শেরপুরের ঐতিহাসিক খেরুয়া মসজিদ

শুক্রবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি : বগুড়া শেরপুর উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহ্যহাসিক খেরুয়া মসজিদ এখনো ইতিহাস বয়ে চলেছে। সাড়ে ৪শ বছরের পুরাতন অপূর্ব নির্মাণশৈলী সংবলিত মসজিদটি মনোরম স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন।

শেরপুর শহরের অদূরে মাত্র ১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে খন্দকারটোলায় গ্রামীণ সবুজ-শ্যামল পরিবেশে মসজিদটির অবস্থান। তৎকালীন সময়ে মুসলমানদের নামাজ আদায়ের জন্য তৈরি মসজিদটি আজো দর্শনার্থীদের হৃদয় কাড়ে।

মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা এবং এর বাইরের মাপ দৈর্ঘ্যে ৫৭ ফুট এবং প্রস্থে সাড়ে ২৪ ফুট। আর ভেতরের মাপ দৈর্ঘ্যে ৪৫ ফুট আর প্রস্থে সাড়ে ১২ ফুট। চারদিকের দেয়ালগুলো প্রায় ৬ ফুট পুরো। মসজিদের চারকোণে ৪টি মিনার আছে। পূর্ব দেয়ালে ৩টি দরজা রয়েছে।

মাঝের দরজাটি অন্য দুটি থেকে আকারে অনেক বড়। আয়তকার ফ্রেমের মধ্যে অর্ধগোলাকার মেহেরাবগুলো স্থাপিত। মসজিদের কার্নিশ বাঁকানো আছে।

মসজিদের দেয়ালে কিছু কিছু পোড়া মাটির চিত্র ফলকও ছিল। তবে সংখ্যায় খুবই কম। দেয়ালগুলো সাদাসিধে ধরনেরই বলা যেতে পারে। মসজিদের মাঝের দরজার ওপরে দুটি শিলালিপি ছিল।

মসজিদের গায়ে এক সময় সংস্থাপিত ফার্সি শিলালিপি থেকে জানা গেছে, তিন গম্বুজ ও চার মিনারবিশিষ্ট মসজিদটি ৯৮৯ হিজরির ২৬ জিলকদ (১৫৮২ খ্রিস্টাব্দ) সোমবার ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে। তবে খেরুয়া মসজিদের নামকরণ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায়নি।

প্রকৃতপক্ষে জনৈক ফকির আব্দুস সামাদ ওই মসজিদটি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। নবাব মির্জা মুরাদ খান কাকশালের পৃষ্ঠপোষকতায় মসজিদটি নির্মিত হয়। তিনি ছিলেন জওহর আলী খান কাকশালের পুত্র।

বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ও শাহজাদপুরে অবস্থিত প্রাচীন মসজিদের নির্মাণশৈলীর সঙ্গে মসজিদটির অনেক মিল দেখা গেছে। ইট ও চুন-সুরকি ছাড়া খেরুয়া মসজিদের নির্মাণ কাজে বৃহদাকার কৃষ্ণ পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। মসজিদটি নিয়ে অনেক কিংবদন্তি চালু রয়েছে।

মসজিদটির ছাদের নিচে পায়রাদের বসবাসের জন্য পৃথক কিছু জায়গা নির্মাণ করা হয়েছিল। তা ছাড়া মসজিদের একটি শিলালিপির ভেতর রক্ষিত ছিল মূল্যবান স্বর্ণখণ্ড যা পরবর্তী সময় বেহাত হয়। মসজিদের একটি শিলালিপি বর্তমানে করাচি জাদুঘরে রক্ষিত রয়েছে।

সম্রাট আকবরের আমলে মসজিদটি তৈরি হওয়ায় মসজিদের বিভিন্ন জায়গায় ব্যতিক্রম অনেক চিহ্ন পাওয়া গেছে। স্থাপত্য বিশারদদের মতে, খেরুয়া মসজিদটিতে সুলতানী ও মোগল আমলে মধ্যবর্তী স্থাপত্য নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছে। এতে বারোকোনা ও আটকোনা কলাম ব্যবহার করা হয়েছে যা বাংলার স্থাপত্য শিল্পে বিরল। তবে এই মসজিদের নামকরণের কোনো কারণ জানা যায়নি।

এই মসজিদটি বহুদিন অনাদরে পড়ে ছিল। এর মধ্যে অনেক গাছপালা জন্মেছিল। চারদিকে গড়ে উঠেছিল অনেক জঙ্গল। নব্বইয়ের দশকে প্রতœতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটি সংস্কার করেছে ফলে মসজিদটি আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। এখনো সেখানে রীতিমতো নামাজ পড়া হয়। প্রতœতত্ত্ব বিভাগ ১৯৮৮ সাল থেকে মসজিদ এবং এর ৪৮ শতক জায়গা দেখাশোনার জন্য একজন লোক নিয়োগ করেছে। দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক, দর্শনার্থী, স্থাপত্য বিশারদরা মসজিদটি পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু খেরুয়া মসজিদটি পড়ে আছে অযতেœ অবহেলায়। এই সুরম্য মসজিদ স্থলে যাওয়ার জন্য পাকা কোনো রাস্তা নেই। পাকা রাস্তা থেকে মাত্র কয়েকশ গজ কাঁচা রাস্তা মসজিদটিকে দুর্গম করে গেছে। মসজিদটিতে যাওয়ার জন্য প্রশস্ত পাকা রাস্তা তৈরি হলে তা দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসুদের যেমন তৃষ্ণা মেটাবে তেমনি মুসলিম স্থাপত্য শিল্প সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধারণা জোগাবে।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj