বগুড়ার দইয়ের খ্যাতি দেশ-বিদেশে

শুক্রবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নাহিদ আল মালেক : টাঙ্গাইলের চমচম, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, কুমিল্লার রসমালাই যেমন বিখ্যাত তেমনই বিখ্যাত বগুড়ার দই। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিদেশেও রয়েছে এর সুনাম। বিভিন্ন উৎসবে, বিয়ে কিংবা অনুষ্ঠানে দই যেন অপরিহার্য। এই দই স্বাদে যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। এ দইকে ঘিরে বগুড়ায় গড়ে উঠেছে শত শত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কারখানা। শুধু তাই নয় দইয়ের সরা তৈরি করে টিকে আছেন মৃৎশিল্পীরা।

বাংলাদেশের অন্য জেলা কিংবা অঞ্চলে দই উৎপাদিত হলেও কিছু বিশেষত্বের কারণে ‘বগুড়ার দই’-এর খ্যাতি দেশজুড়ে। যার পেছনে রয়েছে মাটি ও পানির ভূমিকা। উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে কারিগরদের (উৎপাদক) বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণের পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তারা যতœবান হওয়ায় বগুড়ার দই স্বাদে-গুণে তুলনাহীন। প্রায় দেড়শ বছর আগে বগুড়ার শেরপুর পৌর শহরের ঘোষপাড়ার ঘোষ পরিবারের হাত ধরে বগুড়ার দইয়ের উৎপাদন শুরু।

পরবর্তী সময়ে বগুড়ার নওয়াব আলতাফ আলী চৌধুরীর (পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর বাবা) পৃষ্ঠপোষকতায় শেরপুরের ঘোষ পরিবারের অন্যতম সদস্য গৌর গোপাল বগুড়া শহরে দই উৎপাদন শুরু করেন।

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বগুড়ায় এসে দইয়ের স্বাদ পেয়ে ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তাদের সহানুভূতি পেতে পাঠান এই দই।

তবে এর আগেই বিদেশে বগুড়ার দইয়ের খ্যাতি সর্বপ্রথম ১৯৩৮ সালে ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। ওই বছরের গোড়ার দিকে তৎকালীন বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর স্যার জন এন্ডারসন বগুড়া নওয়াববাড়ি বেড়াতে এসে প্রথম দইয়ের স্বাদ গ্রহণ করেন। তাকে কাঁচের পাত্রে তৈরি করা বিশেষ ধরনের দই খেতে দেয়া হয়। লোভনীয় স্বাদের কারণে গভর্নর এন্ডারসন বগুড়ার দই ইংল্যান্ডে নেয়ার পরিকল্পনা করেন।

জানা যায়, তিন বছর আগে জলপাইগুড়ি জেলার চেম্বার কর্মকর্তাদের মধ্যে বগুড়ার দই নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। ওই সময়ে সেখানে অনুষ্ঠিত বাণিজ্যমেলায় বগুড়ার দইয়ের কদর এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে বগুড়া থেকে ১০ টন (প্রতিটি ৬শ গ্রাম ওজনের ১৭ হাজারেরও বেশি সরা) দই সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। পরে অবশ্য অল্প সময়ের মধ্যে এত দই পাঠানো যায়নি।

গত বছর ডিসেম্বরে জলপাইগুড়িতে অনুষ্ঠিত নর্থ বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (এনবিএনসিসিআই) আয়োজিত বাণিজ্যমেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ৫শ কেজি দই পাঠানো হয় বগুড়া থেকে।

বগুড়ার একজন পুরাতন দই ব্যবসায়ী জানান, বগুড়ার দই ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়া, রানী এলিজাবেথ থেকে শুরু করে আমেরিকা পৌঁছে গেলেও আমরা এ দই বড় পরিসরে রপ্তানি করতে পারছি না।

রপ্তানির সম্ভাবনা থাকলেও কাস্টমসের ট্যারিফ সিডিউলে পণ্যের তালিকায় দইয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের বাইরে বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে না।

বর্তমানে বাজারে মাটির তৈরি সরা ও খুঁটিতে দই বিক্রি হচ্ছে। ৬শ গ্রাম ওজনের দইয়ের মূল্য (সরা বাদে) ১২০ টাকা থেকে ২শ টাকা পর্যন্ত। দইয়ের রয়েছে হরেক রকম নাম, সাধারণ দই, স্পেশাল দই, শাহী দই, চিনিপাতা দই, চিনিছাড়া দই। দইকে কেন্দ্র করে এলাকায় গড়ে উঠেছে দুধের বাজার।

কারিগররা জানান, প্রতিদিন দুপুরে বাজার থেকে দুধ কিনে তাতে চিনি দিয়ে পরিমাণ মতো জ্বাল দেয়া হয় বিশালাকার ভাণ্ডের ভেতর। এরপর সন্ধ্যায় মাটির পাত্রে পরিমাণ মতো জ্বাল দেয়া দুধ ঢেলে দিয়ে বিশাল ঢাকা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। সকালে সেসব দই সরবরাহ করা হয় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকায়।

বগুড়ার দই নামে সারা দেশে জনপ্রিয় হলেও এই দইয়ের খ্যাতি মূলত শেরপুর উপজেলার তৈরি দইয়ের জন্য। শেরপুরে সাউদিয়া দই মিষ্টি ঘর, শম্পা দধি ভাণ্ডার, রিপন দধি ভাণ্ডারসহ বিভিন্ন কারখানায় উন্নতমানের দই তৈরি হয়। তাছাড়া বগুড়া মহররম আলী দধি ভাণ্ডার, আকবরিয়া, শ্যামলী দধি ভাণ্ডারেও উন্নতমানের দই পাওয়া যায়।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj