সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশা : সিরাজগঞ্জে খানাখন্দে ভরা আঞ্চলিক ও মহাসড়কগুলো

শনিবার, ১২ আগস্ট ২০১৭

সারাদেশের আঞ্চলিক ও মহাসড়কগুলোর এখন করুণ দশা।নিম্নমানের কাজ ও সাম্প্রতিক বৃষ্টি-বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক নির্মাণ বা মেরামতের কোনো উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। খানাখন্দে ভরা এসব রাস্তায় এখন যানবাহন চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে আছে তীব্র যানজট। সামনে কুরবানির ঈদ। সে সময় পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে পড়বে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মহাসড়কগুলোর হাল-অবস্থা নিয়ে আমাদের বিশেষ আয়োজন

হেলাল উদ্দিন, কাগজ প্রতিবেদক, সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) মহাসড়ক শুধু নয়, আঞ্চলিক সড়কেরও বেহাল অবস্থা। ঢাকা-মহাসড়ক, হাটিকুমরুল বনপাড়া-মহাসড়ক ও বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম মহাসড়ক, নলকা-সিরাজগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কসহ সিরাজগঞ্জের মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলো খানাখন্দে ভরা, এবড়ো-থেবড়ো। এসব রাস্তায় চলাচলকারীদের ভোগান্তির শেষ নেই।

আসন্ন কুরবানির ঈদেও বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়ে সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদ-নলকা-হাটিকুমরুল মহাসড়কে যানজটে ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন ঢাকা-উত্তরাঞ্চলগামী যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। গত ঈদুল ফিতরেও এখানে ভোগান্তি ছিল। বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে হাটিকুমরুল মোড় পর্যন্ত প্রায় ১৯ কিলোমিটার মহাসড়কে ধীরগতি, যানজট ও চালক-যাত্রীর বিড়ম্বনা পিছু ছাড়ছে না। বরাদ্দ নেই এমন অজুহাতে কয়েক বছর ধরেই সওজের রাস্তা সংস্কার ও মেরামত কাজে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। জোড়াতালির কাজ সারাবছর চললেও নেই টেকসই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও উদ্যোগ। মাঝে মাঝে মন্ত্রী ও সওজের বড় কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এলে শুধু তড়িঘড়ি মেরামত করা হয়। কর্মকর্তারা চলে যাওয়ার কয়েকদিন পরই আবার সেই পুরনো চিত্র। জেলা মাসিক উন্নয়ন সভায় একাধিকবার এসব সড়ক নিয়ে সওজের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা।

পরিকল্পনা থাকলেও বরাদ্দ নেই, এমন কথা বলে পাশ কাটিয়ে যান সওজের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা। এলাকা ঘুরে ও তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ জেলার হাটিকুমরুল মোড়, উল্লাপাড়া, চান্দাইকোনা-ঘুড়কা ও হাটিকুমরুল-বনপাড়া সড়কের মহিষলুটি-খালকুলা মহাসড়কের বিটুমিন ও পাথরের মিশ্রণ উঠে গেছে। হাটিকুমরুল মোড়ে কয়েক মাস আগে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করার এক সপ্তাহ পর নতুন করে খানাখন্দ দেখা দেয়। এসব মহাসড়ক দিয়ে ঢাকা, উত্তরবঙ্গ, রাজশাহী ও খুলনার দিকে প্রতিদিন প্রায় ১৪-১৫ হাজার যানবাহন চলাচল করে। জেলার বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক সড়কেরও একই অবস্থা। সয়দাবাদ-বেলকুচি-এনায়েতপুর সড়কের উপরিভাগের পাথর ও বিটুমিনের মিশ্রণ উঠে গিয়ে শতাধিক ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। একই অবস্থা শিয়ালকোল-নলকা, তাড়াশ-রানীহাটি-বারুহাস, তাড়াশ-নিমগাছী-ভুইয়াগাঁতী, উল্লাপাড়া-লাহিড়ী মোহনপুর আঞ্চলিক সড়কেও। মহাসড়কগুলোর বেহাল অবস্থায় বঙ্গবন্ধ সেতুু পশ্চিম মহাসড়কে যানজট থাকুক আর না থাকুক শর্টকার্টে সিরাজগঞ্জ শহরের বাইপাস সড়ক (নলকা খেকে সিরাজগঞ্জ শহর হয়ে সয়দাবাদ) দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪/৫ হাজার ভারী যানবাহন চলাচল করছে।

এ কারণে জেলা শহরের বাজার স্টেশনে লতিফ মির্জা সড়কে, বাজার স্টেশনের সামনে, শহরের খেদনসর্দার মোড়ের, মালশাপাড়া কবরস্থানের সামনে, ছোট বড় খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া জেলা সদরের চাঁদ আলীর মোড় থেকে যমুনার সার ঘাট, বালুর পয়েন্ট ও কয়েকটি ফ্লাওয়ার মিল থাকায় এই রাস্তায় ভারী যানবাহন প্রতিনিয়ত চলাচলের কারণে হোসেনপুর দক্ষিণ স্কুলের সামনে হাঁটু সমান গর্ত পানিতে সারাবছরই ডুবে থাকে। এ কারণে এখানে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত রোজার ঈদের আগে প্রায় ২ কোটি টাকা খরচ করে সড়কটির হাটিকুমরুল মোড়ে সংস্কার কাজ করা হলেও এক সপ্তাহের মাথায় আবারো চলাচল অনুপযোগী হয়ে যায়। ঈদ এলেই প্রতিবছর এ ধরনের সংস্কার কাজ করা হয়। সিরাজগঞ্জ জেলা যুবলীগের অর্থ সম্পাদক তারিক ইনাম পুলক অভিযোগ করে বলেন, সদর উপজেলার এটিই একমাত্র রাস্তা হওয়ার কারণে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যানসহ উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা এ বিপজ্জনক রাস্তা ব্যবহার করলেও, এ রাস্তা সংস্কারের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ কেন উদাসীন তা আমাদের বোধগম্য নয়। সিরাজগঞ্জের সড়ক ও জনপদ বিভাগের আঞ্চলিক সড়কগুলোর বেহাল অবস্থাই নয়, বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম মহাসড়কজুড়ে শুধু খানাখন্দে ভরা।

বরাদ্দ নেই, তবুও বছরের পর বছর ধরে সওজের রাস্তা সংস্কার, মেরামত ও জোড়াতালির কাজ চললেও নেই কোনো টেকসই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও উদ্যোগ।

বেলকুচি পৌরসভার মেয়র বেগম আশানুর বিশ্বাস জানান, বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়ে সয়দাবাদ থেকে বেলকুচি পৌরসভা হয়ে এনায়েতপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার রাস্তায় শতাধিক স্থানে ছোট-বড় গর্তের কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে।

উল্লাপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট মারুফ-বিন-হাবিব বলেন, হাটিকুমরুল মোড় থেকে বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়কে শ্যামলীপাড়া পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার রাস্তারই বেহাল দশা। বছরজুড়েই সওজ এ মহাসড়কে জোড়াতালির সংস্কার কাজ চালালেও বর্তমানে খানাখন্দে ভরা। উল্লাপাড়া-লাহিড়ী মোহনপুর আঞ্চলিক সড়কের বিষয়েও সওজ প্রকৌশলীরা কয়েক বছর থেকে উদাসীন রয়েছেন।

সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ বিশ্বাস বলেন, জেলার বেলকুচি, উল্লাপাড়া ও রায়গঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কসহ বগুড়া-নগরবাড়ীর মহাসড়কে সওজের উদাসীনতার কারণ কী, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

সড়ক ও জনপথ উল্লাপাড়া সাব-ডিভিশনের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম জানান, সড়ক সংস্কার কাজ শিগগির শুরু হবে। সিরাজগঞ্জ সদর-বেলকুচি সাব ডিভিশনের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আনোয়ার পারভেজ জানান, সয়দাবাদ-বেলকুচি-এনায়েতপুর, সিরাজগঞ্জ-কড্ডা ও কড্ডা-সমেশপুর আঞ্চলিক সড়ক মেরামত ও সংস্কারে প্রায় ২৭ কোটি টাকার প্রকল্প দেয়া হলেও তা এখনো পাস হয়নি। হাটিকুমরুল মোড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪টি সেকশন বা ভাগে ‘ক্লোভার-লিফ’ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নলকা থেকে সিরাজগঞ্জ শহর হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়ে মুলিবাড়ি পর্যন্ত চারলেন রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

এদিকে গত বুধবার দুপুরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আকস্মিক সফরে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকা মহাসড়ক পরিদর্শন করেন। মহাসড়কের বেহাল অবস্থা ও ৬ কোটি টাকার খানাখন্দে সংস্কার কাজে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে সিরাজগঞ্জ সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হেনা মোস্তফা কামালকে প্রত্যাহার ও একই সঙ্গে রাজশাহী জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রওশন আলী এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ার নির্দেশ দিয়ে মন্ত্রী সওজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সতর্ক করেন। মন্ত্রীর নির্দেশ, আগামী ১০ দিনের মধ্যে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বারের সব মহাসড়কে খানাখন্দ সংস্কার করতে হবে। তা না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মন্ত্রীর কড়া নির্দেশে সওজ বিভাগের কর্মকর্তারা দ্রুত মহাসড়ক সংস্কার কাজ শুরু করেছে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj