অপারেশন কামালপুর : পাকিস্তানি মেজরসহ দুই কোম্পানি নিশ্চিহ্ন

শনিবার, ১৭ মার্চ ২০১৮

শরীফা বুলবুল : শেরপুর জেলার গারো পাহাড়ের গা ঘেঁষে সীমান্তবর্তী কামালপুরে ছিল পাকিস্তানি সেনাদের শক্ত ঘাঁটি। কামালপুর থেকে সোজা দক্ষিণে বকশীগঞ্জ হয়ে শেরপুরে চলে গেছে একটি সড়ক। এ সড়ক ধরে জামালপুর-টাঙ্গাইল হয়ে দ্রুততম সময়ে ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব। ১৪ নভেম্বর ছিল ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর তাহেরের জন্মদিন। কামালপুর শত্রু ঘাঁটি দখল করে সেখানে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়াতে তিনি এ দিনটিকে বেছে নিয়েছিলেন। পরিকল্পনা মতো ওই দিন ১১ নম্বর সেক্টরের যোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণে পাকসেনাদের একজন মেজরসহ দুটি কোম্পানি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সেক্টর হেডকোয়ার্টারে অপারেশন অফিসারের দায়িত্বে নিযুক্ত হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুক্তিযোদ্ধা ড. আনোয়ার হোসেন।

কামালপুর অপারেশনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন বলেন, ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের কালরাতে যখন পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা শুরু করল, তখন থেকেই আমরা উন্মুখ হয়েছিলাম কখন বড় ভাই মেজর তাহেরের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের খবরটি পাব। জুলাই মাসের আগেই তাহের ভাই আমার আব্বা-আম্মাকে উদ্দেশ করে একটি চিঠিও পাঠিয়ে ছিলেন। এক রাতে চারজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা আমাদের গ্রামের বাড়িতে উপস্থিত হলেন। তারা এসেছেন আমাদের সবাইকে ১১ নম্বর সেক্টরে নিয়ে যেতে। যার অধিনায়কত্ব গ্রহণ করেছেন মেজর তাহের। আমি যাই আগস্টে। তাহের ভাই আমাকে সেক্টর হেডকোয়ার্টারে অপারেশন অফিসারের দায়িত্বে নিযুক্ত করলেন।

আমার কাজ ছিল, অপারেশন কক্ষে বিভিন্ন যুদ্ধ-ম্যাপ সাজিয়ে রাখা, বিভিন্ন যুদ্ধ অভিযানে সেক্টর কমান্ডারের সঙ্গে থাকা এবং একটি বিরল সৌভাগ্য হিসেবে তার (মেজর তাহের) অস্ত্রটি বহন করা। আরও একটি কাজ ছিল, প্রতিদিন রাতে আমাদের ফিল্ড ওয়ারলেস ব্যবস্থার মাধ্যমে সিচুয়েশন রিপোর্ট প্রেরণ করা, যা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলার অবরুদ্ধ মানুষ জানতে পারত। সেসব রিপোর্টে থাকত আমাদের নানা অভিযানের কথা। শত্রু সৈন্যের হতাহতের কথা। যুদ্ধে বাঙালি গেরিলাদের অবিস্মরণীয় সাহস ও আত্মত্যাগের কথা। এসব রিপোর্টে যে নামটি বারবার উচ্চারিত হতো তা হলো কামালপুর শত্রু ঘাঁটি।

মহেন্দ্রগঞ্জে অবস্থিত সেক্টর হেডকোয়ার্টার থেকে কামালপুর শত্রু ঘাঁটির দূরত্ব ছিল প্রায় ৮০০ গজ, যা ছিল শত্রু আর্টিলারি রেঞ্জের মধ্যে। তাহের ভাই জানতেন, সামনের ডিসেম্বরেই সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। বাংলাদেশের সব সীমান্ত থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে যাবে ঢাকা অভিমুখে। পাকিস্তানিরাও সম্ভবত তা জানত। তাই তারা সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্ভাব্য প্রবেশপথগুলো বন্ধ করার জন্য সীমান্তে তাদের ঘাঁটিগুলোকে দুর্ভেদ্য করে গড়ে তোলায় মনোযোগ দেয়। তারা ব্যাপকভাবে কাঁটাতারের বেড়া ও মাইন ব্যবহার করে। ঘাঁটিগুলোর ভেতর মাটির নিচে মজবুত বাঙ্কার তৈরি করে তারা। যার ওপর ছিল উঁচু মাটির ঢিবি, যা তাদের কামানের গোলা থেকেও বাঁচাতে পারে।

বকশীগঞ্জে পাকিস্তানি অপর যুদ্ধঘাঁটি থেকে ১২০ মিমি মর্টারের গোলা তারা নিক্ষেপ করত নিজ ঘাঁটি কামালপুরের ওপর। সেখানকার শত্রুসেনারা মজবুত বাঙ্কারের ভেতরে থাকত বলে এই আক্রমণে তাদের কোনো ক্ষতি হতো না। অন্যদিকে কামালপুরের ওপর আক্রমণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষতি হতো।

তাহের ভাই বলেছিলেন, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে এ রণকৌশলের প্রচলন হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় তা ব্যাপকভাবে কাজে লাগায় পাকিস্তানিরা। ১৩ নভেম্বর রাতে মুক্তি বাহিনীর ৩টি কোম্পানি ক্যাপ্টেন মান্নান, সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মিজান এবং আমার অপর ভাই আবু সাঈদের নেতৃত্বে কামালপুর যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেয়। সঙ্গে ছিল ভারতীয় ৯৫ মাউন্ট ব্রিগেডের দুটি কোম্পানি। পেছন থেকে ভারতীয় আর্টিলারিও আমাদের সাহায্য করে। আমার চশমা তার কয়েক দিন আগে ভেঙে গিয়েছিল বলে এ যুদ্ধে অধিনায়ক তাহেরের সঙ্গে আমাকে নেয়া হয়নি। কারণ অল্প দূরের জিনিসও আমি দেখতে পেতাম না। কিন্তু অধিনায়ককে না জানিয়ে আমি আমার ছোট বোন ডালিয়াকে নিয়ে একটা ওয়াকিটকি ও পানির ফ্লাস্কসহ যুদ্ধক্ষেত্রের খুব কাছে অবস্থান নিয়েছিলাম। ওয়াকিটকিতে যুদ্ধের খবর ভেসে আসছিল, যা শুরু হয়েছিল রাত ৩টা থেকে। অর্থাৎ ১৪ নভেম্বর। আমাদের তীব্র আক্রমণে পাকসেনাদের একজন মেজরসহ দুটি কোম্পানি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বকশীগঞ্জ থেকে অবরুদ্ধ পাকিস্তানিদের সাহায্যে এগিয়ে আসা একটি পাকিস্তানি প্লাটুন ওঁৎ পেতে থাকা আমাদের এম্বুসে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ভোরের দিকে স্পষ্ট হয়ে এলো শত্রু ঘাঁটির পতন আসন্ন।

আমাদের একটি অগ্রবর্তী কোম্পানির অধিনায়ক, সদ্য কমিশনপ্রাপ্ত সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মিজানের খবর পাচ্ছিলেন না তাহের। তাই আমাদের দুই ভাই বাহার ও বেলাল আরও কয়েকজন স্কাউটকে সঙ্গে নিয়ে তাহের নিজেই এগিয়ে যান মিজানের খোঁজে। ওয়াকিটকিতে শুনতে পাই তারা একটি বাঙ্কার দখল করেছেন। অগ্রবর্তী মুক্তিযোদ্ধা দলটিরও সন্ধান মিলেছে। পাকিস্তানিদের ছেড়ে যাওয়া একটি মেশিনগান পোস্ট থেকে গুলির চেইন অধিনায়ক তাহেরের গলায় পরানো হয়েছে জন্মদিনের উপহার হিসেবে। তারা সবাই শত্রু ঘাঁটির দোরগোড়ায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা ঘাঁটি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে। বিভিন্ন অবস্থানের মুক্তিযোদ্ধারা জন্মদিনের অভিনন্দন বার্তা পাঠাচ্ছে ওয়ারলেস সেটে। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যেও একটা খুশির আমেজ আমিও টের পাচ্ছিলাম।

এর মধ্যেই সকাল হয়ে গেছে। হঠাৎ করেই ওয়ারলেস সেটে বাহার বেলালের চিৎকারে শুনলাম অধিনায়ক মারা গেছে। আমি ডালিয়াকে রেখে দৌড়ে চললাম। একটি ক্ষেতের বেড়ার ওপর শায়িত দেখলাম তাহেরকে। হাঁটুর ওপর থেকে তার বাম পাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শত্রুগোলার আঘাতে আহত হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা ওই বেড়ার ওপর শুইয়ে প্রচণ্ড গোলাবৃষ্টির মধ্যেও তাকে টেনে নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। আমি তার দিকে তাকালাম। প্রচুর রক্তক্ষরণে চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, তারপরও তিনি হাসিটি ধরে রেখেছেন। পানি চাইলেন। আমি ফ্লাস্ক থেকে তার মুখে পানি দিতে চাইলাম, তিনি মাথা একটু উঁচু করে নিজের হাতেই পানির মগটি নিলেন। বললেন, আমার হাত তো ঠিক আছে। উদ্ধারকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সারা শরীরে রক্ত। চিৎকার করে কাঁদছিলেন সবাই। তাহের বললেন, ‘তোমাদের আমি বলতাম না, পাকিস্তানিরা আমাকে মারতে পারবে না। আমি মরব না। তোমরা ফ্রন্টে ফিরে যাও। চারদিকে খবর পাঠাও আমার কিছুই হয়নি। আমি তোমাদের ছেড়ে হাসপাতাল যাচ্ছি; কিন্তু ফিরে এসে যেন দেখি কামালপুর দখল হয়েছে। আর ঢাকার রাস্তা পরিষ্কার।’ কান্না-শোক ভুলে আমরা তখনই এগিয়ে চললাম শত্রু ঘাঁটির অভিমুখে।

অধিনায়কের আহত হওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাসপাতালে যাওয়ার কারণে সে দিন কামালপুর শত্রু ঘাঁটি আর দখলে এলো না। কারণ ওয়ারলেস বার্তায় পাকিস্তানিরাও টের পেয়ে গিয়েছিল, তাহের আর যুদ্ধক্ষেত্রে নেই। তাই তারা আরো বিপুল সৈন্য পাঠিয়েছিল কামালপুর শত্রু ঘাঁটিতে। তবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কামালপুর শত্রু ঘাঁটি আমাদের দখলে এসেছিল। তখন সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তাহের যেভাবে চিন্তা করেছিলেন, সেভাবেই ঢাকার প্রবেশদ্বার কামালপুর শত্রু ঘাঁটি পতনের মধ্য দিয়ে ১১ নম্বর সেক্টরের আগুয়ান মুক্তিযোদ্ধারা আমার অপর ভাই আবু ইউসুফ বীরবিক্রমের নেতৃত্বে বকশীগঞ্জ-শেরপুর-জামালপুর-টাঙ্গাইল হয়ে সর্বপ্রথম ঢাকা প্রবেশ করেন। ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজির আত্মসমর্পণের আগে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে পাকিস্তানি চতুর্দশ ডিভিশনের হেডকোয়ার্টারে অবস্থান নেন তারা।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj