প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি

মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল গ্রামকে শহর করা। অর্থাৎ শহরের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দেয়া। গত দশ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার তা করতে পারেনি। কিন্তু তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সম্ভবত এই উপলব্ধি এসেছে যে, গ্রাম উন্নয়ন ব্যতীত প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রে পরিণত করার হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে গ্রামের উন্নতি ব্যতীত অন্য কোনো উপায় নেই। রাজধানীমুখী মানুষের ঢলকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতেও এর কোনো বিকল্প নেই। অন্যান্য জেলা শহরে, উপজেলা সদরে এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে অধিক মানুষকে ধরে রাখার একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার চিন্তা আজকের বাংলাদেশের একটি সময়োপযোগী বাস্তবতা। আর এই পরিকল্পনার সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতির নাম স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা।

জন্মলগ্ন থেকেই আমরা দেখে এসেছি ইউনিয়ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। ইউনিয়নের উন্নয়নের প্রধান এবং একমাত্র প্রতিনিধি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন মেম্বাররা। একসময় এই ইউনিয়ন পরিষদ ব্যবস্থা খুবই শক্তিশালী ছিল। এরপর এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উপজেলা পর্যায়ের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, যেখানে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মতো উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস-চেয়ারম্যানরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি। সংসদ সদস্য এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের ক্ষমতার এখতিয়ার নিয়ে দ্ব›েদ্বর এক পর্যায়ে এবং রাজনৈতিক ভুল দৃষ্টিভঙ্গির সুযোগে উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে। কার্যত এই ব্যবস্থা কাগজে-কলমে বিদ্যমান থাকলেও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে উপজেলা পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যকলাপ নেই বললেই চলে। এমন অবস্থার হাত ধরে ইউনিয়ন পরিষদের অবস্থাও দুর্বল। জেলা পরিষদের নাম এবং অফিসের অস্তিত্ব থাকলেও কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। বিষয়টি জাতীয়ভাবেই উদ্বেগের বিষয়। এমন অবস্থা চলতে থাকলে একসময় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং জেলা পরিষদের সামগ্রিক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়ন ব্যতীত বাংলাদেশের গ্রামবাংলার প্রকৃত উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। এমন সত্যতা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সবার বোধগম্য হওয়া উচিত। শহরভিত্তিক রাজনীতি এবং উন্নয়ন শুধু শহরের প্রতি অতিরিক্ত চাপের বোঝাই আনবে না, এতে দেশের মূল অংশ গ্রামবাংলা শহরভিত্তিক এলাকা থেকে ক্রমশই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। অধিক সুযোগের অপেক্ষায় এখন শুধু মানুষ শহরমুখী হবে এবং শহরে মানবেতর জীবনধারণ করার পথই সুগম করবে। এমন একটি সংকট নিয়ে আমাদের আরো বেশি ভাবতে হবে এবং তৎপর হতে হবে। সরকারের ভাবগতি দেখে যেটুকু অনুমান করা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, সরকার তাদের এবারের টার্মের মধ্যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নতি করতে চায়। ইউনিয়ন এবং উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের পর অবস্থার একটু উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; কিন্তু মূল জায়গায় তেমন কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের হাতে ক্ষমতা রাখার পক্ষেই বর্তমান সরকার। এমন একটি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যদি একই চিন্তাধারায় পৌরসভা প্রশাসনকে দেখতে অভ্যস্ত হয়, তবে সে দিন দূরে নয় যে দিন পৌরসভাগুলোর অবস্থাও উপজেলা পরিষদের মতো হবে। এমন একটি সংকটময় অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত। বর্তমান সময়ে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ একটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। এই নির্বাচনগুলো রাজনৈতিকভাবেই হোক আর অরাজনৈতিকভাবেই হোক তাতে তেমন কোনো পার্থক্য আসবে না। যেহেতু স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয় সুতরাং প্রার্থী রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক তাতে কোনো পার্থক্য হওয়ার সুযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে সমস্যা অন্য জায়গায়। পৌরসভা এবং উপজেলা পরিষদের ক্ষমতার প্রশ্নে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে একটি দ্ব›দ্ব বিদ্যমান। সামাজিক উন্নয়নে অংশীদারিত্ব যেহেতু ক্ষমতা প্রয়োগে এবং জনগণের সামনে ভোট লাভের ক্ষেত্রে একটি লাভজনক ব্যবস্থা, তাই এ ক্ষেত্রে কে কতটা ক্ষমতাবান তা নিয়েই এ দ্ব›দ্ব। ক্ষমতাটি স্থানীয় সংসদ সদস্যের হাতে রাখতে গিয়েই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার অবস্থায় দাঁড় হচ্ছে। সংসদ আইন প্রণয়নের বাইরে স্থানীয় উন্নয়নেও প্রত্যক্ষভাবে ক্ষমতাশালী থাকার ইচ্ছা পোষণ করার জন্য সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার পক্ষে যেতে পারছে না।

বিষয়টি তৃতীয় চোখে দেখার চেষ্টা করেছি। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা বাংলাদেশের গ্রামবাংলার উন্নয়নের স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি একটি ব্যবস্থা। যারা এ ব্যবস্থা ধ্বংস করার কথা চিন্তা করেন, তাদের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। অপরদিকে সংসদ সদস্য বনাম স্থানীয় সরকার দ্ব›দ্বও গ্রহণ করতে পারছি না। বর্তমান সরকার সংসদে অত্যন্ত ভালো অবস্থায় আছে এবং যে কোনো আইন পাস করা বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছাটাই এখানে বিষয়। সংসদে তা পাস করিয়ে নেয়ার ব্যাপারে তাদের কোনো অসুবিধা নেই। আর সে জন্যই এ সরকারের কাছে আমার তৃতীয় চোখ দিয়ে দেখা এ বিষয়টি উল্লেখ করতে চাচ্ছি। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং শহরে পৌরসভা ব্যবস্থা অটুট এবং শক্তিশালী রেখে সরকার এখানে আরো একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পরিষদের কথা ভাবতে পারে। আমাদের দেশ আয়তনে ছোট হলেও জনসংখ্যার দিক দিয়ে ছোট নয়। এ বিশাল জনসংখ্যাকে ঠিকমতো পরিচালনা এবং তাদের যথাযথ সার্ভিস প্রদানের স্বার্থে একটি শক্তিশালী প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে বাংলাদেশে। বর্তমানে চিহ্নিত বিভাগগুলো একেকটি প্রদেশ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। প্রত্যেক প্রদেশে একজন মুখ্যমন্ত্রী থাকবে, যার পরিচালনায় একটি প্রাদেশিক মন্ত্রিসভাও থাকবে। প্রাদেশিক সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে তখন চলে যাবে পৌরসভা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ। আর তখন কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক এই দুই কক্ষবিশিষ্ট সরকার ব্যবস্থা দেশে চলতে পারবে। কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সংসদ সদস্য উভয়ই নির্বাচিত হবে সরকারের প্রত্যক্ষ ভোটে। এমন ব্যবস্থা চালু হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হবে, রাজধানী ঢাকার ওপর মানুষের চাপ হ্রাস পাবে এবং সমাজে দুর্নীতি হ্রাসের সুযোগ পাবে। স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন তখন প্রাদেশিক সরকারের এখতিয়ারে গিয়ে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই কার্যকারিতা লাভ করবে। কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্যরা এবং কেন্দ্রীয় সরকার তখন দেশের সঠিক নীতি-নির্ধারকের ভূমিকা পালন করার সুযোগ পাবে। এই ব্যবস্থার ফলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং অধিক রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দেশসেবার সুযোগ দেয়া সম্ভব হবে। একহাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ফলে দুর্নীতির রাস্তা প্রশস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও হ্রাস পাবে এমন ব্যবস্থার ফলে।

বর্তমান সরকার ব্যবস্থায় সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সচিবালয়ের সচিব এবং অন্য কর্মকর্তাদের মন্ত্রীর খবরদারিতে থাকতে হয়। কিন্তু বিভাগীয় কমিশনার এবং ডেপুটি কমিশনাররা মূলত কোনো রাজনৈতিক এবং জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হয় না। মন্ত্রণালয়ের বাইরে তারা মূলত কারো কাছে জবাবদিহি করে না। কিন্তু প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা চালু হলে প্রাদেশিক সরকার প্রধানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চলে আসবে বিভাগীয় (প্রাদেশিক) কমিশনার। আর ডেপুটি কমিশনাররাও চলে আসবে প্রাদেশিক সংসদ সদস্যদের আওতাধীন। ফলে সব ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার একটি সুস্থ বাতাস বইতে পারার সুযোগ পাবে।

বিষয়টি লেখা যত সহজ হলো, আমি জানি কাজটি তত সহজ নয়। সরকারি ব্যবস্থায় এটি হবে একটি আমূল পরিবর্তন। এটা তখনই সম্ভব হবে যখন বর্তমান সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী এমনটা চিন্তা করবেন। বিরোধী দলেরও এতে অমত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেননা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের এই পদ্ধতিতে সব রাজনৈতিক দলই উপকৃত হবে। এর ফলে ঢাকা শহরের চাপ কমবে। সরাদেশ থেকে যেভাবে দলে দলে মানুষ রাজধানীতে আসা শুরু করেছে, একসময় এই ঢাকা শহর সেই ভার আর ধরে রাখতে পারবে না। মানুষকে তাই প্রাদেশিক সরকারের রাজধানীমুখী করতে হবে। ক্ষমতা এবং কাজ যখন প্রাদেশিক সরকারের হাতে ভাগ হয়ে যাবে, তখন অধিক লোক কাজ পাওয়ার আশায় প্রাদেশিক সরকারের রাজধানীর দিকে ছুটবে। আধুনিক বিশ্বে জনংখ্যার হিসেবে আমাদের মতো অন্য কোনো দেশ নেই, যেখানে শুধু এককক্ষ অর্থাৎ একক কেন্দ্রীয় সরকার অবস্থিত আছে। ভারতে এই ব্যবস্থা আছে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকার হিসেবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও আছে ভিন্ন ভিন্ন নামে। এমনকি চার কোটি মানুষের দেশ কানাডাতেও দুইকক্ষ বিশিষ্ট সরকার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সরকার বিষয়টি আমলে নিয়ে গুরুত্বারোপ করলে বিষয়টি আলোচনার মধ্যে উঠে আসতে পারে। উন্নয়নের ধারা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য, কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ কমানোর জন্য, দুর্নীতি হ্রাস করার জন্য, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের জন্য, সরকার ব্যবস্থায় অধিক রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সুযোগ করে দেয়ার জন্য এবং সর্বোপরি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য বর্তমান সরকার এ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে। এমন একটি উদ্যোগ তাদের জন্য রাজনৈতিক একটি বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখা দিতে পারে এবং এর ফলে জনগণের দরবারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। সরকার এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ বিষয়ে আলোকপাত করে এর কাঠামো ও অন্যান্য দিক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হতে পারে।

প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থার চিন্তা সবার মধ্যে পৌঁছে দেয়ার জন্যই আমার এ উদ্যোগ। প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা কবে বাংলাদেশে সম্ভব হবে বা আদৌ সম্ভব হবে কিনা জানি না। কিন্তু যদি সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদরা এবং সরকারি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়টি নিয়ে ভাবেন তবেই এ লেখার সার্থকতা। নতুন কিছু করা পৃথিবীর সব দেশেই চ্যালেঞ্জিং। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে তো কথাই নেই। নতুনের কথা শুনলে একদল মানুষ শুরুতেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। সেই বাংলাদেশে প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থার আলোচনা আরো এগিয়ে যাবে কিনা জানি না, তবে আমার ভেতরের ইচ্ছাটা সবার চিন্তার জন্য প্রকাশ করলাম। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় আমি স্পষ্টভাবে বলতে পারি যে, আজ হোক আর কাল হোক বাংলাদেশে দুই কক্ষবিশিষ্ট সরকার পদ্ধতি চালু হবেই। কেননা এত বিশাল সংখ্যার মানুষের জন্য এক কক্ষবিশিষ্ট সরকার ব্যবস্থা অপ্রতুল। তাই যে কাজটি কালকে হবে এবং অন্য কোনো হাতে হবে, সেই কাজটি বর্তমান সরকার কেন আজই করছে না এবং কৃতিত্বটা কেন তারাই নিচ্ছে না।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj