ছাড়পত্র পেয়েও দীর্ঘ অপেক্ষা

শনিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৮

স্বাক্ষর শওকত

চলচ্চিত্র ব্যবসা এখন সর্বযুগের সবচেয়ে মন্দা সময় অতিক্রম করছে। কালেভদ্রে একটি-দুটি ছবি ব্যবসা করছে। বাদবাকি সব ছবির ললাটে ঝুলছে লোকসানের তকমা। এ অবস্থা অনেকদিনের। এখান থেকে বের হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ব্যবসা মন্দা বলে ছবির নির্মাণসংখ্যা কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। প্রযোজক সংকটে পড়ে সিনেমার দশা প্রচণ্ড নাজুক।

ব্যবসায়িক মন্দার কারণে অনেক প্রযোজক মাঝপথে ছবি নির্মাণ আটকে দিয়েছেন। অর্ধশতাধিক ছবি নির্মাণের কোনো না কোনো পর্যায়ে আটকে আছে। কিছু ছবি মহরতের পর আর শুটিং ফ্লোরে গড়াচ্ছে না। কিছু ছবির শুটিং শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তারপর আর ডাবিং, এডিটিং হচ্ছে না। কিছু ছবি একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ঝুলে আছে।

হতাশাজনক বিষয় হচ্ছে- কিছু ছবি পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ার পরও মুক্তির আলো দেখছে না। সেন্সর বোর্ডের সার্টিফিকেট পেয়ে গেছে অথচ সেই ছবি আর সিনেমা হলে মুক্তি পাচ্ছে না। এ ছবিগুলো মূলত ব্যবসায়িক ঝুঁকির কথা চিন্তা করে পিছিয়ে যাচ্ছে। মন্দা বাজারের মরণকামড়ের ভয়ে সংশ্লিষ্ট নির্মাতারা ছবি শেষ করেও তা দর্শকদের দেখার সুযোগ দিচ্ছেন না।

২০১৪ সালের মাঝামাঝিতে সেন্সর ছাড়পত্র পায় গাজিউর রহমান পরিচালিত ‘এই তুমি সেই তুমি’। ডিজিটাল এই ছবিতে অভিনয় করেছেন কায়েস আরজু ও আইরিন। ছবিটি কয়েকবার মুক্তির তারিখ নেয়। কিন্তু কখনোই মুক্তির দৌড় শেষ করতে পারেনি। ছবিটি মুক্তি পেলে নায়ক ও নায়িকা দুজনেরই ক্যারিয়ারেই কিছু যোগ করত। সেই আশার গুড়ে বালি।

কায়েস আরজুরই আরেকটি ছবি শামিমুল ইসলাম শামিম পরিচালিত ‘আমার প্রেম আমার প্রিয়া’র শুটিং আরম্ভ হয় ২০১৫ সালে। ধুঁকতে ধুঁকতে সেই ছবি অবশেষে চলতি বছরের মে মাসে সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র লাভ করে। এ পর্যন্ত অনেকগুলো তারিখ নিয়েও ছবিটি মুক্তি পায়নি। পরী মণির হাতে এখন তেমন কোনো ছবি নেই। তার অভিনীত এই ছবিটি শেষ হয়েও মুক্তি পাচ্ছে না। যা তার ক্যারিয়ারকে কোনোরূপ সহায়তা করছে না।

কায়েস আরজুরই মতো বিপাকে আছেন সাইমন সাদিক। তার দু’দুটো ছবির কাজ শেষ। ছবিগুলো তিনি দর্শকদের দেখাতে পারছেন না। শুধুমাত্র পারিশ্রমিক নিয়েই কি সাইমনকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে? এ জে রানা পরিচালিত ‘তোমার জন্য মন কান্দে’ ছবিটি সেন্সর ছাড়পত্র পায় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। ২০১৫ সালে মুক্তির জন্য তারিখ নিয়েছিলেন ছবিটির প্রযোজক। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে নির্মাতা আর ছবিটি মুক্তি দিচ্ছেন না। সাইমনের সঙ্গে ছবিটিতে অভিনয় করেন সারা জেরিন। এই দুই শিল্পীরই অভিষেক হযেছিল ‘জ¦ী হুজুর’ ছবিতে। এটিই ছিল সারা অভিনীত শেষ ছবি। ছবিটি মুক্তি না পাওয়ায় সারা চিত্রজগত থেকেই এক প্রকার হারিয়ে যান।

সাইমন অভিনীত ‘জলশ্যাওলা’ও কি একই ভাগ্য বরণ করবে? নদী ফিরোজ পরিচালিত ছবিটি গত বছরের আগস্টে সেন্সর ছাড়পত্র পায়। প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও ‘জলশ্যাওলা’র মুক্তির কোনো তোড়জোর নেই। ছবিতে সাইমনের বিপরীতে একজন নতুন মুখ অভিনয় করেছেন। সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, বাজারের অবস্থা দেখে প্রযোজক ভরসা করতে পারছেন না নায়কের ওপর। এই মন্দা সময়ে পুঁজি ফেরত আনতে পারবেন কি না সাইমন, সেই শঙ্কা থেকেই নির্মাতা ছবিটি নিয়ে বসে আছেন।

বাপ্পি চৌধুরীর একটি ছবিও দেড় বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে আছে নিতান্ত অবহেলায়। ছবিটির নাম ‘সাদাকালো’। এ নামেই ছবিটি সেন্সর ছাড়পত্র পায় গত বছরের এপ্রিল মাসে। গণমাধ্যমে ছবিটির নাম শোনা যায় ‘সাদাকালো প্রেম’। এখন ছবিটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘ডনগিরি’। আনিসুর রহমান মিলন ও নবাগতা অ্যামিয়া অ্যামি অভিনয় করেছেন ছবিটিতে। এটি পরিচালনা করেছেন শাহ আলম মণ্ডল। ছবির নাম যাই হোক, এর মুক্তি বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। এভাবে পেছাতে থাকলে দর্শকরা শেষ পর্যন্ত এটিকে গ্রহণ করবেন কিনা তা নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জাজ মাল্টিমিডিয়ার ছবি সচরাচর আটকে না থাকলেও দুয়েকটি ব্যতিক্রম রয়েছে। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘ডিটেকটিভ’ নামে একটি অ্যানিমেশন ছবি তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। তপন আহমেদ পরিচালিত ছবিটি ২০১৬ সালে সেন্সর ছাড়পত্র পেলেও মুক্তির কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না জাজ। প্রযোজনা সংস্থা থেকে নির্মিত হয়েছে বাবা যাদব পরিচালিত ‘বেপরোয়া’। ববি ও রোশান অভিনীত ছবিটি নিয়ে জাজের আগ্রহ কম। সেন্সর ছাড়পত্র পাওয়ার চার মাস পার হলেও ছবিটি মুক্তির জন্য তারিখ পায়নি।

যৌথ প্রযোজনার ছবিগুলো প্রায়ই নিয়ম-কানুনের নানা বেড়াজালে আটকে যায়। এরকম বেশ কিছু ছবি রয়েছে আটকে থাকা ছবির তালিকায়। এ ছবিগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক ঝুঁকি কোনো বড় সমস্যা নয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই মূলত ছবিগুলো শেষ হয়েও আটকে যাচ্ছে। এমনই একটি ছবি জয়দীপ মুখার্জি পরিচালিত ‘তুই শুধু আমার’। এপারের মাহিয়া মাহি এবং ওপারের সোহম-ওম অভিনয় করেছেন ছবিটিতে। আগস্টে কলকাতায় মুক্তি পেয়ে গেছে ‘তুই শুধু আমার’। বাংলাদেশে ছবিটি মুক্তির কোনো উপায় দেখা যাচ্ছে না আপাতত।

উল্লিখিত ছবিগুলোর বাইরেও কিছু ছবি রয়েছে যেগুলো সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেয়েও সিনেমা হলে প্রদর্শনীর জন্য যাচ্ছে না। অসমাপ্ত ছবির পাহাড়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাপ্ত ছবির মিছিলও দীর্ঘ হচ্ছে। সিনেমার বর্তমান পরিস্থিতি অনেক প্রযোজকের জন্যই বৈরী হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতির পরিবর্তনের দিকেই এখন সিনেমা সংশ্লিষ্টদের চোখ।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj