মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব : ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর’ হোক চট্টগ্রাম পুরনো সার্কিট হাউস

মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

চট্টগ্রাম অফিস : ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে থাকা চট্টগ্রামের পুরনো সার্কিট হাউসকে ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব উঠেছে মন্ত্রিসভার বৈঠকে। গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে উত্থাপিত এ প্রস্তাবে নীতিগতভাবে সমর্থন দিয়েছেন মন্ত্রিসভার সব সদস্য। প্রস্তাবটি তোলেন চট্টগ্রামের সন্তান সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে চট্টগ্রাম-৯ আসনের সাংসদ এবং বর্তমান সরকারের শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে নওফেল এ প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এতে সমর্থন জানান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীর বীরপ্রতীক, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়কমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমেদ।

১৯১৩ সালে চট্টগ্রাম নগরীর কাজির দেউড়ি এলাকায় তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা দৃষ্টিনন্দন ভবনটি নির্মাণ করে, যা পরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস হিসেবে রাষ্ট্রীয় অতিথিদের জন্য ব্যবহৃত হতো। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সফরে এসে সার্কিট হাউসে অবস্থানকালীন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গভীর রাতে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। পরে ১৯৯১ সালে জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সার্কিট হাউসটিকে তার স্বামী জিয়াউর রহমানের নামে ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে উদ্বোধন করেন। বর্তমানে সেখানে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের কিছু নমুনা, ব্যক্তিগত সামগ্রী এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করার ট্রান্সমিটারটি সংরক্ষিত আছে। এই ট্রান্সমিটার থেকে ১৯৭১ সালে জিয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন দেশবাসীর উদ্দেশে।

বৈঠকে শিক্ষা উপমন্ত্রী নওফেল ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই পুরনো সার্কিট হাউসের ভূমিকা এবং আরো বেশ কিছু তথ্য উপস্থাপন করে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরটিকে ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর’-এ রূপান্তরিত করার জন্য প্রস্তাব করেন। তিনি জানান, একাত্তরে নিরীহ বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাদের পাকিস্তানি সেনারা ধরে নিয়ে

ওই ভবনে রেখে নির্যাতন করেছিল। সেখানে একটি ইলেকট্রিক চেয়ার ছিল। সেখানে বসিয়ে অকথ্য নির্যাতন করা হতো। অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে সেখানে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আর ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাটি জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে যে ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রচার হয়েছিল, সেটি এনে সেখানে রাখা হয়েছে। অথচ জিয়াউর রহমানের আগে একই ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে এই ঘোষণা দিয়েছেন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান। তাহলে শুধু জিয়াউর রহমানের নামে কেন জাদুঘর হবে?

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে সার্কিট হাউসটিকে ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে রূপান্তরের পাশাাপশি নতুন একটি সার্কিট হাউস নির্মাণ করে। আগে পুরনো সার্কিট হাউসের সামনের মাঠটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু বিএনপি সরকার সেটাকে কথিত শিশুপার্ক হিসেবে ঘোষণা দেয়। চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম ১৯৮৯ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা শুরু হয় তখন উন্মুক্ত এ মাঠটিকে ব্যবহার করা হতো। পরবর্তীতে সেখানকার উন্মুক্ত মঞ্চে চলত মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস যাতে চর্চা না করা হয়, নতুন প্রজন্ম যাতে জানতে না পারে সেই ত্যাগ আর গৌরবের ইতিহাস সে জন্য সুকৌশলে বিজয়মেলার এ জায়গাটিকে শিশুপার্কে রূপ দেয়ার চেষ্টা চালানো হয়।

ব্যারিস্টার নওফেল আরো বলেন, ‘জিয়াউর রহমান একজন অবৈধ সামরিক শাসক। তার নামে কেন একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনা এভাবে ব্যবহার করা হবে? একটি সার্বজনীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তর করলে এটি দেশের সম্পদে পরিণত হবে।’ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে একটি প্রকল্প গ্রহণের অনুরোধ করেন মন্ত্রিসভার তরুণ এ সদস্য। নওফেলের বক্তব্যের পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রথম তাকে সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি এই বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকেও উদ্যোগ নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন বলে সূত্র জানিয়েছে। এর পরই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রীকে সমর্থন জানিয়ে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীর বীরপ্রতীক বলেন, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরকে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের প্রস্তাবে পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি।’

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj