পোলট্রিশিল্প বদলে দিচ্ছে মানুষ, গ্রাম ও অর্থনীতি : কর্মসংস্থানে গার্মেন্টসশিল্পের পরেই অবস্থান

শুক্রবার, ২২ জুলাই ২০১৬

টুটুল রহমান : গল্পটা বদলে যাওয়া এক যুবকের। একটি গ্রামের। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পুরো একটি গ্রামকে বদলে দেয়ার। টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার ডুবাইল গ্রামের শিক্ষিত যুবক রফিকুল ইসলাম মুকুল। গ্র্যাজুয়েশন করার পর কিছুদিন চাকরিও করেছেন একটি বেসরকারি কোম্পাািনতে। চাকরি ছেড়ে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু কিছুতেই স্থির হতে পারেননি তিনি। তার স্বপ্নছিল নিজে কিছু করার। ব্যতিক্রমী কিছু করার। স্বাবলম্বী হওয়ার। আর সেই স্বপ্ন থেকে শুরু। মাত্র ২ হাজার পোলট্রির বা ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা নিয়ে শুরু করেন খামার। পুঁজি খাটান ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা। তাকে সহযোগিতা করেন তার এক খালাতো ভাই ইঞ্জিনিয়ার এনামূল। তারই পরামর্শ ও দিকনির্দেশনায় শুরু করেন খামার মুকুল।

এরপর বদলে গেছে মুকুলের জীবন। তিনি বদলে দিয়েছেন পুরো গ্রাম। নিজের সাফল্যের কাহিনী সম্পর্কে মুকুল

বলেন, ২ হাজার বাচ্চা নিয়ে গোপালপুরে আমিই প্রথম পোলট্রি খামার গড়ে তুলি। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগির উৎপাদনের পাশাপাশি ডিমও উৎপাদন করছি। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে আমার খামারে উৎপাদন হয় এক লাখ ডিম। পাশাপাশি তৈরি করছি পোলট্রির খাবার। কয়েকশ মানুষের কর্মস্থান করেছি।

শুধু রফিকুল ইসলাম মুকুল নন, তার পথ অনুসরণ করে ২০০৩ সালেই উত্তর টাঙ্গাইলের গোপালপুরের গ্রামগুলোতে গড়ে ওঠে ২০০ খামার। বর্তমানে এই গ্রামগুলোতে খামারির সংখ্যা ৫৫০ জনের মতো। মুকুল জানিয়েছেন, সবাই মোটামুটি সাফল্যের মুখ দেখেছেন। তবে অনভিজ্ঞতা আর প্রাকৃতিক কারণে অনেককেই লোকসান গুনতে হয়েছে। এরপরও এই অঞ্চলের মাংস ও ডিমের চাহিদা মেটাচ্ছে এই খামারগুলো। এ ছাড়াও প্রতি সপ্তাহে এই এলাকা থেকে ১০ লাখ ডিম ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছেন খামারিরা।

পোলট্রিখ্যাত এই গ্রাম ঘুরে দেখা যাবে, পোলট্রি খামারগুলো বদলে যাওয়ার চিহ্ন বহন করছে। শত শত মানুষ কাজ করছে খামারগুলোতে। ট্রাক ঢুকছে ডিম ও বাচ্চা পরিবহনের। বাজারগুলোতে গড়ে উঠেছে পোলট্রি বা ব্রয়লার মুরগি বিক্রির ছোট ছোট দোকান। অনেক বেকারের কর্মসংস্থান হয়েছে।

গ্রামের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে যেখানে বাড়িতে মেহমান বা আত্মীয়স্বজন এলে দেশি মুরগির ডিম অথবা পুকুরের মাছই ছিল খাবারের তালিকায়। বর্তমানে সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ব্রয়লার মুরগির মাংস। দামে সস্তা ও খেতে সুস্বাদু হওয়ার কারণে সব শ্রেণির মানুষ এখন ব্রয়লার মুরগির মাংস খাচ্ছে। আর প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় যুক্ত হয়েছে মুরগির ডিম।

স্থানীয় খামারিরা জানান, গ্রামের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই শিল্প এখন নানা সমস্যায় ধুঁকছে। সরকারের বিভিন্ন নীতির কারণে খাদ্যের দাম বাড়ছে। ভালো মানের ওষুধ পাওয়া যায় না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো উদ্যোগ নেই। নীতিমালা থাকার পরেও ব্যাংকগুলো খামারিদের ঋণ দিতে চায় না। এ ছাড়াও বড় সমস্যা বিদ্যুতের। সহজ শর্তে বিদ্যুতের সংযোগ পান না খামারিরা।

গোপালপুর পোলট্রি মালিক সমিতির দায়িত্ব পালন করা রফিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, এই গ্রামে আমি প্রথম খামার শুরু করি। আমার উদ্যোগের কারণে এখন ৫৫০ খামারি এই খামার করেছেন। সরকারের সহযোগিতা পেলে গ্রামের অর্থনীতিতে আরো ভূমিকা রাখতে পারবে এই খামারগুলো।

পোলট্রি-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আশির দশকে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর বর্তমানে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পোলট্রি উদ্যোক্তা ও খামারিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ এবং সরকারের আন্তরিক সহযোগিতার কারণেই এ অসাধ্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।

তিন যুগ পর সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর খাতটি এখন আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে। বর্তমানে পোলট্রি মাংস, ডিম, একদিন বয়সী বাচ্চা এবং ফিডের শতভাগ চাহিদা মেটাচ্ছে বাংলাদেশের পোলট্রিশিল্প। সাধারণ গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য কম দামে প্রাণিজ আমিষের জোগান দিচ্ছে এ শিল্প।

পুষ্টিবিদরা বলছেন, শিশুর পেশীগঠন ও মেধার বিকাশ, শ্রমজীবী মানুষের শক্তির জোগান দেয়া, সর্বোপরি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পোলট্রিশিল্প উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

এ ছাড়াও সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন প্রজন্মের রুচি ও চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে চিকেন নাগেট, সসেজ, ড্রামস্টিক, বার্গার, সামোসা, মিটবলসহ বিভিন্ন ধরনের মজাদার প্যাকেটজাত খাবার, যা কিছুকাল আগেও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গার্মেন্টসশিল্পের পর পোলট্রিশিল্পই বাংলাদেশে সবচেয়ে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখন এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত, যার প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। গ্রামীণ অর্থনীতিতে, নারীর ক্ষমতায়নে কৃষির পরই সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে বাংলাদেশের পোলট্রিশিল্প।

এদিকে খামারিরা জানান, পোলট্রি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর শিল্প। রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে একজন সচ্ছল খামারিও রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে পথে বসতে পারেন। ২০০৫, ২০০৯ এবং ২০১১ সালে দেশে এভিয়ান ইনফ্লয়েঞ্জার (বার্ড-ফ্লু) সংক্রমণে এমন অসংখ্য নজির বাংলাদেশে রয়েছে। তাই এমন একটি স্পর্শকাতর সেক্টরে ২০২১ সালের চাহিদা পূরণে যে বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে হলে সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তের কারণে এ শিল্পে আবারো অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। খামারিরা উৎপাদন খরচের টাকা তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন। যার ফলে ইতোমধ্যেই সারা দেশে অসংখ্য খামার বন্ধ হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

এ ছাড়াও কর অব্যাহতি সুবিধা ২০২১ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করা দরকার। হঠাৎ করেই এ সেক্টরে আয়কর, কাস্টমস ডিউটি, এআইটি আরোপ না করা, দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণে একদিকে যেমন সরকারকে নজর দিতে হবে, তেমনই পোলট্রিশিল্পে আরোপিত কর সর্বনিম্ন এবং সহনীয় জায়গায় নিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।

পোলট্রিশিল্পে ব্যবহৃত সব ধরনের কাঁচামাল, ওষুধ, প্রিমিক্স এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি আমদানির ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক তুলে দেয়া, এডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) বাতিল করা, এইচএস কোড-সংক্রান্ত জটিলতার অবসান এবং কাস্টমস জটিলতা নিরসন করার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২১ সাল পর্যন্ত এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করতে হলে পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পোলট্রি বিমার উদ্যোগ নেয়ার কথাও বলছেন এ খাতের জড়িতরা।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj