চন্দ্রদ্বীপ

শুক্রবার, ৯ জুন ২০১৭

** বাশার মাহমুদ **

আমাদের আজকের ‘মাদারীপুর’ নামক স্থানটি হাজার বছর আগে কেমন ছিল দেখতে অর্থাৎ এর প্রাকৃতিক শোভা-রূপ কেমন ছিল তখন, কোথায় ছিল ভৌগোলিক অবস্থান এবং নামই বা ছিল কী ইত্যাদি সব নানান প্রশ্ন বালক বেলায় ভাবিয়ে তুলতো আমাকে।

আরো একটু বড় হয়ে জানতে পারলাম, কোনো এক বনভূমির পাশে নদীর তীরে গড়ে ওঠা একটি বন্দর ও নগর সভ্যতার কথা। সে তো আনুমানিক আড়াইশ থেকে তিনশ বছর আগের কথা।

আরো বড় হয়ে সেইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জনশ্রæত ও ঐতিহাসিক সূত্র মতে জানতে পারলাম, অবাক করা রূপকথার গল্পের মতো এক বিশাল কাহিনীচিত্র।

অনেক অনেক বছর আগে এই বনভূমি বা গভীর অরণ্য এলাকাটি ছিল আক্রোশি ঢেউ আর উত্তাল তরঙ্গায়িত জলরাশি। দেখে মনে হবে যেন ভিনদেশী রূপসী এক সাগর কন্যা। অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরের বর্ধিত সপ্তমি চাঁদের মতো অর্ধবৃত্তাকার এ অংশটিই সাগর কন্যা।

কালক্রমে বঙ্গোপসাগরের উত্তর সীমানার এ এলাকার আকস্মিক ভৌগোলিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। ফলে যৌনবতি সাগর কন্যা এক সময় যৌবন হারিয়ে রুগ্ণ দেহে ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে যেতে যেতে মাতৃগর্ভে লীন হয়ে যায়, প্রকৃতির কি অদ্ভুত খেয়াল, উত্তাল জলরাশির বিশাল এলাকাজুড়ে এক সময় জেগে ওঠে চাঁদের আলোর মতো শাদা বালুচর। কে যেন মুগ্ধমনে ভালোবেসে এ বালুভূমির নামকরণ করেছিল চন্দ্রদ্বীপ।

তবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে চন্দ্রদ্বীপ নামটির পরিবর্তন ঘটে ভিন্ন ভিন্ন নামে, বিভিন্ন সময়ে। কখনো একে অভিহিত করা হয় বাকলা বা বাকলা রাজ্য নামে, কখনো সেলিমাবাদ, আবার কখনো বাকেরগঞ্জ নামে।

এক সময় চন্দ্রদ্বীপ রূপ নেয় তৃণভূমি আর জলাশয়ে। অনেকদিন বাদে প্রাকৃতিক বিবর্তনে সৃষ্টি হয় বনভূমি, এই বনভূমির কথাই এখন বলবো।

গভীর অরণ্য। ঘন বন-জঙ্গল। গা থমথমে ভৌতিক জনশূন্য বিরান বনভূমি। হিংস্র জীবজন্তুর অবাধ বিচরণ, গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার, শহর-নগর-জনপদ কিছুই নেই এর ধারেকাছে। শুধুমাত্র আছে নদী, জলাশয় আর অরণ্য।

আনুমানিক ৮০০ বছর আগে এক পথিক এলেন জনমানবহীন এই অরণ্যে। সাথে মাত্র কয়েকজন সহযাত্রী।

তখন ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলীয় বঙ্গের শাসক বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেন ১১৭৯ খ্রি. ৬০ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন। তার সময়ে মুহাম্মদ ঘোরীর সুযোগ্য সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি ১২০৪-০৫ খ্রিস্টাব্দে নদীয়া আক্রমণ করে বিনা যুদ্ধেই লক্ষণ সেনকে বিতারিত করে সেনরাজ্য অধিকার করেন এবং সেই সঙ্গে ভারতবর্ষের অধীন বর্তমান রাজশাহী ও মালদহ জেলার গৌড় বা লক্ষণাবতীর দেবকোটে বঙ্গের রাজধানী স্থাপন করে শাসনকার্য শুরু করেন। ঠিক এমনি একটা সময়ে ভারতের কানপুর থেকে হাঁটতে হাঁটতে দেবকোট হয়ে ঢাকার সোনারগাঁওয়ের ভিতর দিয়ে আরো দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে পদ্মানদী পাড় হয়ে পথ চলতে গিয়ে কী ভেবে যেন পথিক থমকে দাঁড়ালেন তৎকালীন বঙ্গের বাকলার উত্তর সীমানায় একটি গভীর অরণ্য দেখে। পথিক এগুতে থাকেন বনের গভীরে। জনশূন্য বিরান বনভূমি, সহযাত্রীদের অভয় দিয়ে ক্ষণিকের অতিথি হয়ে কয়েকদিন বা কিছু সময় কাটালেন এ গভীর অরণ্যে। পায়ের চিহ্ন রাখলেন মাটিতে, হাতের স্পর্শ রাখলেন গাছে। কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে পথিক আবার ফিরে গেলেন ভারত উপমহাদেশ হয়ে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে ঘুরে অবশেষে তার আস্তানা কানপুরের মাখনপুর শরীফের নিমতলীয় এসে এই পথিক ‘জিন্দাপীর’ হয়ে ইহজগৎ ত্যাগ করেন। সেই নিমতলায়ই তার মাজার রয়েছে। এছাড়া বঙ্গের চন্দ্রদ্বীপ বা বাকলা রাজ্যের উত্তরে গহিন বনে যেখানে পথিক তাঁর পদচিহ্ন রেখে গিয়েছিলেন বর্তমান মাদারীপুর শহরের উপকণ্ঠে সে স্থানটি হযরত শাহমাদার (র.) এর দরগাহ শরিফ যা দরগাহ খোলা নামে পরিচিত।

ঐতিহাসিক সূত্র মতে, ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন ঢাকার বিক্রমপুরের জমিদার ভূমিহীন প্রজাদের পুনর্বাসন, জমিদারি এলাকা সম্প্রসারণ, খাদ্য-শস্য ও অর্থকরী ফসল উৎপাদন, খাজনা টোল রাজস্ব আদায় ইত্যাদি উদ্দেশ্যে চন্দ্রদ্বীপ বা বাকলার গহিন বনাঞ্চলের কিছু অংশ জরিপ করে আবাদ-আবাস যোগ্য করার লক্ষ্যে রায়তি বন্দোবস্তের মাধ্যমে বিভিন্ন পেশাজীবী লোকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া জেলে, তাঁতি, কামার-কুমার, ধোপা-নাপিত, ভুঁইমালিসহ ধর্মীয় বিধি-বিধান অনুসারে আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা দিতে মুসলমানদের জন্য মোল্লা-মুন্সি ও হাজাম-খলিফা এবং হিন্দুদের জন্য ব্রাহ্মণ, ঠাকুর-পুরোহিত ইত্যাদি সম্প্রদায়ের লোকদের পত্তন দেয়া হয়। ফলে নদীমাতৃক দেশে নৌযান-পণ্যবাহী, যাত্রীবাহী নৌকাঘাট, স্টিমার ঘাট অর্থাৎ নদী তীরবর্তী স্থান রূপ নিতে থাকে গঞ্জ বা নদীবন্দরে এবং বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে হাট-বাজার, ব্যবসা কেন্দ্র ও নগর-জনপদ। যে কারণে জরিপ দলের নৌকা ভিড়ানো স্থানকে শাহমাদারের ঘাট নামে আখ্যায়িত করে জরিপ কাজ শুরু করে।

জরিপের পরে ওই নৌকা ঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নগরী অতঃপর নগর সভ্যতা। পরবর্তীতে ঘাট কেন্দ্রিক এ অঞ্চলটি মাদার বা মাদারন হাট-বাজার, গ্রাম, মাদারন ইউনিয়ন-থানা ইত্যাদি নামে অভিহিত হতে থাকে।

আনুমানিক ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে মাদরন গ্রাম, ইউনিয়ন, থানা পরিষদ প্রায় ১০০ বছর পর অর্থাৎ ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে মাদার বা মাদারনকে মাদারীপুর নামকরণ পূর্বক সাব-ডিভিশন বা মহকুমায় রূপান্তর করা হয়। উল্লেখ্য, ১৭৭২-১৮৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই এলাকাটি প্রায় ১০০ বছর বাকেরগঞ্জ জেলাধীন থাকে।

প্রসঙ্গত বলা যায়, বাকেরগঞ্জ এলাকাটি অনেক অনেক বছর আগে চন্দ্রদ্বীপ, বাকলা, সেলিমাবাদ ইত্যাদি নামে পরিচিত ছিল। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ঢাকার মুগল প্রশাসনের অন্যতম সেনা কর্মকর্তা আগা বাকেরের নামানুসারে এ জেলার নামকরণ করা হয় বাকেরগঞ্জ। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিভিন্ন সময়ে এ জেলার সীমারেখার রদবদল ঘটে।

ইংরেজ কোম্পানি শাসন আমলে চন্দ্রদ্বীপের বনভূমি, জলাশয় ও প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহকে বিভিন্ন নামে কয়েকটি পরগনায় বিভক্ত করা হয়। ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে আগা বাকের বুজুর্গ উমেদপুর পরগনার জায়গির লাভ করেন।

কথিত আছে, চন্দ্রদ্বীপের দক্ষিণ সীমান্তে সমুদ্র তীরবর্তী উক্ত এলাকায় পর্তুগিজ জলদস্যুদের উৎপাত-উপদ্রব দমন করে আগা বাকের সেখানে প্রথমে একটি ব্যবসা কেন্দ্র বা হাট-বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন সময়ে ব্যবসা কেন্দ্র বা হাট-বাজার শব্দটির পরিবর্তে তাদের আঞ্চলিক ভাষায় ‘গঞ্জ’ শব্দটি ব্যবহার করতেন। সেই সাথে প্রতিষ্ঠাতার নামের সাথে যুক্ত করে ওই এলাকা বা স্থানটির নামকরণ করতেন। যেমন- আগা বাকের কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হাট-বাজারকে বলা হতো বাকেরগঞ্জ। পরবর্তীতে উক্ত বুজুর্গ উমেদপুর পরগনার আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে বাকেরগঞ্জ নামে একটি জেলা গঠন করা হয়। একে জেলা হিসেবে ঘোষণা করেন ঢাকার তৎকালীন ইংরেজ প্রশাসক স্যার জন.শো।

তখন বাকেরগঞ্জ, পটুয়াখালী, মাদারীপুর (বর্তমান শরীয়তপুর জেলাসহ), কোটালিপাড়া (গোপালগঞ্জের অংশ), কচুয়া (বাগেরহাটের আংশিক), মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাটের আংশিক) ও ভোলা ইত্যাদি এলাকা নিয়ে বাকেরগঞ্জকে পূর্ণাঙ্গ জেলা গঠন করা হয়। তখন বাকেরগঞ্জ জেলাটি ঢাকার বিক্রমপুরের নায়েব-ই-নাজিম নওয়াব নূসরত জঙ্গ কর্তৃক শাসিত ছিল। বাকেরগঞ্জ জেলার সঙ্গে মাদারীপুর থানা পরিষদের প্রায় ১০০ বছরের ভৌগোলিক, প্রশাসনিক, সামাজিক এবং আঞ্চলিক কৃষ্টি-সংস্কৃতি ইত্যাদি সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর নামক নতুন একটি জেলায় স্থানান্তর করা হয় এবং ৪ বছর পর অর্থাৎ ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে মাদারীপুর থানা পরিষদকে সাব-ডিভিশন বা মহকুমায় রূপান্তরিত করা হয়।

মাদারীপুরকে ফরিদপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত করার ২৫ বছর পর অর্থাৎ ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা মিউনিসিপ্যালিটির নিয়ন্ত্রণাধীন মাদারীপুর মিউনিসিপ্যাল কমিটি স্থাপিত হয়। যা পরবর্তীতে মাদারীপুর পৌরসভা নামে আখ্যায়িত করা হয়।

উল্লেখ্য, মাদারীপুর নগরীকে মিউনিসিপ্যাল কমিটিতে উন্নীত করায় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে বিহার-উড়িষ্যা থেকে হরিজন সম্প্রদায়ে (মেথর-সুইপার) লোক এনে নির্ধারিত স্থানে পুনর্বাসন দিয়ে পেশাভিত্তিক কাজে নিয়োজিত করা হয়। এছাড়া নাগরিকদের নিরাপত্তা ও চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিশেষ পন্থায় কেরোসিনের ‘পিদিম’ জ্বেলে শহর আলোকিত করার ব্যবস্থা করা হয়। (আমার লেখা বাতিওয়ালা অধ্যায়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে)।

ভারত বর্ষে ইংরজ শাসনের অন্যতম প্রশাসক লর্ড ডালহৌসির আমলে অর্থাৎ ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন বঙ্গদেশে ফরিদপুর নামক একটি জেলার সৃষ্টি হয়। যদিও এই এলাকাটির এর আগে প্রায় ৬০ বছর পর্যন্ত ঢাকার জালালপুর পরগনা নামে পরিচিত ছিল।

ঐতিহাসিকদের মতে, আরো পূর্বে ফরিদপুর (জালালপুর পরগনা) এলাকাটির নাম ছিল ফতেহাবাদ বা সরকার ফতেহা। এই ফতেহাবাদের প্রধান নগরীর নাম ছিল ভূষণা। তবে মুগল আমলে সমগ্র বঙ্গকে কয়েকটি পরগনায় বিভক্ত করা হয়, এদের মধ্যে ফতেহাবাদ পরগনা বা সরকার ফতেহাকে পরবর্তীতে শেখ ফরিদের নামানুসারে ফরিদপুর এবং মাদারন বা সরকার মাদারকে শাহমাদারের নামানুসারে মাদারীপুর নামকরণ করা হয়।

পণ্ডিতরা মনে করেন, চতুর্দশ শতাব্দীতে চন্দ্রদ্বীপে মাদার বা মাদারন নামে একটি বিশাল বনাঞ্চল ছিল। যা রাজা রাজ্য শশাঙ্ক হর্ষবর্ধনের ধর্মগুরু সুফি নজিব মাজহারী এ অঞ্চলটির নামকরণ করেন প্রখ্যাত সুফি সাধক শাহ সাইয়েদ বদিউদ্দিন শাহমাদার বা বদিউদ্দিন শাহ-ই-মাদারের নামানুসারে মাদার বা মাদারন। পরবর্তীতে হযরত শাহমাদার (র.) দরগাহ বা বিশ্রামের স্থানটিকে পুরি বা চিরশান্তির স্থান আখ্যায়িত করে মাদারীপুর নামকরণ করা হয়।

চন্দ্রদ্বীপের উত্তর সীমান্তে পদ্মা নদীর শাখা আড়িয়াল খাঁ নদ তীরবর্তী গহিন বনাঞ্চলের নৌকাঘাট কেন্দ্রিক বন্দর-নগর-জনপদ এলাকাটিই আজকের ‘মাদারীপুর’ জেলা।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj