিষ্ঠই বিদেশ যাত্রী। এই যাত্রীদের আগমন কিংবা নির্গমনের সময় এদের স্বজনরা আসে। কিন্তু ভিড় এড়ানোর ছুতোয় এদের বিমানবন্দরে পৌঁছার আগে একটা জায়গায় আটকিয়ে দিয়ে মাত্র একজন কিংবা দুজনকে যেতে দেয়া হয় তাদের স্বজনদের অভ্যর্থনা দিতে কিংবা বিদায় জানাতে। অথচ দেখা যায় কোনো কোনো যাত্রীর অনেক স্বজনই বিমানবন্দরের কাছাকাছি পৌঁছায় নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে। সিলেট বিমানবন্দর কাগজে-কলমে একটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, অথচ সেখানে স্বজনদের জন্য আপেক্ষমাণ মানুষদের আপেক্ষা করার জন্য নেই কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থা। রোদে-মেঘে এদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয় খোলা আকাশের নিচে। ঘণ্টা পর ঘণ্টা এদের চড়চড়ে রোদে ঘামতে হয় কিংবা বৃষ্টিতে ভিজতে হয়, অপেক্ষার প্রহর গুনে গুনে।

সিলেট বিমানবন্দরে ‘বিমান’ বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বাইরে যারা অন্য কোনো এয়ারলাইন্স ব্যবহার করেন। বিশেষত আরব আমিরাতের যাত্রীদের একটা বাহন ছিল, ‘ফ্লাই দুবাই’। এই এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ ব্যবহার করে যেমন আগে আরব আমিরাতের যাত্রীরা তাদের ভ্রমণের সেবা পেত, কিংবা যুক্তরাজ্যের কিছু কিছু শহর যেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চালু নেই কিংবা অন্যান্য দেশ থেকে যারা ‘আমিরাত’ কিংবা ‘ইত্তেহাদ’ প্রভৃতি এয়ারলাইন্স ব্যবহার করতেন, তারা কানেকটিং হিসেবে ‘ফ্লাই দুবাই’ ব্যবহার করতেন। এখন সেটিও নেই। আর সে জন্য কারণে-অকারণে ঢাকায় একরাত অবস্থান করতে হয় অনেক যাত্রীর। যে কথাটি দুদকও তাদের প্রতিবেদনে দুর্নীতির একটা প্রধান খাত হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিপুলসংখ্যক প্রবাসী অধ্যুষিত ওসমানী বিমানবন্দরের ফ্লাইট অপারেশনকে তাই ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।

বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ মানুষদের শরণার্থী হিসেবে বিবেচনা না করে প্রয়োজনে কাঁচঘেরা একটা ছাউনি বানানো যেতে পারে, যেখানে এমনকি ব্যবহারকারীদের জন্য হয়তো ৫-১০ টাকা নির্ধারণও করা যেতে পারে। এটা করতে পারলে স্বজনদের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষদের ভিড়ও সামলানো যাবে, মানুষ নিরাপদে ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। বিমানের বহু উচ্চারিত দুর্নীতি আর আর সাগর চুরির মাঝেও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা উল্লেখ করেছি এই নিবন্ধের শুরুতেই। প্রবাসীরা চাইছেন, তাদের অর্থ দিয়েই যাত্রী সেবাটা নিশ্চিত করা হোক, নিরাপত্তা দেয়া হোক সাধারণ মানুষদের।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj