বিশ্বের বিস্ময় আমার বাংলাদেশ : বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৬

ঝর্ণা মনি : ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার / সারা বিশ্বের বিস্ময় তুমি আমার অহংকার।’ একাত্তরে ইস্পাতদৃঢ় দেশপ্রেম, সাম্য, মৈত্রী আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে গর্জে উঠেছিল বাংলাদেশ। আঁধারের বুক চিরে ছিনিয়ে এনেছিল ভোরের সূর্যোদয়। বিজয়ের গৌরবে কেঁপে উঠেছিল ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল। আর বিজয়ের চার দশক পরে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোলমডেল। কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র বদনাম ঘুচিয়ে বাংলাদেশ আজ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের আগেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে লাখো শহীদের রক্তস্নাত সোনার বাংলা।

ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধেও স্বপ্ন-চেতনা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। সমাজ, অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সামনে একটাই চ্যালেঞ্জ জঙ্গিবাদ-মৌলবাদমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা। আর এই মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সরকারের জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ দমনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ভূয়শী প্রশংসা করছে বিশ্ব। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্থনীতির সূচকগুলো দেখলেই আঁচ করা যায়। এই অগ্রগতি দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখছে। এক সময়ের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির উদীয়মান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতিসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন হয়েছে,

যা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) পূরণের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে। উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আজ দৃষ্টান্ত। সা¤প্রতিক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন ও সূচকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশের চিত্রটি বারবার তুলে ধরা হয়েছে।

জাতিসংঘ ও বহুজাতিক দাতা সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম প্রবৃদ্ধির দেশ হিসেবে বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ৭ দশমিক ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে ইরাক শীর্ষে এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়ে ভারতের অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে।

দেশের নাগরিকদের সন্তুষ্টি, গড় আয়ু, পরিবেশের ওপর প্রভাব ও বৈষম্য- এ চার মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়ে সুখী দেশের তালিকা তৈরি করা হয়। তার প্রতিটি সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান ইতিবাচক। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বকে চমকে দেয়ার মতো সাফল্য আছে বাংলাদেশের। এর মধ্যে শিক্ষা সুবিধা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার এবং জন্মহার কমানো, গরীব মানুষের জন্য শৌচাগার ও স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম অন্যতম। শুধু এসব খাতেই নয়, মানবাধিকারের সব খাতেই বাংলাদেশ এখন অগ্রগামী। বাংলাদেশ স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা খাতের উন্নয়নে অনেক দূর এগিয়েছে এবং এগিয়ে যাচ্ছে। নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে বর্তমানে বিভিন্ন স্তরে মেয়ে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে। পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ দেশ। বর্তমানে আবাসন, জাহাজ, ওষুধ প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্য, শিল্প, অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নারী ও শিশু উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জ্যামিতিক গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ : গত ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদনে অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির পরিমাণ ৭ দশমিক ১১ শতাংশ- যা গত ছয় বছরের জিডিপি বিবেচনায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল এক নিদর্শন। আগের দুই অর্থবছরে অর্জিত জিডিপি ছিল যথাক্রমে ৬ দশমিক ৬ এবং ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০০৬-০৭ অর্থবছরের পর প্রথমবারের মতো জিডিপি ৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। নতুন পে-স্কেলের সূচনা, সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ্য ভাতা, আয় সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের বিস্তার এবং অন্যান্য মধ্যবর্তিতা ইত্যাদি উদ্যোগের ফলে জনগণের প্রকৃত আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালে মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ২ হাজার মার্কিন ডলারে।

২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে দারিদ্র্যমুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হওয়া। সেই পথ ধরে ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার রূপরেখাও আছে। এই চ্যালেঞ্জ অর্জন করতে বিশাল কর্মযজ্ঞ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। সেই লক্ষ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে চলেছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৭৫টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদনও দেয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, গত ৪৫ বছরে যে হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, আগে কখনো তা ঘটেনি। দারিদ্র্য সীমার হার কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। ১৯৭০ সালে আমাদের দারিদ্র্যতার হার ছিল ৭০ শতাংশ, তা কমে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৩১ শতাংশে।

মাথাপিছু আয় ৭০ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৪ ডলারে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ২২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। শিশু মৃত্যুহার কমানোর স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ পুরস্কার অর্জন করেছে বাংলাদেশ। মানুষের গড় আয়ু চার দশকের ব্যবধানে ৫০ থেকে বেড়ে ৬৯ বছরে দাঁড়িয়েছে। এ গড় আয়ু ভারতের চেয়ে চার বছর বেশি।

৪৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অর্জন অনেক; মন্তব্য করে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা প্রবৃদ্ধির মাত্রা বাড়াতে পেরেছি। অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে আমরা শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে পেরেছি। খাদ্য নিরাপত্তা বেড়েছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় হয়েছে। উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। তবে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা ১ কোটি মানুষকে ন্যূনতম জীবনমানের আওতায় এনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কাক্সিক্ষত ৮ মাত্রায় উন্নীত করার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ উন্নœয়নে লক্ষ্যমাত্রা : বিদ্যুৎ উৎপাদনে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে বর্তমান সরকার। চলতি বছরের পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী আগামী ২০৪১ সাল নাগাদ দেশে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের লক্ষ্য ধরা হয়েছে এক হাজার ৫০০ কিলোওয়াট ঘণ্টা। পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান (পিএসএমপি) এ প্রতিবছর ৬০ মিলিয়ন টন কয়লা, ৩০ মিলিয়ন টন জ্বালানি তেল এবং প্রতিদিন চার হাজার মিলিয়ন কিউবিক ফিট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির কথা বলা হয়েছে। এছাড়া কম জায়গা ব্যবহার করে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর এ মাস্টারপ্ল্যানে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় ২০২১ সালে ২৪ হাজার মেগাওয়াট, ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াট ও ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তাছাড়াও মোট সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ২০২১ সালের মধ্যে ১৯ হাজার সার্কিট কিলোমিটার এ উন্নীত করার পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ২০২১ সালের মধ্যে দেশের সব অবিদ্যুৎতায়িত গ্রামে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছানোর লক্ষ্যে আরো ১ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার নতুন বিতরণ লাইন নির্মাণের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির বাংলাদেশ সফর ছিল মাত্র ৯ ঘণ্টার জন্য। এর মধ্যে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপিনেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তিনি বাংলাদেশের অগ্রগতি স্বচক্ষে দেখে বিস্মিত হয়েছেন। প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন।

নারীর ক্ষমতায়ন : গত ২৫ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। আর এইচ এম এরশাদ সরকারের সময় থেকেই প্রায় সাড়ে তিন দশক বিরোধী দলের নেতৃত্বেও আছেন তারা। গত নির্বাচনের পর থেকে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদও যুক্ত হয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকায়। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দলের নেতাও নারী। জাতীয় সংসদের উপনেতা, স্পিকার, একাধিক মন্ত্রী, এমপি, সচিব, রাষ্ট্রদূত, ব্যাংকের এমডির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করছেন তারা।

বিশ্বে আর কোনো দেশের রাজনীতিতে নারীর এত উচ্চাসন নেই। এর স্বীকৃতি মিলছে বিশ্বজুড়েও। নারীর ক্ষমতায়নে অনন্য অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ এবং ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ এ ভূষিত করেছে জাতিসংঘ। এছাড়া হার্ভার্ড ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে করা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে রাষ্ট্রক্ষমতায় নারীর অবস্থান বিবেচনায় সবাইকে পেছনে ফেলে বিশ্বের এক নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। জার্মানির অবস্থান এ ক্ষেত্রে ১২, আর যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে ৬৪ নম্বরে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ অনেক উন্নত দেশকেও পেছনে ফেলেছে। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ সূচকে দেশের অবস্থান নবম এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অষ্টম।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারীর অগ্রগতির নানা সূচকে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে সার্বিক বিবেচনায় নারী উন্নয়নে বিশ্বের ১৪৫টি দেশের মধ্যে এবার বাংলাদেশ জায়গা করে নিয়েছে ৬৪ নম্বরে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন মতে, নারী শিক্ষায় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে নন্দিত। প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিশু ভর্তির হার বিবেচনায় বিশ্বে এ দেশের অবস্থান আরো ৬২টি দেশের সঙ্গে সমন্বিতভাবে প্রথম।

ডিজিটাল বাংলাদেশ স্বপ্ন নয়, সত্যি : ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন স্বপ্ন নয়, সত্যিই। ৫ হাজার ২৭৫টি ডিজিটাল সেন্টার ইতোমধ্যে চালু করা হয়েছে। এ বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, দেশে এখন ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসা ও চাকরির পরিধি বাড়ছে। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি ডিজিটাল সেন্টার থেকেও ইন্টারনেটভিত্তিক উদ্যোক্তা গড়ে উঠছেন। দেশে এই মুহূর্তে ৭ লাখ তরুণ-তরুণী ইন্টারনেটে ব্যবসা করছেন বলেও তিনি জানান। প্রতিমন্ত্রী আরো জানান, দেশে ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসার স¤প্রসারণের জন্য এখন ৩৪ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এরাই দেশে-বিদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নেতৃত্ব দেবে।

বাস্তবের পথে পদ্মা সেতু : পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি এখন প্রায় ১৮ শতাংশ। এরই মধ্যে মূল সেতুর টেস্ট পাইল স্থাপনের কাজ শুরু হয়ে গেছে এবং নদীর তীর রক্ষার ড্রেজিংয়ের কাজ চলছে দ্রুতলয়ে। সরকারের ফাস্টট্র্যাক প্রকল্পের মধ্যে এক নম্বরে থাকা এ প্রকল্পটির কাজে যেন কোনো অনিয়ম না হয় সেদিকে নজর রাখছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। নির্ধারিত সময়ের এক বছর আগেই যাতে সেতুটি বাস্তবায়ন করা যায় সেদিকেই খেয়াল রাখা হচ্ছে। সে হিসেবে ২০১৯ সাল নয় ২০১৮ সালের মধ্যেই শেষ হতে পারে পদ্মা সেতুর কাজ। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য দ্বিতল বিশিষ্ট এই সেতু নির্মিত হবে কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে। এর ওপর দিয়ে যানবাহন আর নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি প্যাকেজে মূল সেতু নির্মাণ, সংযোগ সড়ক নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, নদী শাসন ও পরামর্শক নিয়োগে এ টাকা ব্যয় হবে। সেতু নির্মাণ কাজে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা রক্ষা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

জঙ্গি সন্ত্রাস দমনে জিরো টলারেন্স নীতি : জঙ্গি সন্ত্রাস দমনে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে একের পর এক জঙ্গি গ্রেপ্তার ও নিহত হওয়ার মাধ্যমে। জঙ্গি আস্তানায় হানা, জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত চলছে সমানতালে। শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের দমনের ফলে জনজীবনে স্বস্তি ফিরে এসেছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে, সরকার ও জনগণ যৌথভাবে এটিকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে নিয়ে জনসচেতনতামূলক ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপের পর্যায়ভুক্ত করেছে। মানববন্ধন, সভা, মিছিল চলছে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে।

জাতির কলঙ্ক মোচনের পথে অগ্রযাত্রা : রক্তে কেনা বাংলাদেশ। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত, সপরিবারে জাতির পিতার রক্ত আর জাতীয় চার নেতার তাজা রক্তে রঞ্জিত বাংলাকে কলঙ্ক মোচনের দীর্ঘদিনের দাবি আজ পূরণের পথে। জাতির পিতা হত্যার বিচারের রায় কার্যকরের মধ্যদিয়ে দায় মোচনের সংস্কৃতি চালু করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করেন। ২০০৮ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। জাতির প্রত্যাশা অনুযায়ী, যুদ্ধাপরাধীর বিচার করছে সরকার। সর্বশেষ জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী ষষ্ঠ ব্যক্তি যার মানবতাবিরোধী অপরাধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেয়া চূড়ান্ত রায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এর আগে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। আগের দরিদ্র পীড়িত, যুদ্ধাপরাধের কলঙ্কযুক্ত বাংলাদেশ আর নেই। বরং আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে অপরাজনীতি, অপশক্তিকে পদদলিত করে কলঙ্ক মোচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।

এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ : বিশেষজ্ঞদের মতে, একাত্তরের চেতনায় ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। স্বপ্ন ছিল একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন দেশে নানা অনাচার, দুর্নীতি হয়েছিল, তা অস্বীকার উপায় নেই। তবে সবকিছুর পরও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

মুক্তিযোদ্ধা ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলে মুহূর্তেই একটি বদলে যাওয়া দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। যুদ্ধাপরাধের বিচারের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা শেষ করতে হবে। দেশে তখনই রিকনসিলিয়েশন (পুনরেকত্রীকরণ) হবে, যখন একাত্তর এবং তারপর ঘটে যাওয়া সব অপরাধের বিচার হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, স্বাধীনতার ৪৩ বছরে আমাদের প্রাপ্তির ভাণ্ডার অনেক বিশাল হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আকাক্সক্ষা অনুযায়ী সব কিছু হয়েছে তা বলা যাবে না। তারপরেও যা আমাদের প্রাপ্তিতে যোগ হয়েছে তাও কম নয়, আমরা পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নিতে পেরেছি, আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছি, গার্মেন্টস শিল্পে আমরা বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতা করছি, আমাদের গড়ে উঠেছে মেধাবী মানবসম্পদ- যা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমরা এভারেস্টের চূড়া জয় করতে পেরেছি। ক্রিকেটে আমাদের ছেলেরা পৃথিবীর অন্য সব শক্তিশালী দেশের সঙ্গে লড়ার শক্তি অর্জন করেছে, আমাদের দেশপ্রেমিক সাহসী সেনাবাহিনী শুধু দেশে নয়, সারা বিশ্বে শান্তি রক্ষায় কাজ করছে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj