বাড়ছে সফল নারী উদ্যোক্তা : ইলিয়াছ হোসেন পাভেল

সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬

পাবনার বেড়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের মাহফুজা মিনা অনেক প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে নিজেকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তীব্র ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্র নিষ্ঠায় নিজ পরিচয়ে মিনা এখন উত্তরবঙ্গের অন্যতম সফল ডেইরি ব্যবসায়ী। একই উপজেলার বনগ্রামের মৃত আবদুল মজিদ মাস্টারের একমাত্র মেয়ে মাহফুজা মিনা। ২০০০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। যোগ দেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায়। প্রকৌশলী স্বামী, দুই সন্তান নিয়ে সুখের সংসার হলেও মিনা ভুগছিলেন আত্মপরিচয় সংকটে। নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদ থেকে ২০১০ সালে মাত্র দু’টি গরু নিয়ে মিনা শুরু করেন তার ডেইরি ফার্ম। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে তিনি এখন প্রায় ৫০টি গরু, ভেড়া, হাঁস-মুরগি নিয়ে জেলার অন্যতম বৃহৎ ডেইরি ফার্মের মালিক। পেয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সফল উদ্যোক্তার স্বীকৃতিও।

বর্তমানে এ খামার থেকে প্রতিদিন উৎপাদন হয় প্রায় ৪০০ লিটার দুধ। আর এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে মিনার অধীনে কর্মসংস্থান হয়েছে ১৫ জনের।

বেবি হাসান বিএস অ্যাপারেল নামের একটি বায়িং হাউসের কর্ণধার। এক সময় চাকরি করতেন গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে। কিন্তু নিজের শ্রম মেধা দিয়ে সফল উদ্যোক্তাদের একজন হয়েছেন বেবি হাসান। তার অধীনেই কাজ করছেন প্রায় অর্ধশত কর্মী। এসএসসি পাস করার পর পারিবারিক সিদ্ধান্তে ১৯৮১ সালে বিয়ে হয়ে যায় তার। বিয়ের পরবর্তী বছর জন্ম নেয় কন্যাসন্তান। স্বামীর আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। তাই সংসারে কিছুটা স্বস্তি আনতে নিজেই চাকরি করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত পোশাক কারখানায় কাজ করেন।

এক সময় উৎপাদন পরিচালকের দায়িত্বও পান। এরপর ২০০৯ সালে নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন বিএস অ্যাপারেল নামের পৃথক বায়িং হাউস। বছর বছর এ প্রতিষ্ঠানের কলেবর বাড়ছে। বেবি হাসানের সঙ্গে তার ছেলে সালাহউদ্দিন চৌধুরীও সম্প্রতি ব্যবসায় যোগ দিয়েছেন।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী পৌর এলাকার সাগরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মারেফা আক্তার জাহান (মুন্নি)। স্বামী প্রভাষক মতিউর রহমান খোকন। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাদের সুখের সংসার। সংসারে আর্থিক কোনো সংকট না থাকলেও একরকম সখের বসেই বুটিক শিল্পের কাজ শুরু করেন। রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স সম্পন্ন করেন। এখন বেশ বড়সড়ভাবেই ‘লিবাস বুটিক হাউস’ নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। প্রথমে রাজশাহী কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তিনি ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ব্যবসার প্রথম দিকে তিনি হাতে তৈরি থ্রি-পিস, শাড়ি, ফতুয়া, ওড়না, বেডশিট, পাঞ্জাবি, কুশন কভার তৈরি করে স্থানীয় দোকানে সরবরাহ করতেন।

পরবর্তীতে একে একে রাজশাহী শহরের বড় বড় মার্কেটগুলোতেও স্থান পায় তার হাতে তৈরি বুটিকের পণ্য। এখন শুধু রাজশাহীতেই নয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, দিনাজপুরসহ রাজধানী ঢাকাতেও নিজের প্রতিষ্ঠানের তৈরি বুটিকের পোশাক পাইকারিভাবে সরবরাহ করছেন মুন্নি।

রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার অত্যন্ত গরিব পরিবারের মেয়ে কনিকা রানী। ৬ ভাই ৩ বোনকে নিয়ে অভাবের সংসার তাদের। কোনো জায়গা জমিও তাদের ছিল না। বাবা ফুটপাতে সামান্য চায়ের দোকান করতেন। মা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন।

বাবা-মায়ের এ সামান্য আয় দিয়েই তাদের এ বিরাট সংসার কোন রকমে চলতো। ২০০৯ সালে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের কাছ থেকে মায়ের নেয়া ঋণের ১৩ হাজার টাকা এবং বাবার পরামর্শ নিয়ে সেলাইয়ের কাজ শিখে টেইলার্সের কাজ শুরু করেন। ব্যবসা থেকে ভালো আয় হতে থাকে এবং তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়। তিনি এখন সফল নারী উদ্যোক্তা।

নারী উদ্যোক্তাদের সফলতা দেখে ধীরে ধীরে অনেকে এ পেশায় আসছেন। এতে বাড়ছে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা। এসএমই উদ্যোক্তা নারীরাও এখন আর ঘরে বসে থাকছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে এগিয়ে আসছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। ফলে দিন দিন নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৩ সালেই এসএমই খাতে নতুন নারী উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে ৩ হাজার ৩১৭ জন। ২০১২ সালে ছিল ১ হাজার ২৭৩ জন। এ হার ২০১২ সালের তুলনায় ১৬০ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের ক্ষমতায়ন ও আর্থিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার বিষয়টি নারীদের ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে দারুণভাবে উৎসাহিত করেছে। এ কারণে নারী উদ্যোক্তা বাড়ছে। ভবিষ্যতে সরকারের এসব সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত থাকলে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা আরো বাড়বে বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, এসএমই ঋণের ক্ষেত্রে নারীরা সহজ শর্তে ঋণ পেয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ১৫ শতাংশ নারীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আর এ ঋণের জন্য সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করা আছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এসব সুযোগ-সুবিধা বহাল থাকায় নারীরা সহজে ঋণ নিতে পারছে। গ্রামের প্রান্তিক পর্যায়ের কোনো নারীও ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাদের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের সুবিধা নিতে পারছে। এ কারণে দিন দিন নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে বলে জানান তিনি।

নারী উদ্যোক্তার ঋণখেলাপির পরিমাণও কম বলে তিনি উল্লেখ করেন। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় বর্তমান সরকারের সময়ে সাফল্যজনক কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রয়াস কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত ধানমণ্ডির রাপা প্লাজার ৪র্থ ও ৫ম তলায় স্থাপিত ‘জয়িতা’ বিপণন কেন্দ্র। ২০১১ সালের ১৬ নভেম্বর হোটেল রূপসী বাংলা থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নারী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জয়িতার কার্যক্রমের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

সারা দেশে তৃণমূল পর্যায়ে ১৬ হাজারের অধিক নিবন্ধিত স্বেচছাসেবী মহিলা সমিতি রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের এ সব সমিতির সদস্যদের মধ্যে অসংখ্য ছোট ছোট নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ও অনুক‚ল নারীবান্ধব অবকাঠামো না থাকার কারণে তৃণমূল পর্যায়ের ছোট ছোট নারী উদ্যোক্তারা তাদের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী বাজারজাতকরণে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। উদ্যোক্তাদের তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের জন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে নারী উদ্যোক্তারা পূর্ণাঙ্গ সুফল ভোগ করতে পারছেন না। (পিআইডি)

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj