ভালোবাসার গান নেপথ্যের গল্প

শনিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

চলচ্চিত্রের অসংখ্য ভালোবাসার গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এসব গান তৈরির পেছনে রয়েছে আকর্ষণীয় গল্প। দেশের খ্যাতিমান পাঁচ সুরকারের বাছাই কিছু ভালোবাসার গান ও নেপথ্যের গল্প নিয়ে এই বিশেষ আয়োজন

চাঁদের সাথে আমি দেব না

শিল্পী : রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোর

গীতিকার : সৈয়দ শামসুল হক

তমিজউদ্দিন রিজভি পরিচালিত ‘আশীর্বাদ’ ছবির গান। সুরকার আলম খানের মতে, এটি চলচ্চিত্রে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা শেষ গান। এরপর আর তিনি গান লিখেননি। তিনি আলম খানের সুরে বেশ কিছু গান লিখেছিলেন (‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘তোরা দেখ দেখ দেখরে চাহিয়া’, ‘আমি চক্ষু দিয়া দেখতেছিলাম জগৎ রঙিলা’, ‘কারে বলে ভালোবাসা কারে বলে প্রেম’, ‘বড় ভালো লোক ছিল’, ‘চাম্বেলিরও তেল দিয়া কেশ বাইন্ধাছ’)। এই ছবির জন্য সৈয়দ হকের কাছে আলম খান একটি রোমান্টিক গান চেয়েছিলেন। সাধারণত ছবির গান নিয়ে হকের গুলশানের বাসায়ই সিটিং হতো। হক ফোনে জানালেন, গান রেডি। আলম খান তার বাড়িতে গেলেন পরিচালকসহ। তিনি আলম খানের হাতে ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’ গানটি তুলে দিয়ে বললেন, আলম, তুমি আমাকে একটি প্রেমের গান লিখতে বলেছিলে, সচরাচর যেরকম প্রেমের গান হয়, সে রকম নয়, একটু উল্টো করে বলার চেষ্টা করেছি আমি। তারপর গানটি সুর করেন। এই গানটি শ্রæতিতে লাইভ রেকর্ডিং হয়েছিল। ১২ থেকে ১৫টা টেকে গানটি রুনা লায়লা ও এন্ড্্রু কিশোরের কণ্ঠে ধারণ হয়েছিল।

তুমি যেখানে আমি সেখানে

শিল্পী : এন্ড্রু কিশোর

গীতিকার : মনিরুজ্জামান মনির

মাসুদ পারভেজ পরিচালিত ‘নাগ পূর্ণিমা’ ছবির গান। গীতিকার ছিলেন মনিরুজ্জামান মুনির। সাপের কাহিনী নিয়ে নির্মিত হলেও ছবির এই একটি গান ছিল অনেকটা নিরীক্ষাধর্মী। ছবির নায়ক সোহেল রানার লিপে প্রতিটি গানই ছিল এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে। তিনি আলম খানকে বললেন, একটু ইংরেজি গানের মতো করে গান করেন। আলম খান বললেন, ইংরেজি করব মানে, আপনার সিনেমা তো বাংলা? একদম ইংরেজি গান তো আর হবে না, তবে ইংরেজির আদলে একটা বাংলা গান হবে বলতে পারি। অনেক গবেষণা-টবেষণা করে আলম খান গানটি সুর করলেন। গানটি তুললেন কিশোর। তিনি আলম খানকে বললেন, স্কেলটা একটু নামিয়ে দেন। মাসুদ পারভেজ স্কেল নামাতে রাজি হলেন না। তিনি কিশোরকে প্রভাবিত করতে লাগলেন। রেকর্ডিং যিনি করছিলেন, তিনিও কিশোরের কষ্ট দেখে পারভেজকে অনুরোধ করলেন স্কেল কমানোর কিন্তু সোহেল রানা কিছুতেই রাজি নন। শেষ পর্যন্ত ওই অকটেভেই কিশোরকে গাইতে হয়। প্রায় ৩০টি টেক দেয়ার পর গানটি ‘ওকে’ হয়। কিন্তু এতবার গাওয়ার ফলে গলা ব্যথা হয়ে যায়। প্রায় এক সপ্তাহ আর গান গাইতে পারেননি তিনি।

তুমি আসবে বলে ভালোবাসবে বলে

শিল্পী : আঞ্জুমান আরা বেগম

গীতিকার : সৈয়দ শামসুল হক

সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সুতরাং’ ছবির গান। এ গানের গীতিকার সৈয়দ শামসুল হকের বয়স তখন ২৭। এ ছবির চিত্রনাট্য তারই লেখা। কবি হিসেবে তখন সৈয়দ হক পরিচিতি পেয়ে গেছেন। তবে গান লিখতে হবে এটা কখনো ভাবেননি। ‘সুতরাং’ ছবির বাজেট কম। তাই সুভাষ দত্ত আর সত্য সাহা মিলে তাকে ধরলেন, এ ছবির গানও লেখার জন্য। সৈয়দ হক তখন চিত্রালী পত্রিকায় কাজ করেন। সত্য সাহা তখন থাকতেন ফরাশগঞ্জে একটা মেসে। এক বিকেলে সেই বাড়ির তিনতলার চিলেকোঠায় বসে প্রথম এ গানের চার লাইন লেখেন। ওই চার লাইনের প্রথম সুর করেন সত্য সাহা। তারপর বাকি গানটুকু লেখেন। সুভাষ দত্ত আর সত্য সাহা মিলেই এ গানের জন্য আঞ্জুমান আরাকে নির্বাচন করেন। এ ছবির বাকি গানগুলোও পরে সৈয়দ হককে লিখতে হয়েছে।

আমার মন বলে তুমি আসবে

শিল্পী : রুনা লায়লা

গীতিকার : গাজী মাজহারুল আনোয়ার

দীলিপ বিশ্বাস পরিচালিত ‘আনারকলি’ ছবির গান। এ গানের শিল্পী রুনা লায়লা। কিছুটা ক্লাসিক্যাল বেইজড এ গানটি রুনা লায়লার খুব প্রিয়। শ্রæতি রেকর্ডিং স্টুডিওতে এই গানটি রেকর্ড হয়েছিল। গানের গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের প্রযোজনা সংস্থা দেশ কথাচিত্র থেকে নির্মিত ‘আনারকলি’। গানটি প্রয়াত সত্য সাহার বাড়িতে বসেই লেখা এবং সুর করা হয়েছিল। ববিতা ঠোঁট মিলিয়েছিলেন গানটিতে। ছবির প্রেক্ষাপট ছিল এমন- ‘আনারকলি’ (ববিতা) যখন সেলিমকে (রাজ্জাক) পাচ্ছিল না, তখন নিঃসঙ্গ বা একাকীত্ব থেকে এই গানটি গান। আনারকলি কল্পনায় দেখে, সেলিম তার কাছে আসছে।

তোমারই পরশে জীবন আমার ওগো ধন্য হলো

শিল্পী : সুবীর নন্দী ও সাবিনা ইয়াসমিন

গীতিকার : গাজী মাজহারুল আনোয়ার

দিলীপ বিশ্বাসে পরিচালিত ‘অংশীদার’ ছবির গান। ১৯৮৪-৮৫ সালে গানটি শ্রæতি রেকর্ডিং স্টুডিওতে ধারণ করা হয়েছিল। সুবীর নন্দীর ওই সময় খুব পান খাওয়ার অভ্যাস ছিল। রেকর্ডিংয়ের সময় তার ‘র’ উচ্চারণটি ঠিকমতো হচ্ছিল না। বেশ কটি টেক নেয়ার পরও গানটি ‘ওকে’ হচ্ছিল না। এক পর্যায়ে খুব রেগে গেলেন সুরকার প্রয়াত সত্য সাহা। বললেন, সুবীর, তোমাকে কতবার বললাম পান খাওয়া ছেড়ে দিতে। জিহ্বা ভারী হয়ে যায়। সুবীর নন্দী কিছুটা লজ্জিত হয়ে একটু বিরতি নিলেন। প্রডাকশনের একজনকে ডেকে বললেন, একটা টুথপেস্ট আর একটা টুথব্রাশ নিয়ে আসতে। পেস্ট আর ব্রাশ নিয়ে সোজা বাথরুমে চলে গেলেন। তারপর ভালো করে জিহ্বা ব্রাশ করে ফিরলেন এবং আবার গানটি গাইতে দাঁড়ালেন। এবার ‘র’-এর উচ্চারণ পরিষ্কার হলো এবং গানটি সত্য সাহার মনমতো গেয়ে ফেললেন। পরে গাইলেন শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। ওই দিন থেকে সেই যে পান খাওয়া ছাড়লেন আর কোনো দিন পান খাননি সুবীর নন্দী।

ভালোবাসলে সবার সাথে ঘর বাঁধা যায় না

শিল্পী : শাম্মী আখতার

গীতিকার : মাহফুজুর রহমান মাহফুজ

একদিন সুরকার শেখ সাদী খান রাগ করে বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন। গেলেন গীতিকার মাহফুজুর রহমান মাহফুজের বাসায়। বললেন, মাহফুজ একটা গান লেখো। ভালোবাসা যতই করো, ভালোবাসলে ঘর বাঁধা যায় না!’ এই যে তুচ্ছ কারণে লেখা একটা গান সৃষ্টি হয়ে ইতিহাস হয়ে গেল। ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের জন্য গানটি তৈরি হলো। শাম্মী আখতারকে দেয়া হলো। তারপর গানটি ইতিহাস। প্রায় ৩০ বছর পর চলচ্চিত্র নির্মাতা জাকির হোসেন রাজু শেখ সাদীকে ডেকে নিয়ে বললেন, তিনি এই গানটি সিনেমায় টাইটেল গান হিসেবে ব্যবহার করতে চান। রাজু অনুরোধ করে বলেন, গানটি তিনি কনকচাঁপাকে দিয়ে গাওয়াতে চান। সাদী রাজি হলেন না। ‘যার গলায় গানটি পরিচিতি পেয়েছে আমি তাকে দিয়েই গানটি করাব’। এরকমই কথা ছিল শেখ সাদীর। শাম্মী আখতারের সঙ্গে আলাপ করে হাফ স্কেল নিচে গাওয়ানো হলো। রেজাল্ট একই এল। যদিও প্রথমে শাম্মী গাইতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন এবং এক পর্যায়ে অন্যকে দিয়ে গাওয়ানোর জন্যও রিকুয়েস্ট করেন। পরে গানটি তিনি গান। সদ্যপ্রয়াত শিল্পী শাম্মী আখতার গানটি গেয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়ে যান।

কাল সারা রাত ছিল স্বপ্নের রাত

শিল্পী : আশা ভোঁসলে

গীতিকার : নজরুল ইসলাম বাবু

একদিন শেখ সাদী খান আর গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু বসে আছেন। তখন একজন সঙ্গীতশিল্পী এসে বললেন তিনি ক্যাসেট করবেন, তার জন্য গান করে দিতে। তখনই এই গানটির সুর বের হয়ে গেল। পরে গানটি শোনার পর একজন প্রডিউসার বললেন, এই গানটি আবারো করেন তাহলে আশা ভোঁসলেকে দিয়ে গাওয়াব। তারপর গানটি ওনাকে দিয়ে গাওয়ানোর পর সিনেমা এবং রেডিওতে বাজার পর চমৎকার একটি আধুনিক বাংলা গান হয়েছে। এই চলচ্চিত্রটি কিন্তু মুক্তি পায়নি। এই গানটি প্রথমে আশা ভোঁসলে করেন।

পরে বেবী নাজনিন এসে শেখ সাদীকে বললেন, চাচা আমি এই গানটি গাইতে চাই। যদি ক্যাসেটে করি তাহলে হিট হতে পারে এবং বিভিন্ন জায়গায় গাইতেও পারব। আমি চিন্তা করলাম যে খারাপ কথা বলেনি। এটা রিমেকের মতোই তাকে দিয়ে করলাম। সাউন্ডটেক থেকে বের হলো। বেবী নাজনিন গানটিকে আরো দ্রুত মানুষের কাছে নিয়ে গেলেন।

আমার মনের আকাশে আজ জ্বলে শুকতারা

শিল্পী : কুমার শানু

গীতিকার : শেখ সাদী খান

আশা ভোঁসলেকে দিয়ে ‘কাল সারারাত’সহ বেশ কয়েকটি গান যে চলচ্চিত্রের জন্য করা হলো তা শেষ পর্যন্ত রিলিজ হয়নি। পরে ওই গানগুলো থেকে দুটি গান ওই চলচ্চিত্রের পরিচালক অন্য একটি সিনেমায় ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে আশা ভোঁসলের ‘কাল সারা রাত’ আর কুমার শানুর ‘আমার মনের আকাশে আজ জ্বলে শুকতারা’ গান দুটি ব্যবহার করা হয়। এই গানটিরও গীতিকার ছিলেন নজরুল ইসলাম বাবু। কুমার শানুকে প্রথম বাংলাদেশের সিনেমায় গান গাওয়ান শেখ সাদী খান।

আমি চিরকাল প্রেমেরো কাঙাল

শিল্পী : এন্ড্রু কিশোর

গীতিকার : মনিরুজ্জামান মনির

আখতারুজ্জামান পরিচালিত ‘প্রিন্সেস টিনা খান’ ছবির গান। তখন ইন্ডাস্ট্রিতে এন্ড্রু কিশোরের আধিপত্য চলছে। শেখ সাদী ভাবলেন এন্ড্রু কিশোরকে একটা বিপরীতধর্মী গান গাওয়াবেন। যেহেতু সে কিশোর কুমারের ফলোয়ার ছিল, তাকে দিয়ে এ ধরনের গান গাওয়ালে কেমন হয় পরীক্ষা করলেন। কিশোরকে এই ‘আমি চিরকাল প্রেমেরো কাঙাল’ গানটি গাওয়ালেন শেখ সাদী। তারপর টিকে থাকার মতো একটা গান হলো। ফোক এবং ক্ল্যাসিক মিক্সড করে গানটি করেছিলেন শেখ সাদী।

ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়

শিল্পী : কুমার শানু ও মিতালী মুখার্জি

গীতিকার : মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান

সৈয়দ হারুন পরিচালিত ‘চরম আঘাত’ ছবির গান। ৯৩-৯৪ সালের দিকে এ ছবির ছবির সঙ্গীত করতে মুম্বাই যান আলাউদ্দীন আলী। মুম্বাইতে যাওয়ার সময় গানটির গীতিকার রফিকুজ্জামান আর আলী গানগুলো ঢাকা থেকে তৈরি করে নিয়ে যান। ওই সময় মিতালী মুখার্জি মুম্বাই ছিলেন। আর গেলেই মিতালীর সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কাকে কোন গানটা দিলে ভালো হয়, সেটাও তাদের সঙ্গে শেয়ার করতেন। মুম্বাইতে যাওয়ার পর এই গান মিতালী মুখার্জি আর কুমার শানুকে দিয়ে গাওয়ানো হলো। এই গানটির জন্য সানাই ছিল, বাঁশি ছিল, স্যাক্সোফোন ছিল, চ্যালো ছিল দুইটা, প্রায় ৩০টি ভায়োলিন, ২৪ পিস রিদম প্লেয়ার ওই হলরুম ভর্তি ছিল। তাদের সঙ্গে নিয়ে গানটি সরাসরি রেকর্ড করা হয়। এরপর তারা দুজন দুই-তিন টেকেই এই গান গেয়ে ফেলে। পরে তা গানটি সুপার ডুপার হিট হয়ে যায়। এটাই কুমার শানুর সঙ্গে আলাউদ্দিন আলীর প্রথম কাজ। এর পরে অনেক কাজ করেছেন দুজনে।

শত জনমের স্বপ্ন তুমি আমার জীবনে এলে

শিল্পী : সাবিনা ইয়াসমিন

গীতিকার : আবু হেনা মোস্তফা কামাল

বুলবুল আহমেদ পরিচালিত ‘রাজলক্ষী শ্রীকান্ত’ ছবির। বুলবুল আহমেদ গীতিকার ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালকে নিয়ে কাজ করার অনুরোধ করেন। প্রথমদিন ওনার সঙ্গে বসলেন আলাউদ্দীন আলী। স্টুডিওর কার্পেটের মাথায় হেলান দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ভাবলেন মোস্তফা কামাল রাজ। তিনি ভাবছেন আর আলাউদ্দীন আলী সুর গুনগুন করছেন। অনেক সময় পার হওয়ার পর তিনি বললেন, না আজকে আর না, আজ হবে না। মনমতো না হলে তিনি লিখতেন না। পরের দিন এসে শুধু ‘শত জনমের স্বপ্ন, তুমি আমার জীবনে এলে’ এটুকু পর্যন্ত লিখে আলাউদ্দীন আলীকে দিলেন এবং সুর করতে বললেন। সুর হলো পরে তার নিজের লেখা যতটা না পছন্দ করলেন, তার চেয়ে আলাউদ্দীন আলীর সুরটা পছন্দ করলেন তিনি। দুজনের মধ্যে একটা মেলবন্ধন তৈরি হলো। পরে এই গান পুরো লিখলেন এবং একটি কালজয়ী গানের সৃষ্টি হলো।

কেউ কোনো দিন আমারে তো কথা দিল না

শিল্পী : সাবিনা ইয়াসমিন ও সৈয়দ আব্দুল হাদী

গীতিকার : আমজাদ হোসেন

আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবির গান। গেয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন। এই গান প্রথমে লেখার আগে আমজাদ হোসেন ছবির স্ক্রিপ্টটা লেখেন। এ ছবিতে পুরো সিনেমায় নায়ক ফারুক এক সংলাপ বারবার বলত! ‘একটা কিছু কও গোলাপী, একটা কিছু কও’। মানে নায়ককে কেউ কোনো দিন কোনো কথাই দিল না। ওই সংলাপ থেকেই মূলত এই বিখ্যাত গানটি লিখেন আমজাদ হোসেন। পরে এই গানটিতে সাবিনা ইয়াসমিন ও সৈয়দ আব্দুল হাদী কণ্ঠদান করেন।

এমনো তো প্রেম হয়, চোখের জলে কথা কয়

শিল্পী : সৈয়দ আব্দুল হাদী

গীতিকার : আমজাদ হোসেন

‘দুই পয়সার আলতা’ ছবিতে আব্দুল হাদীর গাওয়া গান। সুর আলাউদ্দীন আলীর। রাজ্জাকের লিপে ছিল গানটি। আমজাদ হোসেন সব সময়ই একটি গল্প মাথায় রেখে প্রথমে একটা গান রেকর্ড করে নেন। তারপর ওই গানটা সারাক্ষণ ওনার কানের কাছে বাজতে থাকে। আর পুরো সিনেমার গল্পটা আস্তে আস্তে করে তিনি লিখতে থাকেন। এটা তার সারাজীবনের অভ্যাস। এই গানটিও এভাবেই তৈরি।

আমি আছি থাকব ভালোবেসে মরব

শিল্পী : সাবিনা ইয়াসমিন

গীতিকার : আমজাদ হোসেন

আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘সুন্দরী’ ছবির গান। এ গানের সুরকার আলাউদ্দীন আলী। ছবির প্রেক্ষাপট অনুযায়ী গানটি তৈরি করা। এ গানটি করতে আমজাদ হোসেনের সঙ্গে চার-পাঁচদিন বসতে হয়েছেন আলাউদ্দীন আলীর। গানের স্থায়ীটুকু লিখতেই লেগেছে দুইদিন। ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে গানটির রেকর্ডিং হয়েছিল। ছবিতে দেখা যায়, ববিতা গানটি করছেন। রোমান্টিক এই গানটির সঙ্গে নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন তালে তালে লাঠি খেলছেন।

আমার বুকের মধ্যিখানে

শিল্পী : এন্ড্রু কিশোর ও সামিনা চৌধুরী

বেলাল আহমেদ পরিচালিত ‘নয়নের আলো’ ছবির গান। এ ছবির সবগুলো গান সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন বুলবুল। তার পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীত পরিচালনায় প্রথম ছবি ছিল ‘নয়নের আলো’। তখন সৈয়দ আবদুল হাদী, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন প্লেব্যাকে ভীষণ ব্যস্ত। বুলবুলের স্বপ্ন ছিল, গানগুলো বড় মাপের শিল্পীদের দিয়ে গাওয়াবেন। কিন্তু ছবির প্রযোজক বললেন, আপনি নতুন, বাজেট কম। তাই নতুন শিল্পী দিয়েই গানগুলো করেন। অগত্যা তখন এই গানটি এন্ড্রু কিশোর আর সামিনা চৌধুরীকে দিয়ে গাওয়ানো হয়। ছবির বাকি গানগুলোও এই দুজন শিল্পীই গেয়েছিলেন।

যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে জীবনে

শিল্পী : খালিদ হাসান মিলু ও কনকচাঁপা

মহম্মদ হাননান পরিচালিত ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’ ছবির গান। কনকচাঁপা আর খালিদ হাসান মিলু গেয়েছিলেন। এ গান গাওয়ার দিন শ্রæতি স্টুডিওতে ২০ জনের জন্য খাবার রান্না করে নিয়ে গিয়েছিলেন কনকচাঁপা। কারণ সে দিন বুলবুল রান্না খেতে চেয়েছিলেন কনকচাঁপার কাছে। রেকর্ডিংয়ের সময় মিলুর কণ্ঠে বারবার নাকি আপ্লত হয়ে যাচ্ছিলেন কনকচাঁপা।

তুমি আমার এমনই একজন

শিল্পী : কনকচাঁপা

শিবলী সাদিক পরিচালিত ‘আনন্দ অশ্রæ’ ছবির গান। ১৯৯৭ সাল হবে। গানটি সালমান শাহ অভিনীত ‘আনন্দ অশ্রæ’ সিনেমার। এই গানেরও গীতিকার ও সুরকার ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। গানটি গাইতে গিয়ে খুবই আবেগাপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন কনকচাঁপা। এক পর্যায়ে আমার প্রচণ্ড কান্না চলে আসছিল। কিন্তু কাঁদলে গলা বসে, তাই কান্না অনেক কষ্টে আটকে রেখেছিলেন। দ্বিতীয় অন্তরার পুরোটা টেকে কেঁদেছেন।

প্রেমের তাজমহল

শিল্পী : মনির খান ও কনকচাঁপা

গাজী মাহবুব পরিচালিত ‘প্রেমের তাজমহল’ ছবির গান। এটির জন্য দ্বিতীয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন কনকচাঁপা। এতে তার সহশিল্পী ছিলেন মনির খান। তিনিও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান এই গানের জন্য। এই গানও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাইয়ের কথা ও সুর করা।

অনেক সাধনার পরে আমি

শিল্পী : খালিদ হাসান মিলু ও কনকচাঁপা

মহম্মদ হাননান পরিচালিত ‘ভালোবাসি তোমাকে’ ছবির গান। এই গানের বেশ মজার একটি ঘটনা আছে। গানটির ব্রিজলাইনের একটা জায়গায় যখন ‘ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি তোমাকে’ গাইছিলেন, তখন বুলবুল বকা দিয়ে বললেন, ‘কী ব্যাপার! প্রেম করেননি? মইনুল না… প্রেমাষ্পদকে ভেবে এ লাইনটা গেয়ে দেন।’ কনকচাঁপা তো হেসেই মরেন। পরে দেখেন, খালিদ হাসান মিলু ঠিকঠাকই গেয়ে দিলেন! বুলবুল তখন বললেন, ‘দেখছেন! মিলু আগেই অন্য কাউকে ভেবেছে’। শাবনূর-রিয়াজ অভিনীত ‘ভালোবাসি তোমাকে’ ছবির এই গানটির কারণেই ছবির জনপ্রিয়তা বেড়ে গিয়েছিল।

অনন্ত প্রেম, তুমি দাও আমাকে

শিল্পী : আইয়ুব বাচ্চু ও কনকচাঁপা

কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘লুটতরাজ’ ছবির গান। লিপে ছিলেন প্রয়াত নায়ক মান্না ও মৌসুমী। কণ্ঠশিল্পী ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু ও কনকচাঁপা। আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে কোনো চিন্তার সুযোগ ছিল না! তবে কনকচাঁপা পারবেন কিনা, এটা নিয়ে কনকচাঁপার স্বামী মইনুল ইসলাম খান চিন্তায় অস্থির! কনক স্বামীকে বলেন, ‘এত চিন্তা কিসের?’ কে শোনে কার কথা! ছবির গানের এক্সপ্রেশন নিয়ে নিজের ক্ষমতা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা আছে ছিল কনকচাঁপার। পরে গানটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।

:: মেলা প্রতিবেদক

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj