ছুটছে সবাই মানুষ বিক্রির হাটে!

শুক্রবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮


বাবুল আকতার ও তৃপ্তি রঞ্জন সেন, খুলনা থেকে : প্রখর রোদ। সত্তোর্ধ্ব আব্দুল খালেক গাজী ও তার ভাইপো ষাটোর্ধ্ব শাহাজান সানা তীর্থের কাকের মতো বসে আছেন পাইকগাছা লোনা পানি কেন্দ্রের সামনের সড়কের পাশে। তাদের দুজনের বাড়ি খুলনার পাইকগাছার লস্কর গ্রামে। উভয়েরই ছেলে মেয়ে রয়েছে। দুই একজনের ইতোমধ্যে বিয়ে হয়ে গেছে। নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাদের। এলাকায় নেই কোনো কর্মসংস্থান। কাজের জন্য বছরের অধিকাংশ সময় এলাকা ছেড়ে যেতে হয় উপজেলার বাইরে। কখনো জেলার ভেতরে আবার কখনো জেলার বাইরে।

খালেক গাজী ও শাহাজান সানাসহ প্রায় ৩০/৪০ জন একত্রিত হয়ে বসে আছেন বাসের অপেক্ষায়। সবার কাছে একটি করে ব্যাগও আছে। বাসে উঠে তারা যাবেন জেলার ডুমুরিয়ার মানুষ বিক্রির হাটে। সোমবার ও শুক্রবার বেলা তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত হয় এই হাট। বিভিন্ন এলাকার লোকজন হাটে আসেন মানুষ কিনতে। সে কারণে তারা সবাই যাচ্ছেন হাটে উঠতে। মানুষ বিক্রির এই হাট দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে খুবই পরিচিত।

মানুষ বিক্রির হাট শুনলেই যেন কেমন মনে হয়। মানুষ আবার বেচাকেনা হয় নাকি? কিন্তু সত্যি। এই হাটে মানুষ কেনাবেচা হয়। তবে সেটি কাজ করা জন্য। এটি জেলার ডুমুরিয়ায়। শুধু পাইকগাছা নয়, পার্শ্ববর্তী কয়রা উপজেলা ও সাতক্ষীরার আশাশুনির লোকজনও যায় মানুষ বিক্রির এই হাটে।

এলাকায় কর্মসংস্থান না থাকায় মানুষ মূলত কাজের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে যাচ্ছে অন্যত্র। লবণ পানির চিংড়ি চাষের কারণে এলাকায় ধান উৎপাদন না হওয়ায় মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। জীবিকার সন্ধানে তাই মানুষের অন্যত্র পাড়ি জমানো। এক সময় সবুজের সমারোহ ছিল পাইকগাছাব্যাপী।

গ্রামের মানুষের ছিল গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, আর ছিল গোলা ভরা ধান। এখন আর এগুলোর দেখা মেলা বড়ই কঠিন। সাদা সোনা বলে খ্যাত চিংড়ি চাষ হওয়ার পর থেকে পাইকগাছায় ধান উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে গেছে। যে কারণে কর্মসংস্থানের জন্য মানুষকে ছুটতে হয় এলাকার বাইরে। ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে পাইকগাছা উপজেলা গঠিত। যার মোট আয়তন ৩৯ হাজার ৩০২ হেক্টর।

উপজেলায় মোট কৃষি জমির পরিমাণ ৩২ হাজার ১৮৭ হেক্টর এবং আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ২৩ হাজার ১০৮ হেক্টর। এর মধ্যে এক ফসলি জমি ১৫ হাজার ৬০৭ হেক্টর, দুই ফসলি জমি ৬ হাজার ২৫৪ হেক্টর, তিন ফসলি জমি ১০ হাজার ৪০৪ হেক্টর এবং আবাদযোগ্য পতিত জমি ৭ হাজার ৯৩৮ হেক্টর।

আবাদযোগ্য পতিত জমিতে অপরিকল্পিত উপায়ে চিংড়ি চাষ করা হয়। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নামে আশির দশকে বহিরাগত প্রভাবশালী লোকজন এ এলাকায় এসে কৃষি জমিতে লবণ পানির চিংড়ি চাষ শুরু করে।

নব্বইয়ের দশকে তা গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে গাছপালা, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে। ঘটেছে পরিবেশ বিপর্যয়। নতুন বাজার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি গাজী নজরুল ইসলাম জানান, ঘের মালিকরা প্রথম দিকে মৎস্য চাষ করার জন্য জমির মালিকদের কাছ থেকে জমি লিজ নিত। তখন জমির মালিকরা জমিতে ধান উৎপাদন করত ফলে এলাকায় খাদ্য ঘাটতি থাকত না এবং কর্মসংস্থানের কোনো অভাব হতো না। পরবর্তী সময় ঘের মালিকরা জমির মালিকদের বেশি টাকা দিয়ে শুরু করে শুধু মৎস্য চাষ। বন্ধ হয়ে যায় ধান চাষ। ঘের মালিকার চিংড়ি চাষে বেশি লাভবান হওয়ায় জমির মালিকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে লবণ পানি তুলে চাষ করতে থাকে সাদা সোনা বলে খ্যাত চিংড়ি।

বছরজুড়ে জমিতে লবণ পানি আটকে থাকায় মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। হ্রাস পাচ্ছে ফসল উৎপাদন। পর্যাপ্ত জমিতে ধান চাষ না করায় শুধু চিংড়ির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার কারণে এলাকায় খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কর্মহীন হয়ে পড়া এলাকার হাজার হাজার মানুষ কাজের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ ভারতের কলকাতাসহ বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে ইটের ভাটায়ও কাজ করছেন। এমনটিই জানালেন কয়রার ফতেকাটি গ্রামের শফিকুল ঢালী। তিনিও যাচ্ছেন ডুমুরিয়ার মানুষ বিক্রির হাটে। পাইকগাছার চাঁদখালী ইউপির আলমতলা গ্রামের নজরুল ইসলাম বয়স ৬০। তিনি জানালেন, ইউনিয়ন থেকে ইতোমধ্যে ২/৩শ লোক এলাকার বাইরে চলে গেছে। এখন সকলে যাচ্ছে ধান কাটার জন্য। এক সপ্তাহে একজন প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হবেন মহাজনের কাছে। থাকা খাওয়া মহাজনের। যদি সপ্তাহের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যায় তাহলে আবার হাটে উঠতে হবে। অন্য জায়গার কাজ ধরার জন্য। এভাবে বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ এই দুই মাস তারা বাইরে থাকে। নজরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন নিজের না থাকলে কেউ এক কাপ চাও খেতে দিবে না। আলমতলা গ্রাম থেকে তারা ৫ জন যাচ্ছেন হাটে। যদি মহাজনের কাছে বিক্রি হতে পারেন তাহলে ভালো, না হলে আবার আগামী শুক্রবার হাটে যেতে হবে। এরকম সাতক্ষীরার আশাশুনির কামাল হোসেন, রহিম মোড়ল, লস্করের শাহাজান সবার মুখে একই কথা, এলাকায় ধান উৎপাদন হলে আমাদের বাইরে কাজের সন্ধানে যেতে হতো না। এখন পাটের মৌসুমে আবার টেকেরহাট, গোপালগঞ্জে যাবেন তারা। এভাবেই চলে কর্মজীবী মানুষের জীবন যাত্রা।

সচেতন এলাকাবাসী মনে করেন, ওয়াপদার বেড়িবাঁধ আরো উঁচু এবং সামাজিক বনায়ন গড়ে তোলার পাশাপাশি পরিকল্পিত উপায়ে চিংড়ি চাষ করলে এ এলাকায় আবারো অধিক পরিমাণে খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে বলে তাদের ধারণা। ফলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে এবং এলাকার চাহিদা পূরণের পর উদ্ভূত খাদ্যশস্য দিয়ে দেশের চাহিদার কিছু অংশ এ এলাকা থেকে পূরণ করা সম্ভব হবে। এমনকি এলাকার লোকজন জীবিকার সন্ধানে এলাকা ছেড়ে অন্য কোনো অঞ্চলে কিংবা দেশের বাইরেও পাড়ি জমাবে না বলে ধারণা অভিজ্ঞজনের।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj