ক্যাম্পাসে ইফতার আড্ডা

বৃহস্পতিবার, ৩১ মে ২০১৮

রেহেনা ও তানিয়ার বাড়ি ঝিনাইদহ। তারা গত বছর ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বছর রমজানে তাদের ক্লাস পরীক্ষা চলবে। তাই তাদের বাড়িতে যাওয়া হবে না। তারা এ ইফতারিকে তাদের বাড়িতে বসে ইফতার করার সঙ্গে তুলনা করতে নারাজ। তবে এ চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে ইফতার করাটা তাদের শিক্ষাজীবনের নতুন একটি জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট হলেও এখন তারা মানিয়ে নিয়েছে। কেননা এমন অভিজ্ঞতা তাদের মতো হাজারও শিক্ষার্থীর। মেঘলা আকাশ আর ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টির মধ্যেও দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোর সবুজ ক্যাম্পাসে এই রমজানের প্রতিদিনই বসছে বাহারি স্বাদের ইফতারির মেলা। কোমল ঘাসের সবুজ গালিচায় হাজারও তরুণ তরুণী ইফতারের মুহূর্তকে সামনে রেখে ঘটিয়ে থাকেন প্রাণের মেলবন্ধন।

জাতীয় আর আন্তর্জাতিক ইস্যুতে যেই ক্যাম্পাসগুলো সদাব্যস্ত থাকে মুহুর্মুহু মিছিল আর স্লোগানে, রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে অনেকটা ‘পান থেকে চুন খসলেই’ পরস্পরের ওপর হামলার ঘটনা নৈমিত্তিক, সেই ক্যাম্পাসে রমজানের মাগরিবের আজানকে সামনে রেখে হররোজই নেমে আসে স্বর্গীয় শান্তি ও উৎসবের আমেজ।

পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে তৈরি হয় এক শান্তির সমাজ। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী বন্ধুরাও মুসলিম বন্ধুদের ইফতারের এই প্রিয় মুহূর্তে শরিক হয়ে অসাম্প্রদায়িকতার অনুপম দৃষ্টান্তও উপহার দিয়ে থাকে।

সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লে শুরু হয় ইফতারির প্রস্তুতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রতিটি হলের সামনে ছোটখাটো ইফতারির দোকান বসে। আসরের পরপর সবাই ইফতারি কিনে আনে। অনেক সময় দেখা যায় রুমের ৬/৭ জন মিলে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা তুলে ইফতার সামগ্রী কিনে আনে। ইফতারির মধ্যে থাকে আলুর চপ, পেঁয়াজু, ডিমের চপ, জুস, বেগুনি, জিলাপি, শরবত, খেজুর, দই, বুন্দিয়া, বড়া এবং নানা রকম ফল-ফলাদি। আগে থেকেই সবাই ইফতারির মেনু তৈরি করে রাখে আজকের ইফতারিতে কি খাবে তারা। ইফতারি তৈরির ব্যাপারটায় বেশ আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়। পেঁয়াজ-মরিচ কেটে ছোলাবুট এবং চপ দিয়ে মুড়ি বানানো। শরবত তৈরি করা ইফতারির সময় কতটুকু বাকি আছে বা কখন আজান হবে তার খোঁজ নেয়া, এই বুঝি ইফতারির সময় হয়ে গেছে। তাই হঠাৎ করে সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে যায়। ইশ, এখনো ইফতারি প্রস্তুত হয়নি। টুপি মাথায় কেউ কেউ ছোটবেলায় মসজিদ ও মাদ্রাসা থেকে মুখস্ত করা দোয়াগুলো বারবার বলতে থাকে। তবে এর মধ্যে এমনো অনেকে থাকে যারা রোজা রাখেনি। কিন্তু তাদের বোঝার কোনো উপায় নেই। সবার চোখে মুখে পবিত্রতার ছায়া বিরাজ করে। ইফতারির এ আমেজের চিত্র পুরো রমজান মাসজুড়েই চলে।

নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আলী মারজান, শামস, শুভ ও মিম এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের ছাত্রী সিফাত আরা বাঁধন ও তাসনিমুল জান্নাত হিমি বলেন, ক্যাম্পাসে ইফতার করায় আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক আগের থেকে আরো গাঢ় হচ্ছে। আমরা রোজা থেকে যে আত্মশুদ্ধি লাভ করছি তার একটি হচ্ছে শত্রু-মিত্র বিভেদ দূর করে এক হয়ে দেশের পক্ষে কাজ করা। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর বাইরে টিএসসি, মলচত্বর, হাকিম চত্বর, কার্জন হল, এসএম হল, এফ রহমান হল, জসিমউদ্দীন হল, হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হল, শহীদুল্লাহ হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, বঙ্গবন্ধু হল, শামসুন্নাহার হল, রোকেয়া হল ও কলা ভবনের সামনের সবুজ চত্বরের বটগাছের নিচে প্রতিদিন আসরের পরে ইফতারির একটা রমরমা পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

ক্যাম্পাসের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর ইফতারেও এরকম হয়ে যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এরশাদুল বারী কর্নেল, পটুয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই অনুষদের ছাত্র ও সাংবাদিক গোলাম মাওলা, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র ও সাংবাদিক আয়াজ আজাদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ইলিয়াস সরকার, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহের সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী মো. শাহীন আলম জানান, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতি বছরের মতো এ বছরও ইফতারি ও ক্যাম্পাসের হলগুলোতে উন্নতমানের খাবারের জন্য বিশেষ বরাদ্দ করেছে।

:: ক্যাম্পাস ডেস্ক

ক্যাম্পাস'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj